Published : 08 Jul 2026, 12:21 PM
বিশ্বকাপ ফুটবল কিংবা ক্রিকেট, বড় কোনো টুর্নামেন্ট এলেই আমাদের চারপাশে উন্মাদনা তৈরি হয়। আমরা প্রিয় দলের জার্সি কিনি, মাঝরাত জেগে খেলা দেখি, আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলে তর্ক-বিতর্কের ঝড়। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে তরুণ প্রজন্মের আড্ডার মূল বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে মাঠের সেই ৯০ মিনিট বা ২০ ওভারের লড়াই।
সাধারণত আমরা বড়দের কাছ থেকে, সংবাদমাধ্যমে কিংবা বিভিন্ন সেমিনারে একটি কথা খুব শুনতে পাই, “খেলাধুলা বিশ্বজুড়ে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বাড়ায়, বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষকে কাছাকাছি আনে এবং যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করে।” কিন্তু আসলেই কি তাই? মাঠের এই তুমুল উত্তেজনা কি সত্যিই মানুষের মনে ভালোবাসার জন্ম দেয়?
আজ থেকে প্রায় আট দশক আগে, ১৯৪৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর, ব্রিটিশ লেখক ও সাংবাদিক জর্জ অরওয়েল (১৯০৩-১৯৫০) তার ‘দ্য স্পোর্টিং স্পিরিট’ প্রবন্ধে আমাদের এই চেনা ও প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। বিশ শতকের ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম প্রভাবশালী এই কথাসাহিত্যিক তার তীক্ষ্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতার জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। ১৯০৩ সালে অবিভক্ত ভারতের বিহারে জন্ম নেওয়া এ লেখকের আসল নাম ছিল এরিক আর্থার ব্লেয়ার, তবে তিনি ‘জর্জ অরওয়েল’ ছদ্মনামেই অমর হয়ে আছেন।
ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বৈরতন্ত্র এবং সমাজের ভণ্ডামির বিরুদ্ধে তার কলম ছিল সোচ্চার। তার লেখা ‘অ্যানিমেল ফার্ম’ এবং ‘১৯৮৪’ উপন্যাস দুটিকে বিশ্ব সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ মনে করা হয়, যেখানে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে রাষ্ট্র সাধারণ মানুষের চিন্তাভাবনাকে নিয়ন্ত্রণ করে। অরওয়েল এমন একজন লেখক ছিলেন, যিনি কোনো সস্তা আবেগ বা লোকদেখানো সৌন্দর্যে বিশ্বাস করতেন না। তিনি চারপাশের বাস্তবতাকে দেখতেন নির্মম ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে।
আর সেই বাস্তববাদী দৃষ্টি দিয়েই তিনি ব্যবচ্ছেদ করেছিলেন আধুনিক খেলাধুলার পেছনের মনস্তত্ত্বকে, যা আজকের সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে ট্রল ও মিমে মেতে থাকা তরুণদের জন্যও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক এবং জরুরি।
অরওয়েল তার প্রবন্ধের শুরুতেই ১৯৪৫ সালের তৎকালীন একটি ঘটনার অবতারণা করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সবেমাত্র শেষ হয়েছে। এমন সময় রাশিয়ার বিখ্যাত ‘ডায়নামো’ ফুটবল দল ইংল্যান্ড সফরে আসে চারটি প্রীতি ম্যাচ খেলার জন্য। সেই সময়ে রাজনীতিক ও সাধারণ মানুষ ধারণা করেছিলেন, এই সফরের মাধ্যমে যুদ্ধোত্তর ব্রিটেন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও মধুর হবে।
কিন্তু অরওয়েল তার প্রবন্ধে দেখান যে, ফলাফল হয়েছিল একদম উল্টো। মাঠের ভেতরে এবং বাইরে দুই দেশের খেলোয়াড় ও সমর্থকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ, মারামারি আর পারস্পরিক বিদ্বেষ তৈরি হয়েছিল। একটি ম্যাচে খেলোয়াড়রা একে অপরকে ঘুষি মারেন, রেফারিকে লক্ষ্য করে দর্শকরা দুয়ো ধ্বনি দেয়, আর অন্য একটি ম্যাচ তো শুরু থেকেই রীতিমতো রেসলিং বা ফ্রি-ফর-অল মারামারিতে রূপ নেয়।
