Published : 11 Jun 2026, 11:05 PM
নতুন অর্থবছরে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, যা গত বছরের বরাদ্দের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
বরাদ্দের এই পরিমাণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১.০২ শতাংশ। বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৫ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা; যা ছিল জিডিপির ০.৫৮ শতাংশ।
বৃহস্পতিবার বিকালে জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, “স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগ ধাপে ধাপে বাড়িয়ে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি মোতাবেক আমরা দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে এক বা একাধিক আধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি।”
আমির খসরু বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী সময়ে’ স্বাস্থ্য খাতে অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ ও উপকরণ ক্রয়ে যে পরিমাণ ব্যয় হয়েছে, তার একটি বড় অংশই ‘দুর্নীতির মাধ্যমে লুটপাট’ করা হয়েছে। তাই স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন হয়নি।
সে কারণে, বর্তমানে দেশের হাসপাতালগুলো অতিরিক্ত রোগীর চাপে হিমশিম খাচ্ছে। সাধারণ মানুষ মানসম্মত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং বিপুল সংখ্যক রোগী বিদেশমুখী হওয়ায় মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা দেশ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অর্থমন্ত্রীর ভাষায়, স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বাড়ানোর মূল উদ্দেশ্যগুলো হলো- সর্বজনীন ও ন্যায়সংগত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা; চিকিৎসাকেন্দ্রিক থেকে প্রতিরোধকেন্দ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় রূপান্তর; গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া; মাতৃ, শিশু স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও টিকাদান জোরদার এবং স্বাস্থ্য প্রযুক্তি ও চিকিৎসা শিল্পের বিকাশ ঘটানো।
স্বাস্থ্যসেবা খাতে উন্নতির জন্য সরকারে বেশ কিছু উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, “নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি মোতাবেক আমরা দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে এক বা একাধিক আধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় প্রত্যেক নাগরিককে ন্যাশনাল হেলথ সিস্টেমের আওতায় আধুনিক ‘ই-হেলথ কার্ড’ প্রদান করা হবে।”
জটিল রোগের বিশেষায়িত চিকিৎসা সহজলভ্য ও সুশৃঙ্খল করার লক্ষ্যে প্রতিটি জেলা হাসপাতাল এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে সমন্বিতভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘সেকেন্ডারি স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট’ হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলেন আমির খসরু। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি মা, নবজাতক, শিশু ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা এবং ফিজিওথেরাপির ব্যবস্থা থাকবে বলেও তথ্য দেন তিনি।
সার্জারিসহ জটিল ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে কেন্দ্রীভূত করা হবে মন্তব্য করে মন্ত্রী বলেন, “করোনারি কেয়ার, কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিট, ইত্যাদির ব্যবস্থা থাকবে। রোগী পরিবহনের দুর্দশা লাঘবে জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স পুল ও জরুরি সেবা নেটওয়ার্ক গঠন করা হবে।”

সরকার একটি সমন্বিত, বিজ্ঞানভিত্তিক ও আধুনিক জাতীয় পুষ্টি কর্মসূচি প্রণয়নের লক্ষ্যে কাজ করছে তথ্য দিয়ে আমির খসরু বলেন, “পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের খর্বাকৃতি মোকাবেলায় সরকার বহুমুখী ও বহু-খাতভিত্তিক একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে।”
ওষুধ শিল্পে প্রণোদনা নিয়েও কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। শিল্প পার্কসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, গবেষণা, বিনিয়োগ ও নীতিগত সহায়তা অব্যাহত রাখার কথা বলেন।
এছাড়া এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে ঔষধ শিল্পের ধারাবাহিক বিকাশ, উদ্ভাবন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাজারে অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে প্রয়োজনীয় আর্থিক প্রণোদনা ও সহায়ক নীতিগত সুবিধা দেওয়ার কথা বলেন অর্থমন্ত্রী।
ওষুধ ও বিভিন্ন রোগের টিকা সরবরাহে গুরুত্ব দিয়ে আমির খসরু বলেন, “দেশব্যাপী একটি টেকসই ও আধুনিক ওষুধ ও ভ্যাকসিন সরবরাহ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে, যাতে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও সময়মত প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং টিকা পৌঁছানো সম্ভব হয়। আমাকে অত্যন্ত ব্যথিত হৃদয়ে বলতে হচ্ছে, বিগত সরকারগুলোর টিকা সংগ্রহ ও টিকাদান কার্যক্রম বাস্তবায়নে অবহেলা এবং যথাযথ পরিকল্পনার অভাবে দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে এবং শিশু মৃত্যুর মতো হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই প্রায় শতভাগ শিশুকে হাম-রুবেলা টিকা প্রদান করছে।”
‘ইন্টিগ্রেটেড মডিউলার পদ্ধতি’, আধুনিক ক্লিনিক্যাল শিক্ষাব্যবস্থা এবং এআইভিত্তিক চিকিৎসা জ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত করে একটি আধুনিক, দক্ষতাভিত্তিক ও ভবিষ্যতমুখী নতুন এমবিবিএস কারিকুলাম চালু করা হবে বলেও জানান তিনি।
চিকিসৎক নিয়োগের বিষয়ে আমির খসরু বলেন, “দীর্ঘদিনের শূন্যপদ পূরণের লক্ষ্যে অবিলম্বে ৫ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। নার্সিং ও মিডওয়াইফারি খাতে উচ্চশিক্ষা, পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ এবং নার্সিং বিষয়ে ব্যাচেলর ও মাস্টার্সের সুযোগ বৃদ্ধি করা হচ্ছে। দেশব্যাপী মানসম্মত ও জনমুখী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নতুন করে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যার ৮০ শতাংশ হবে নারী।”
স্থানীয় ও বৈদেশিক চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে শিক্ষিত বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য চার মাস মেয়াদি ‘জেনারেল কেয়ারগিভার’ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে বলেও তথ্য দেন অর্থমন্ত্রী।
এছাড়া সরকার চিকিৎসা সরঞ্জাম ও মেডিকেল ডিভাইস শিল্পকে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত শিল্পখাত হিসেবে উন্নয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলে ভাষ্য তার।
এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের ‘প্রাপ্তি’ নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলেন, “জিডিপির হিসাব অনুসারে বাজেট খুব ভালো হয়নি। তবে আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে এটি ইতিবাচক।”
তিনি বলেন, “বাজেটে গ্রাম পর্যায়ের মানুষের স্বাস্থ্যের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এটি ভালো দিক। কারণ একটি দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবার জায়গা সঠিক না হলে শহরের হাসপাতালে চাপ বৃদ্ধি পায়। সেদিক থেকে এবার বাজেটে ভালো কিছু সূচক দেখা গেছে। কারণ শুধু হাসপাতালের শয্যা বৃদ্ধি, জিনিসপত্র ক্রয়ে অর্থ বরাদ্দ করা হলে, সেটি খুব বেশি কার্যকর হয় না।”