Published : 09 Jul 2026, 04:01 PM
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরের হান্টার কলেজ হাই স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র সে। নিজের ঘরের ড্রয়িংরুমে বসে স্রেফ কাগজ ভাঁজ করে সে এমন এক কাণ্ড ঘটিয়েছে, যা দেখে বিজ্ঞানীরাও তাজ্জব বনে গেছেন। ১৪ বছর বয়সি এ কিশোরের নাম মাইলস উ।
কাগজ ভাঁজ করার ঐতিহ্যবাহী জাপানি শিল্পকে বলা হয় ‘অরিগ্যামি’। মাইলস এই অরিগ্যামি বিদ্যাকে কাজে লাগিয়ে এমন এক অস্থায়ী ঘর বা আশ্রয়শিবিরের নকশা তৈরি করেছে, যা একাধারে সস্তা, সহজে যেখানে-সেখানে বহন করে নিয়ে যাওয়া যায় এবং মজবুত।
মাইলসের এই উদ্ভাবন তাকে এনে দিয়েছে এক বড় স্বীকৃতি। ওয়াশিংটন ডি.সিতে অনুষ্ঠিত ‘২০২৫ থার্মো ফিশার সায়েন্টিফিক জুনিয়র ইনোভেটরস চ্যালেঞ্জ’-এ সে প্রথম হয়েছে। এটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে বড় এবং মর্যাদাপূর্ণ বিজ্ঞান প্রতিযোগিতা। পুরস্কার হিসেবে মাইলস ২৫ হাজার ০০০ মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৩০ লাখ টাকা জিতে নিয়েছে।
মাইলস উ-এর অরিগ্যামির প্রতি ভালোবাসা আজকের নয়। প্রায় ছয় বছর আগে, যখন তার বয়স ছিল মাত্র আট বছর, তখন থেকেই সে শখের বশে কাগজ ভাঁজ করে নানা জিনিস বানাত। তবে ২০২৪ সালের দিকে তার এই শখ নতুন রূপ নেয়। মাইলস বিভিন্ন বই ও গবেষণাপত্র পড়ে জানতে পারে যে, অরিগ্যামি কেবল সুন্দর কোনো কাগজের খেলনা বানানোর শিল্প নয়।
আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গণিতে অরিগ্যামির জ্যামিতিক নকশাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে ব্যবহার করা হচ্ছে। কাগজ ভাঁজের এই শিল্পের ইতিহাস কিন্তু শত শত বছরের পুরনো। তবে ১৯৬০-এর দশক থেকে আধুনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বা প্রকৌশল বিদ্যায় এর ব্যবহার শুরু হয়। বর্তমানে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিভিন্ন সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতি যেমন- হার্টের ব্লকেজ দূর করার স্টেন্ট বা ক্যাথেটার তৈরিতে অরিগ্যামির ভাঁজ ব্যবহার করা হয়। এমনকি রোবোটিক্স বা স্বয়ংক্রিয় রোবট তৈরিতেও এই ভাঁজের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
মাইলসকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করেছিল ‘মিউরা-অরি’ নামের একটি বিশেষ অরিগ্যামি ভাঁজ। জাপানের জ্যোতির্বিজ্ঞানী কোরিও মিউরা এই ভাঁজ পদ্ধতিটি আবিষ্কার করেছিলেন। মহাকাশ বিজ্ঞানে এই ভাঁজের ব্যবহার জনপ্রিয়। মহাকাশযান বা স্যাটেলাইটের বিশাল সৌর প্যানেল বা সোলার প্যানেলগুলোকে কীভাবে ছোট জায়গায় ভাঁজ করে রকেটের ভেতরে ভরা যায় এবং মহাকাশে যাওয়ার পর তা যেন একটানে সুন্দরভাবে খুলে যায়, সেই প্রযুক্তিতে এই মিউরা-অরি ভাঁজ ব্যবহার করা হয়। ১৯৯৫ সালে জাপানের পাঠানো স্পেস ফ্লায়ার ইউনিট নামক স্যাটেলাইটে প্রথম এই ভাঁজ সফলভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল।