এমনকি কোন দল আসল জাতীয় দল আর কোন দল কেবল ক্লাবের দল- তা নিয়ে সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি কাদা ছোড়াছুড়ি শুরু হয়। এই ঘটনাটি উল্লেখ করে অরওয়েল বলেন যে, “আন্তর্জাতিক স্তরের এই খেলাধুলা দুই দেশের সম্পর্ককে উন্নত করার বদলে আরও কিছুটা খারাপ করে দিয়ে গিয়েছিল।”
কিন্তু কেন এমন হয়? খেলাধুলার মতো একটি সুন্দর বিষয় কেন মানুষের মধ্যে শত্রুতার জন্ম দেবে? অরওয়েল এর একটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, পাড়ার মাঠে, স্কুল বা গ্রামের সবুজ চত্বরে যখন আমরা স্রেফ আনন্দের জন্য কিংবা শরীরচর্চার তাগিদে দল ভাগ করে খেলি, তখন তাতে কোনো হিংসা থাকে না। সেখানে এক পক্ষ হারলে বা জিতলে পৃথিবীর কোনো ক্ষতি বৃদ্ধি হয় না, তাই খেলার মধ্যে একটা সহজ-সরল আনন্দ থাকে।
কিন্তু যখনই সেই খেলার সঙ্গে ‘প্রতিষ্ঠা’, ‘বিপুল অর্থ’, ‘ব্যক্তিগত বা আঞ্চলিক অহংকার’ জড়িয়ে যায়, তখনই খেলা তার আসল চরিত্র হারিয়ে ফেলে। যখন একজন খেলোয়াড় বা দল মনে করে যে তারা হেরে গেলে তাদের পুরো দেশ বা জাতি বিশ্বমঞ্চে লজ্জিত হবে, তাদের সম্মান ধুলোয় মিশে যাবে, তখনই মানুষের ভেতরের আদিম, পৈশাচিক এবং উগ্র হিংস্রতা জেগে ওঠে। তখন আর ‘ফেয়ার প্লে’ বা সততার কোনো মূল্য থাকে না। যেকোনো উপায়ে, হোক তা ফাউল করে, রেফারিকে ফাঁকি দিয়ে কিংবা প্রতিপক্ষকে শারীরিকভাবে আঘাত করে- জিততেই হবে, এই মরিয়া ভাব তৈরি হয়।
আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছালে এই মানসিকতা আরও তীব্র রূপ ধারণ করে। অরওয়েল আন্তর্জাতিক খেলাধুলাকে সরাসরি সংজ্ঞায়িত করেছেন ‘ওয়ার মাইনাস শুটিং’ বা গুলি ছাড়া রক্তহীন যুদ্ধ হিসেবে। তিনি মনে করতেন, আধুনিক কালের প্রায় সব ব্যবসাই যেমন প্রতিযোগিতামূলক, খেলাধুলাও ঠিক তেমনি প্রতিযোগিতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এখানে জেতা ছাড়া খেলার কোনো অর্থ থাকে না।
অরওয়েলের মতে, ১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিক ছিল এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ, যেখানে খেলার মঞ্চকে হিটলারের নাৎসি জার্মানি তাদের বর্ণবাদী ও রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল। খেলাধুলা কীভাবে মানুষকে অন্ধ করে তোলে, তা বোঝাতে গিয়ে অরওয়েল ক্রিকেট, ফুটবল এবং বক্সিংয়ের উদাহরণ দেন।
ক্রিকেটকে ভদ্র ও ধীরস্থির খেলা মনে করা হলেও ১৯২০ ও ৩০-এর দশকে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার ‘বডি-লাইন’ বোলিং বিতর্ক দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কে ফাটল ধরিয়েছিল। ফুটবলে প্রতিনিয়ত খেলোয়াড়রা আঘাত পান এবং প্রতি দেশের নিজস্ব খেলার ধরন অন্য দেশের কাছে সবসময় ‘অন্যায্য’ বা ‘ফাউল’ বলে মনে হয়। আর বক্সিংয়ের ক্ষেত্রে অরওয়েল গ্যালারির দর্শকদের আচরণকে ‘কুৎসিত ও পৈশাচিক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন, যেখানে একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে রক্তাক্ত করছে দেখে দর্শকরা উল্লাসে মেতে ওঠে।
তবে অরওয়েলের মতে, মাঠের খেলোয়াড়দের আচরণের চেয়েও অনেক বেশি ‘বিপজ্জনক এবং আশঙ্কাজনক’ হলো গ্যালারির দর্শকদের এবং পর্দার সামনে বসে থাকা সাধারণ মানুষের মানসিকতা। খেলোয়াড়রা তাও মাঠের নিয়মের মধ্যে থাকেন, কিন্তু দর্শকরা মেতে ওঠেন ‘লাগামহীন উন্মাদনায়’। তারা প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দের মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়ার জন্য ভুয়ো ধ্বনি দেয়, গালিগালাজ করে, বর্ণবাদী মন্তব্য করে এবং নিজেদের দলকে জেতাতে হিংস্র হয়ে ওঠে।
