Published : 12 Jun 2026, 12:34 AM
স্থানীয় সরকার ও নগর অবকাঠামো উন্নয়নে পৌর বন্ড ইস্যুর কাঠামো প্রণয়ন করতে চায় সরকার। দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়নের বিকল্প উৎস গড়ে তুলতে অর্থমন্ত্রী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এ উদ্যোগের কথা বলেছেন।
বৃহস্পতিবার সংসদে বাজেট বক্তৃতায় টেকসই আর্থিক ব্যবস্থার নানা উদ্যোগ তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়নের বিকল্প উৎস গড়ে তুলতে করপোরেট বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণ, স্থানীয় সরকার ও নগর অবকাঠামো উন্নয়নে পৌর বন্ড ইস্যুর কাঠামো প্রণয়ন করা হবে।”
পৌর বন্ড বা মিউনিসিপ্যাল বন্ড হলো এমন এক ধরনের ঋণপত্র; যা স্থানীয় সরকার বা সিটি করপোরেশনগুলো তাদের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক এবং রাজস্ব-উৎপাদনকারী প্রকল্প (যেমন- আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট, সড়ক, সেতু, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ইত্যাদি) বাস্তবায়নের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে মূলধন সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ইস্যু করে থাকে।
ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের ওপর চাপ কমিয়ে পুঁজিবাজারের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ নিশ্চিতের এই উদ্যোগ তাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত কার্যকর বলে মনে করেন অনেকে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান নগরায়ন এবং মেগা সিটিগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য বিপুল পরিমাণ দীর্ঘমেয়াদী মূলধনের প্রয়োজন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঐতিহ্যগতভাবে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো, বিশেষ করে সিটি করপোরেশনগুলো তাদের উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য সরকারের থোক বরাদ্দ, রাজস্ব বাজেট এবং ব্যাংকনির্ভর ঋণায়নের ওপর নির্ভরশীল।
তাই পৌর বন্ড চালুর উদ্যোগ প্রথাগত অর্থায়ন মডেল থেকে বেরিয়ে আসার একটি সুস্পষ্ট এবং সময়োপযোগী দিকনির্দেশনা।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পৌর বন্ডের ধারণাটি নীতিগতভাবে আকর্ষণীয় হলেও বাস্তবায়নের দিক থেকে এখনও বেশ কঠিন। তাই তুলনামূলক সক্ষম সিটি করপোরেশন বা পৌরসভায় ‘পাইলট প্রকল্প’ হিসেবে এটি নেওয়া উচিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও উন্নয়ন গবেষক ড. মুহাম্মদ শাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পৌর বন্ড মূলত পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অর্থায়নের একটি মাধ্যম। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব আয় ও বাজেটের বাইরে অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা যেতে পারে। তবে পৌর বন্ড কতটা কার্যকর হবে, তা এর কাঠামো বা বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করবে।
“পৌর বন্ডটি সরকারের দায় হবে, নাকি সংশ্লিষ্ট পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের দায় হবে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ বন্ডের বৈশিষ্ট্য না জেনে এর সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করা কঠিন।”
যদি সরকার বন্ড ইস্যু করে পৌর অবকাঠামো উন্নয়নের অর্থায়ন করে, তাহলে বিনিয়োগকারীদের কাছে এটি তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হবে বলে মনে করছেন তিনি।
সরকারকে দেওয়া অর্থকে সাধারণত ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগ হিসেবে ধরা হয়। ফলে বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা গেলে সরকারের জন্য বিকল্প অর্থায়নের একটি উৎস তৈরি হবে বলেও মত দেন অর্থনীতির এই শিক্ষক।
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বন্ড বাজার সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরে তিনি বলেন, “ব্যাংক খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে সরকারি ঘাটতি অর্থায়ন করা হলে, বেসরকারি খাত ও বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিনিয়োগ কমে গেলে কর্মসংস্থানও কমবে। সে কারণে ব্যাংকনির্ভরতার বাইরে বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।”
ড. সিদ্দিকীর মতে, পৌর বন্ডের ধারণাটি সেই বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, “সরকার বন্ড মার্কেটকে শক্তিশালী করতে চাইছে। ট্রেজারি বন্ডের মতোই জনগণ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে বিনিয়োগের সুযোগ দিয়ে উন্নয়ন অর্থায়নের নতুন পথ তৈরি করা যেতে পারে।”
যদি সিটি করপোরেশনের জন্য বন্ড ইস্যু করা হয়, তাহলে কত টাকা সংগ্রহ করা হবে তার একটি স্পষ্ট লক্ষ্যমাত্রা থাকতে হবে মত দিয়ে ড. সিদ্দিকী বলেন, “সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন কর্মকাণ্ডগুলো জাতীয় বাজেটে সরাসরি অন্তর্ভুক্ত না হয়ে বন্ডের মাধ্যমে অর্থায়ন হবে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতেও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে, কোন কোন প্রকল্প বন্ডের অর্থে বাস্তবায়িত হবে।
“তবে সরকার যদি ব্যাপকভাবে বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে এবং সিটি করপোরেশনগুলোর ওপর যথাযথ দায়বদ্ধতা না দেয়, তাহলে তারা নিজেদের সম্ভাব্য রাজস্ব আহরণে ততটা গুরুত্ব নাও দিতে পারে। সিটি করপোরেশনগুলোর সুবিধার জন্য এ ধরনের অর্থায়ন ব্যবস্থা তৈরি করা হলেও তাদের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে একটি জবাবদিহিতার সম্পর্ক থাকতে হবে।
“বন্ডের অর্থ তো শেষ পর্যন্ত পরিশোধ করতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, সেই দায় কার হবে? যদি সিটি করপোরেশনের উন্নয়নের জন্য বন্ড ইস্যু করা হয়, তাহলে তাদের আয়ের একটি অংশ থেকে সেই অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা থাকতে হবে। আর যদি তারা তা না করে, তাহলে যেহেতু এটি সরকারি বন্ড, শেষ পর্যন্ত সরকারকেই দায় নিতে হবে।
“তবে একটি সিটি করপোরেশনকে কার্যকর, সক্ষম ও উন্নয়নমুখী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হলে, তার নিজস্ব আয়ের ভিত্তি শক্তিশালী করে পাশাপাশি বন্ডের মাধ্যমে অর্থায়নের সুযোগও তৈরি করা বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় একটি ভালো ধারণা বলে মনে করি।”

বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ ও পাইলট প্রকল্পের পরামর্শ
পৌর বন্ড কেমন হবে, এর মাধ্যমে আসলেই উন্নয়ন হবে কিনা কিংবা এতে কোনো ঝুঁকি আছে কিনা- এমন নানা প্রশ্নের জবাব দেন সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর নির্বাহী পরিচালক এবং ঢাবির অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান। তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে পৌর বন্ডের ধারণাটি নীতিগতভাবে আকর্ষণীয় হলেও বাস্তবায়নের দিক থেকে এখনো বেশ কঠিন।
“স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব আয় সীমিত। পাশাপাশি কর ও ফি আদায়ের সক্ষমতা দুর্বল, হিসাবরক্ষণ ও আর্থিক প্রতিবেদন অনেক ক্ষেত্রে মানসম্মত নয়। প্রকল্পভিত্তিক নগদ প্রবাহের পূর্বাভাসও নির্ভরযোগ্য নয় যথেষ্ট। পৌর বন্ড সফল করতে হলে বিনিয়োগকারীদের বোঝাতে হবে, কোন আয় থেকে সুদ ও আসল পরিশোধ হবে। শুধু সরকারি ঘোষণায় আস্থা তৈরি হবে না।”
বন্ড চালুর জন্য ক্রেডিট রেটিং, নিরীক্ষিত আর্থিক হিসাব, স্বচ্ছ প্রকল্প নির্বাচন, আয়ের নির্দিষ্ট উৎস এবং প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় সরকারের আংশিক গ্যারান্টি বা ক্রেডিট এনহান্সমেন্ট প্রয়োজন হবে বলেও মনে করেন তিনি।
সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা এখনই বড় পরিসরে পৌর বন্ড কিনতে কতটা আগ্রহী হবেন, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন ড. রায়হান। তিনি বলেন, “ব্যাংক খাত দুর্বল, পুঁজিবাজারে আস্থা কম আর স্থানীয় সরকারগুলোর আর্থিক শৃঙ্খলা সম্পর্কে বিনিয়োগকারীদের ধারণাও খুব শক্তিশালী নয়।”
তার মতে, সরাসরি বড় আকারে পৌর বন্ড চালু না করে প্রথমে কয়েকটি তুলনামূলক সক্ষম সিটি করপোরেশন বা পৌরসভায় পাইলট প্রকল্প নেওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে পানি সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বাস টার্মিনাল, বাজার, পার্কিং বা নগর সেবা ফি থেকে আয় আসে, এমন প্রকল্পগুলো উদ্যোগের জন্য উপযুক্ত হতে পারে।
নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বাজেটে পৌর বন্ডের বিষয়টি অর্থ বরাদ্দের ঘোষণা নয় বরং একটি নীতিগত ঘোষণা। জনগণ বিষয়টিতে কতটা আস্থা রাখবে সেটি গুরুত্বপূর্ণ। আর্থিক সংকটের মূল কারণগুলো সমাধান না করে শুধু বন্ড চালু করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল মিলবে না।
“অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। সরকার এই কাঠামো কীভাবে তৈরি করে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।”
এদিকে বন্ড চালু বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোহাম্মদ মামুন-উল-হাসান, “পৌর বন্ড চালুর বিষয়টি সরকারি সিদ্ধান্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এটি যদি বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে সেটি সারা দেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জন্যই প্রযোজ্য হবে। সে ক্ষেত্রে আমাদেরও তা অনুসরণ করতে হবে।”