যখন মাইলস অরিগ্যামির এই দিকগুলো নিয়ে পড়াশোনা করছিল, ঠিক তখনই ফ্লোরিডায় আঘাত হানে হ্যারিকেন বা সামুদ্রিক ঝড় ‘হেলেন’। একই সময়ে ক্যালিফোর্নিয়ার বনে বিধ্বংসী দাবানল ছড়িয়ে পড়ে। লাখ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে গৃহহীন হয়ে পড়ে।

টেলিভিশনের পর্দায় মানুষের এই কষ্ট দেখে মাইলসের মন কেঁদে ওঠে। সে খেয়াল করল, দুর্যোগের পর মানুষের থাকার জন্য যেসব অস্থায়ী তাঁবু বা ক্যাম্প দেওয়া হয়, সেগুলোতে বড় কিছু সমস্যা আছে। কোনো কোনো তাঁবু অনেক শক্ত, কিন্তু সেগুলো তৈরি করতে প্রচুর সময় ও খরচ লাগে। আবার যেগুলো সস্তা, সেগুলো সামান্য ঝড়-বাতাসেই ভেঙে পড়ে। অর্থাৎ, একসাথে সস্তা, মজবুত এবং সহজে ব্যবহারযোগ্য- এমন কোনো আশ্রয়শিবির বর্তমান ব্যবস্থায় ছিল না।
মাইলস ভাবল, মিউরা-অরি ভাঁজের বৈশিষ্ট্য হলো- এটি একটি বিশাল আকারের কাগজকে ভাঁজ করে একদম চ্যাপ্টা ও ছোট করে ফেলতে পারে। আবার প্রয়োজনে এক সেকেন্ডের মধ্যে এক টানে ছাতার মতো পুরোটা মেলে ধরা যায়। সে চিন্তা করল, এই ভাঁজ পদ্ধতি ব্যবহার করে যদি দুর্যোগ কবলিত মানুষের জন্য বড় বড় তাঁবু বানানো যায়, তবে কেমন হয়?
নিজের এই আইডিয়া কতটা বাস্তবসম্মত, তা পরীক্ষা করার জন্য মাইলস কোমর বেঁধে নেমে পড়ে। সে তার নিজের বাড়ির ছোট ড্রয়িংরুমটাকেই ল্যাবরেটরি বা গবেষণাগার বানিয়ে ফেলে। সে মোট ২৫০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে এই একটি বিষয় নিয়ে দিন-রাত কাজ করে।
মাইলস প্রথমে কম্পিউটারের একটি সফটওয়্যার বা প্রোগ্রামের সাহায্যে মিউরা-অরি ভাঁজের নানা ধরনের জ্যামিতিক নকশা তৈরি করে। জ্যামিতির নিয়ম মেনে সে কাগজের উচ্চতা, প্রস্থ এবং ভেতরের কোণগুলোর মাপ বারবার পরিবর্তন করতে থাকে। নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করার জন্য সে তিন ধরনের কাগজ বেছে নেয়- সাধারণ ফটোকপির কাগজ, হালকা কার্ডস্টক (একটু শক্ত কাগজ) এবং ভারী কার্ডস্টক (মোটা কাগজ)।
মানুষের হাতে ভাঁজ করলে মাপে কিছুটা ভুলত্রুটি হতে পারে। তাই নিখুঁতভাবে কাগজ ভাঁজ করার জন্য মাইলস একটি স্কোরিং মেশিন (কাগজে দাগ কাটার যন্ত্র) ব্যবহার করে। সে মোট ৫৪টি ভিন্ন ভিন্ন নকশা তৈরি করে। প্রতিটি নকশার দুটি করে কপি বানিয়ে মোট ১০৮ বার এই পরীক্ষাটি চালায়। প্রতিটি কাগজের মডেলের আকার ছিল ৬৪ বর্গইঞ্চি। এরপর সে দুটি কাঠের রেলিং বা গার্ডরাইলের ঠিক মাঝখানে ৫ ইঞ্চি দূরত্ব রেখে এই অরিগ্যামির মডেলগুলোকে স্থাপন করে। এবার শুরু হয় তার আসল পরীক্ষা, এই কাগজের তৈরি নকশাগুলো কতটা ওজন সহ্য করতে পারে!
