Published : 11 Jun 2026, 11:35 PM
প্রায় দুই দশক পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের দেওয়া বাজেটকে মোটা দাগে ‘ব্যবসাবান্ধব’ বললেও করপোরেট কর না কমানো নিয়ে আশাহত হওয়ার কথা বলেছে দেশের ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো।
তাদের আশঙ্কা, করপোরেট কর কমানোর বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদী ‘রোডম্যাপ’ না থাকায় বিদেশি বিনিয়োগ টানার আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়তে পারে।
এছাড়া বহুজাতিক কোম্পানির ই-ভ্যাট বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি আশঙ্কাও করেছেন কোনো কোনো ব্যবসায়ী নেতা। উদ্বেগ এসেছে বিনিয়োগের পরিবেশ নিয়ে।
রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার চার মাসের মাথায় বৃহস্পতিবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা।
এবারের বাজেটে করপোরেট কর হার অপরিবর্তিত রাখার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বিনিয়োগে পিছিয়ে পড়ার শঙ্কা ফিকির
বাজেটে সরকারের কৌশলগত ‘থ্রি আর’ (রিকভারি, রিস্টোরেশন অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকশন) কাঠামোকে স্বাগত জানিয়েছে ‘ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি’ (ফিকি)।
অর্থ বিলকে ‘ইতিবাচক, প্রগতিশীল ও ব্যবসাবান্ধব’ উদ্যোগ হিসেবে দেখছে সংগঠনটি।
বৃহস্পতিবার সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তাৎক্ষণিক বাজেট প্রতিক্রিয়ায় তারা বলেছে, নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ এবং প্রযুক্তিভিত্তিক সংস্কারের উপর গুরুত্ব আরোপ বিনিয়োগকারীদের আস্থা ‘সুদৃঢ় করবে’।
উৎসে কর কর্তনকে (টিডিএস) ন্যূনতম করের পরিবর্তে অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য করার সিদ্ধান্তও ইতিবাচক হিসেবে মূল্যায়ন করেছে তারা।
করপোরেট কর হার অপরিবর্তিত রাখলেও দীর্ঘমেয়াদি কর কমানোর ‘রোডম্যাপ’ না থাকায় আঞ্চলিক প্রতিযোগীদের তুলনায় বাংলাদেশ এফডিআই আকর্ষণে পিছিয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে ফিকি।
পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া বৃহৎ ও বহুজাতিক করদাতাদের জন্য ই-ভ্যাট বাধ্যতামূলক করাও বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছে তারা।
করপোরেট কর কমানোর দাবি বিটিএমএর
প্রতিযোগিতার সক্ষমতা ধরে রাখতে করপোরেট করহার ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)।
এছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহারের প্রস্তাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংগঠনটি।
বিটিএমএর ভাষ্য, এ সুবিধার অপব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) মর্যাদা থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে শর্তটি বহাল রাখা প্রয়োজন বলে মনে করে সংগঠনটি।
তবে শুল্ক কাঠামোর পুনর্বিন্যাস, সৌরবিদ্যুতের উপকরণে কর-সুবিধা এবং ব্যবসা সহজীকরণের বিভিন্ন পদক্ষেপ ‘ইতিবাচক বার্তা বহন করে’ বলে মন্তব্য করেছেন বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল।

বাস্তবায়নে গুরুত্ব চায় ডিসিসিআই
প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটকে ‘ব্যবসাবান্ধব’ বর্ণনা করে এর কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ।
তিনি বলেছেন, “সামগ্রিকভাবে ২০২৬-২৭ বাজেটকে ব্যবসা ও বিনিয়োগ সহায়ক হিসেবে বিবেচনা করা যায়। তবে উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং ঘোষিত সংস্কারের পূর্ণ বাস্তবায়নের উপরই নির্ভর করবে এই বাজেটের প্রকৃত সাফল্য।”
বৃহস্পতিবার বিকালে সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পেশ করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এরপর মতিঝিলে ডিসিসিআই কার্যালয়ে বাজেট নিয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় জানান সংগঠনের সভাপতি।
তিনি বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট দেওয়া হয়েছে, যা বিগত বছরের তুলনায় ১৯.০৪ শতাংশ বেশি।
“রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৩০ দশমিক ৩৪ শতাংশ বৃদ্ধি বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থায় চ্যালেঞ্জিং এবং ঘাটতি পূরণে ঋণনির্ভরতা ব্যাংক খাতের পুনরুদ্ধার ও বেসরকারি বিনিয়োগে ঋণপ্রবাহের জন্য ইতিবাচক নয়। তবে পরিচালন ব্যয় কমানোর লক্ষ্যমাত্রা আপাতদৃষ্টিতে ইতিবাচক।”
তবে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য কূপ খননের পদক্ষেপ ‘প্রয়োজনের তুলনায় বেশ কম’ বলে মন্তব্য করে তিনি।
ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, “আমদানি নির্ভর জ্বালানিতে সুনির্দিষ্ট মূল্য কাঠামো না থাকলে স্বল্পমেয়াদি ভর্তুকি বিনিয়োগের পরিবর্তে অপচয় বাড়াবে। সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের মতামতের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি মূল্য কাঠামো প্রণয়নেরও ডিসিসিআই আহ্বান জানাচ্ছি।”
করপোরেট কর ‘যৌক্তিক’ করার দাবি মোবাইল অপারেটরদের
৩০০ টাকার ‘সিম ট্যাক্স’ প্রত্যাহারের প্রস্তাবকে স্বাগত জানালেও করপোরেট কর হার ‘যৌক্তিক পর্যায়ে’ নামিয়ে আনার দাবি জানিয়েছে মোবাইল ফোন অপারেটরদের সংগঠন— অ্যামটব।
সংগঠনের মহাসচিব মোহাম্মদ জুলফিকার বলেন, “মোবাইল সিমের ওপর প্রযোজ্য ভ্যাটকে মূল্যভিত্তিক (স্ট্যান্ডার্ড) করার প্রস্তাব সময়োপযোগী উদ্যোগ। এর ফলে সিমের ওপর বিদ্যমান সুনির্দিষ্ট কর প্রত্যাহার করে এখন থেকে বিক্রয়মূল্যের ওপর ১৫% হারে ভ্যাট আরোপ করা হবে।”
এই খাতের বিভিন্ন কর কমানোর দাবি তুলে অ্যামটব মহাসচিব বলেন, “টেকসই উন্নয়ন ও ডিজিটাল রূপান্তরের গতি আরো জোরদার করতে আমরা সরকারের প্রতি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানাচ্ছি।
“এর মধ্যে রয়েছে—ভোক্তার ওপর করের বোঝা হ্রাস, করপোরেট কর হার যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা, স্পেকট্রামের ওপর ভ্যাট প্রত্যাহার এবং ওটিটি সেবার ওপর আরোপিত সম্পূরক শুল্ক বাতিল করা।”
বাংলাদেশে টেলিকম খাতে বাড়তি করের বিষয়টি অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় এসেছে। তথ্য প্রযুক্তি খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে এই খাতের ট্যাক্স, ভ্যাট ও লাইসেন্সিং নীতিমালা সংস্কারের ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করার কথাও বলেন অর্থমন্ত্রী।
এদিকে পৃথক প্রতিক্রিয়ায় গ্রামীণফোনের পক্ষ থেকে সিমট্যাক্স প্রত্যাহারের বিষয়টিকে স্বাগত জানানো হয়েছে। তবে বিদ্যমান কর কাঠামো সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছে তারা।
গ্রামীণফোনের করপোরেট অ্যাফেয়ার্সের প্রধান কর্মকর্তা তানভীর মোহাম্মদ বলেন, "জাতীয় বাজেটে প্রস্তাবিত সিম ট্যাক্স প্রত্যাহার একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ, যা আরও বেশি মানুষকে ডিজিটাল ইকোসিস্টেমে অন্তর্ভুক্ত করতে এবং ডিজিটাল বৈষম্য কমিয়ে ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তিকে ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করবে।”
পৃথক বিবৃতিতে আরেক মোবাইল অপারেটর রবির চিফ করপোরেট ও রেগুলেটরি কর্মকর্তা সাহেদ আলম সরকার বলেছেন, “সিম কর প্রত্যাহারের প্রস্তাবকে আমরা স্বাগত জানাই।”
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেছেন সিম কর প্রত্যাহারের ফলে সরকার ১২০০ কোটি টাকার মতো রাজস্ব হারাবে।
এ বিষয়ে রবির কর্মকর্তা সাহেদ আলম বলছেন, “যদি এর ফলে সরকারের স্বল্পমেয়াদে কিছু রাজস্ব কমতে পারে। তবে সংযোগ বৃদ্ধির ফলে মোবাইল সেবার ব্যবহার, ডিজিটাল সেবার বিস্তার এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।”

বাজেট ‘জনবান্ধব ও ব্যবসাবান্ধব’
মূল্যস্ফীতি কমানো, খাদ্য নিরাপত্তা ও সাপ্লইচেইন ইকোসিস্টেম বজায় রেখে সরকার ‘ব্যবসাবান্ধব এবং জনবান্ধব’ বাজেট দিয়েছে বলে মনে করে চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি।
বৃহস্পতিবার রাতে সংবাদমসাধ্যমে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে এ প্রতিক্রিয়া জানায় সংগঠনটি।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “বাজেট ঘাটতি মোকাবেলায় বৈদেশিক ঋণের চেয়ে অভ্যন্তরীণ উৎসে গুরুত্ব দেওয়াটা দেশীয় সক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ।”
বাজেটে চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়ন ও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের জন্য নতুন নীতিমালা নিঃসন্দেহে চট্টগ্রামে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে বলে মনে করে চেম্বার নেতারা।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “ঢাকা-চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বাস্তবায়ন এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের দুরত্ব ৮০ কি.মি. কমানোর সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে।”
আরো পড়ুন-
স্থিতিশীলতায় ফেরার বাজেটে ব্যয় বাড়ল ১৯%
স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ
প্রস্তাবিত বাজেট 'উচ্চাভিলাষী', বলছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল