Published : 08 Jul 2026, 11:58 PM
রপ্তানি আয় কমায় এবং আমদানি বাড়ায় বাণিজ্য ঘাটতে আরো বেড়েছে, সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত ১১ মাসে এসে ঠেকেছে প্রায় ২ হাজার ৪০০ কোটি (২৪ বিলিয়ন) ডলারে।
এই ঘাটতি আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ২৪ শতাংশ বেশি।
ডলার সংকটের কারণে আমদানি ব্যয়ের লাগাম টেনে ধরতে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছিল; তার সুফলও মিলেছিল। আমদানি ব্যয় বেশ কমে এসেছিল। তাতে বাণিজ্য ঘাটতিও অনেকটা কমে শেষ হয়েছিল ২০২৩-২৪ অর্থবছর।
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারও সেই একই পথ অনুসরণ করেছিল। তাতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও বাণিজ্য ঘাটতিতে নিম্মমুখী প্রবণতাই দেখা যায়। কিন্তু রপ্তানি আয় কমায় পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি ফের বাড়তে শুরু করে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বুধবার সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসের বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যের (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট-বিওপি) তথ্য প্রকাশ করেছে।
তাতে দেখা যায়, এই অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে পণ্য বাণিজ্যে সার্বিক ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩৯৮ কোটি ৪০ লাখ (প্রায় ২৪ বিলিয়ন) ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৯৩৭ কোটি ৭০ লাখ (১৯.৩৮ বিলিয়ন) ডলার।
বিদায়ী অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে ৬ হাজার ৪০২ কোটি ৩০ লাখ (৬৪.০৪ বিলিয়ন) ডলারের বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি করেছেন বাংলাদেশের ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা। এই অঙ্ক আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের এ সময়ে ৬০ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছিল।
অন্যদিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে ৪০ দশমিক শূন্য ৪ বিলিয়ন ডলার আয় করেছেন রপ্তানিকারকরা, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ২ শতাংশ কম।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের এই ১১ মাসে পণ্য রপ্তানি থেকে ৪০ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছিল।
এ হিসাবেই বিদায়ী অর্থবছরের ১১ মাসে পণ্য বাণিজ্যে সার্বিক ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলার।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি ৯ শতাংশ কমে ২ হাজার ৪৫ কোটি (২০.৪৫ বিলিয়ন) ডলারে নেমেছিল। আগের অর্থবছরে (২০২৩-২৪) এই ঘাটতি ছিল ২ হাজার ২৪৩ কোটি (২২.৪৩ বিলিয়ন) ডলার।
২০২২-২৩ অর্থবছরে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৭৩৮ কোটি (২৭.৩৮ বিলিয়ন) ডলার।
লেনদেন ভারসাম্যে ঘাটতি কমেছে
বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যে (ব্যালান্স অব পেমেন্ট-বিওপি) ঘাটতি কমেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই সূচকে ৩০ কোটি ১০ লাখ ডলারের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
১০ মাস শেষে (জুলাই-এপ্রিল) এই ঘাটতি ছিল ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি, ১২২ কোটি ৯০ লাখ ডলার।
নয় মাস শেষে অর্থাৎ জুলাই-মার্চ সময়ে ঘাটতি ছিল ৫৮ কোটি ৬০ লাখ ডলার। আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) ছিল ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলার। তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ঘাটতি ছিল ৪৮ কোটি ১০ লাখ ডলার।
অথচ প্রথম দুই মাসে অর্থাৎ জুলাই-আগস্ট সময়ে এই সূচকে ৪৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার উদ্বৃত্ত ছিল; এক মাসে অর্থাৎ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে উদ্বৃত্ত ছিল ২৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের ১১ মাসে (জুলাই-মে) বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যে ৭৭ কোটি ৮০ লাখ ডলারের ঘাটতি ছিল।
আর অর্থবছর (২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ৩০ জুন) শেষ হয়েছিল ১৪ কোটি ৯০ লাখ ডলার উদ্বৃত্ত নিয়ে।
আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্ত ৪.১৬ বিলিয়ন ডলার
ব্যালান্স অব পেমেন্টে ঘাটতি থাকলেও আর্থিক হিসাবে (ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট) বড় উদ্বৃত্ত ধরে রেখেছে বাংলাদেশ।
২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্তের পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার। ৩২০ কোটি (৩.২০ বিলিয়ন) ডলারের উদ্বৃত্ত নিয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষ হয়েছিল।
২০২৫-২৬ অর্থবছর ঘাটতি দিয়ে শুরু হয়। প্রথম মাস জুলাইয়ে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৯১ কোটি ৬০ লাখ ডলার। দুই মাসে অর্থাৎ জুলাই-অগাস্ট সময়ে এই ঘাটতি কমে ৫২ কোটি ৫০ লাখ ডলারে দাঁড়ায়।
তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্ত ছিল ১৬৬ কোটি (১.৬৬ বিলিয়ন) ডলার। ডিসেম্বর শেষে অর্থাৎ অর্থবছরের প্রথমার্ধে এই উদ্বৃত্ত বেড়ে ২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে ২ দশমিক শূন্য ৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। নয় মাস শেষে (জুলাই-মার্চ) উদ্বৃত্ত ছিল ৩ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলার।
১১ মাস শেষে (জুলাই-মে) তা বেড়ে আবার ৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে ৪ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
অথচ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এই ১১ মাসে আর্থিক হিসাবে ২১ কোটি ৪০ লাখ ডলারের ঘাটতি ছিল।
সামগ্রিক লেনদেনে উদ্বৃত্ত ৪ বিলিয়ন ডলার
সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যে (ওভারঅল ব্যালান্স) ৩২৯ কোটি (৩.২৯ বিলিয়ন) ডলারের বড় উদ্বৃত্ত নিয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষ হয়েছিল। আর ৪৩০ কোটি (৪.৩০ বিলিয়ন) ডলারের বিশাল ঘাটতি নিয়ে শেষ হয়েছিল ২০২৩-২৪ অর্থবছর।
বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরও ঘাটতি দিয়ে শুরু হয়। প্রথম মাস জুলাইয়ে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৫৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার। তবে দুই মাস শেষে অর্থাৎ জুলাই-আগস্ট সময়ে সেই ঘাটতি কমে ৫ কোটি ৩০ লাখ ডলারে নামে।
তিন মাস (জুলাই-সেপ্টেম্বর) শেষে ৮৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার উদ্বৃত্ত হয়। এর পর থেকে উদ্বৃত্তের পরিমাণ বাড়তে থাকে; ১১ মাস শেষে অর্থাৎ জুলাই-মে সময়ে ৪০১ কোটি ৯০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের এই ১১ মাসে এই সূচকে ১১৫ কোটি ১০ লাখ ডলারের ঘাটতি ছিল।