অরওয়েল তার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলেন, ভারত বা বার্মার (বর্তমান মিয়ানমার) মতো তরুণ দেশগুলোতে, যেখানে জাতীয়তাবাদ ও খেলাধুলা দুটিই নতুন বিষয় ছিল, সেখানে ফুটবল ম্যাচগুলোতে দর্শকদের শান্ত রাখতে শক্তিশালী পুলিশ মোতায়েন করতে হতো। বার্মায় তিনি নিজে দেখেছেন, এক দলের সমর্থকরা পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে মাঠে ঢুকে প্রতিপক্ষ দলের গোলকিপারকে মারধর করে জখম করে দিয়েছিল, যাতে সে গোল ঠেকাতে না পারে।
স্পেনে প্রথম বড় ফুটবল ম্যাচ আয়োজনের পর সেখানে দাঙ্গা বেঁধে গিয়েছিল। অরওয়েল আক্ষেপ করে বলেন, “যখন তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মনোভাব তৈরি হয়, তখন নিয়মের তোয়াক্কা না করে মানুষ কেবল অন্ধ বিজয় চায়। তারা চায় প্রতিপক্ষ দল যেন মাঠে অপমানিত ও অপদস্থ হয়।” এই যে অন্যের পরাজয়ে বা অপমানে আনন্দ পাওয়ার মানসিকতা, একেই অরওয়েল আধুনিক খেলার সবচেয়ে বড় বিষাক্ত দিক বলে মনে করেছেন।
কিন্তু প্রশ্ন জাগে, মানুষ কেন এই আধুনিক খেলার সংস্কৃতিতে এতটা বুঁদ হয়ে গেল? অরওয়েল এর পেছনে দুটি মূল কারণ দেখিয়েছেন। প্রথমটি হলো, আধুনিক শহুরে ও যান্ত্রিক জীবনযাত্রা। প্রাচীনকালে বা গ্রামীণ সমাজে মানুষ শারীরিক পরিশ্রম করত- তারা সাঁতার কাটত, গাছে চড়ত, মাইলের পর মাইল হাঁটত বা ঘোড়ায় চড়ত। তাদের ভেতরের শারীরিক শক্তি ও বাড়তি এনার্জি প্রাকৃতিকভাবেই খরচ হয়ে যেত। কিন্তু আধুনিক শহরের মানুষ অলস, যান্ত্রিক এবং একঘেয়ে জীবনযাপন করে। তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সৃজনশীল পথ থাকে না।
এই অবদমিত শক্তি এবং মানসিক চাপ বের করার জন্যই তারা খেলাধুলার মতো দলগত উন্মাদনাকে বেছে নেয়। দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে বড় কারণটি হলো ‘উগ্র জাতীয়তাবাদ’। আধুনিক যুগে মানুষ নিজেকে কোনো বড় শক্তি বা দেশের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে ভালোবাসে। তারা মনে করে যে, তাদের দেশের এগারোজন মানুষ যদি মাঠে অন্য দেশের এগারোজন মানুষকে হারিয়ে দিতে পারে, তবেই তাদের দেশ শ্রেষ্ঠ!
অরওয়েল একে ‘লুনাটিক মডার্ন হ্যাবিট’ বা আধুনিক যুগের এক পাগলামি বলে উল্লেখ করেছেন। দৌড়ানো, লাফানো বা একটা চামড়ার বলে লাথি মারার সঙ্গে যে কোনো জাতির নৈতিক বা আত্মিক শ্রেষ্ঠত্বের কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না- এই সহজ সত্যটি মানুষ ভুলেই যায়।
তিনি পরিষ্কার করেছেন যে, খেলাধুলা হয়তো যুদ্ধের মূল কারণ নয়, কিন্তু খেলাধুলা মানুষের ভেতরের ‘জাতীয়তাবাদী হিংসার’ আগুনকে আরও উস্কে দেয়। যখন এগারোজন মানুষকে ‘জাতীয় বীর’ বানিয়ে অন্য দেশের বিরুদ্ধে লড়তে পাঠানো হয় এবং মনে করা হয় যে হেরে গেলে পুরো জাতির ‘নাক কাটা’ যাবে, তখন তা শান্তির বদলে অশান্তিই ডেকে আনে।
খেলাধুলা অবশ্যই আমাদের শরীর ও মনের জন্য চমৎকার একটি বিষয়, এটি বিনোদনের দারুণ মাধ্যম। কিন্তু তা ততক্ষণই ইতিবাচক, যতক্ষণ তা স্রেফ একটি ‘খেলা’। খেলাকে বিনোদন হিসেবে গ্রহণ করা, প্রতিপক্ষের ভালো খেলার প্রশংসা করতে পারা এবং হারের গ্লানিকে সহজে মেনে নিতে পারার নামই হলো আসল সততা।
সূত্র: দ্য অরওয়েল ফাউন্ডেশন, দ্য টেলিগ্রাফ