পরীক্ষার শুরুতে মাইলস ভেবেছিল, কাগজের তৈরি এই জিনিসগুলো হয়তো বড়জোর ৫০ পাউন্ড বা প্রায় ২২ কেজি ওজন সহ্য করতে পারবে। সে ভেবেছিল ঘরের কয়েকটা ভারী বই খাতা ওপর রাখলেই কাগজটা ভেঙে যাবে। কিন্তু পরীক্ষা শুরু হতেই সে বড় ধাক্কা খেল।

দেখা গেল, মাইলসের তৈরি কাগজের মডেলগুলোর ওপর একের পর এক ভারী পাঠ্যবই, রান্নার ভারী কাস্ট-আয়রনের কড়াই বা হাঁড়িপাতিল রাখার পরও সেগুলো মচকাচ্ছিল না! ঘরের সমস্ত ভারী জিনিস শেষ হয়ে যাওয়ার পরও কাগজের তৈরি ওই ছোট্ট কাঠামো অক্ষত রইল। শেষ পর্যন্ত নিরুপায় হয়ে মাইলস তার বাবা-মাকে অনুরোধ করে ব্যায়াম করার ৫০ পাউন্ড ওজনের লোহার ডাম্বেল কিনে দিতে বলে।
লোহার ওজন চাপানোর পর চূড়ান্ত ফলাফলে যা দেখা গেল, তা মাইলস সহ পুরো বিজ্ঞান বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। মাইলসের তৈরি সবচেয়ে নিখুঁত ও সেরা অরিগ্যামি মডেলটি নিজের ওজনের চেয়ে ১০ হাজার গুণেরও বেশি ওজন সহ্য করে নিয়েছে! নিজের এই আবিষ্কারের ক্ষমতা বোঝাতে গিয়ে মাইলস একটি উপমা দেয়। সে বলে, “সহজ কথায় বলতে গেলে এই শক্তিটা কেমন জানেন? এটা ঠিক এমন- যেন নিউ ইয়র্ক শহরের একটা সাধারণ হলুদ ট্যাক্সি গাড়ি নিজের পিঠে চার হাজারটি আস্ত হাতির ওজন নিয়ে সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে, তাও গাড়িটার কিচ্ছু হচ্ছে না!”
মাইলসের এই কাজের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তা বিশ্বের অনেক বিজ্ঞানীর নজরে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির প্রকৌশলী এবং অরিগ্যামি বিশেষজ্ঞ গ্লসিও এইচ. পাউলিনো মাইলসের এই কাজের প্রশংসা করেন। তিনি জানান, মাইলস জ্যামিতির নিয়মগুলোকে যেভাবে ব্যবহার করে কাগজের শক্তি বাড়িয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। ইঞ্জিনিয়াররা যখন কোনো সহজে বহনযোগ্য বা ভাঁজ করা যায় এমন জিনিস তৈরি করেন, তখন এই বিষয়গুলোকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
‘সোসাইটি ফর সায়েন্স’ নামে একটি সংস্থা ১৯৯৯ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের এই বিজ্ঞান প্রতিযোগিতার আয়োজন করে আসছে। তাদের মূল লক্ষ্য হলো দেশের ভবিষ্যৎ বৈজ্ঞানিক নেতাদের খুঁজে বের করা। এই প্রতিযোগিতার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও মায়া আজমেরা জানান, এবারের প্রতিযোগিতায় মাইলস উ প্রথম স্থান অধিকার করেছে।
প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির বিশেষজ্ঞ পাউলিনো মাইলসকে কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, কাগজ যখন বড় আকারে আসল তাঁবুতে রূপ নেবে, তখন অরিগ্যামির শক্তি একইভাবে কাজ নাও করতে পারে। কারণ বাস্তব জীবনের একটি তাঁবুকে ঝড়-বৃষ্টি, তীব্র বাতাস এবং চারদিকের বহুমাত্রিক ধাক্কা সহ্য করতে হবে। এছাড়া বড় তাঁবু তৈরির সময় ভাঁজের জোড়ামুখ বা জয়েন্টগুলো যেন শক্ত হয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে।
সূত্র: স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন