Published : 15 Jul 2026, 11:54 PM
টানা ভারি বর্ষণে সৃষ্ট বন্যায় চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলায় ৪৪ হাজার ৭৯৩ হেক্টর জমির ফসল এবং ৮৪৬টি সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
বুধবার রাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে প্রেস ব্রিফিংয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পাঁচটি জেলার চিত্র তুলে ধরেন তিনি।
কোথায় কত ক্ষতি
মাঠপর্যায় থেকে সংগ্রহ করা প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিমন্ত্রী বলেন, পাঁচটি জেলায় কৃষি খাতে ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ প্রায় ৪৪ হাজার ৭৯৩ হেক্টর। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা আনুমানিক ২ লাখ ৮৭ হাজার ৭৩৫ জন।
“পানি পুরোপুরি নেমে যাওয়ার পর প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।”
তিনি বলেন, “মৎস্য খাতে প্রাথমিক হিসাবে দেখা গেছে, ২৩ হাজার ৬১০টি পুকুর, দীঘি বা খামার এবং ৭৮৯টি মাছের ঘের প্লাবিত হয়েছে। এই খাতে আনুমানিক অর্থনৈতিক ক্ষতি প্রায় ২১০ কোটি টাকা।”
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) চট্টগ্রাম বিভাগের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের সংখ্যা প্রায় ৮৪৬টি, যার মধ্যে সংযোগ বিচ্ছিন্ন সড়ক ২১টি।
“ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের দৈর্ঘ্য প্রায় ৫৫৫ কিলোমিটার। আর অ্যাপ্রোচ রোডসহ ক্ষতিগ্রস্ত ব্রিজ-কালভার্টের সংখ্যা প্রায় ২৩৫টি। এসব মেরামতে আনুমানিক ব্যয় হবে প্রায় ৪২৩ কোটি টাকা।”
বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই এমন সড়কগুলো মেরামত কাজ চলার কথা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আগামী দুয়েক মাসের মধ্যে তা সম্পন্ন হবে বলে আশা করছি। সড়ক ও জনপথ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচটি জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত মহাসড়কের পরিমাণ ২১২ দশমিক ৯৪ কিলোমিটার, পাশাপাশি পাঁচটি ব্রিজ ও একটি কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
“চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার ৪০০ মিটার জায়গা পানিবন্দি থাকার কারণে বিচ্ছিন্ন ছিল। এই মুহূর্তে কয়েকদিন ধরে চট্টগ্রামের সঙ্গে কক্সবাজারের সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক রয়েছে। ইতোমধ্যে চট্টগ্রামের সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল জেলা এবং কক্সবাজারের সংযোগ পুনঃস্থাপন করতে পেরেছি এবং আন্তঃজেলা সংযোগও পুনঃস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছি।
“এই মুহূর্তে শুধুমাত্র বান্দরবার থেকে রাঙামাটি যাওয়ার পথে যে ব্রিজটি রয়েছে, সেটির সংস্কার কাজ চলমান। আশা করছি আগামী চার-পাঁচ দিনের মধ্যে সেই সংযোগ পুনঃস্থাপন করতে সমর্থ হব।”

ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ১১ লাখ মানুষ
পাঁচ জেলায় বন্যায় আনুমানিক ১০ লাখ ৮৫ হাজার ৮৬০ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “এর মধ্যে কম বেশি ক্ষতিগ্রস্ত আছে। বন্যার শুরু থেকে আজ পর্যন্ত আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া মানুষ প্রায় ৪৫ হাজার ৭৫০ জন।
“যদিও ইতোমধ্যে অধিকাংশ মানুষ আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে বাড়ি ফেরা শুরু করেছে। দুদিন ধরে বন্যার পানি নেমে যাচ্ছে।”
বুধবার ২ হাজার ২৯৪ জনের আশ্রয় কেন্দ্রে থাকার তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, “চট্টগ্রাম জেলায় ১ হাজার ৪৯৫ জন রয়েছেন। কক্সবাজার জেলায় ৩১০ জন রয়েছেন। রাঙামাটি জেলায় ২৯৩ জন ও বান্দরবান জেলায় ২০০ জন রয়েছেন। খাগড়াছড়িতে আশ্রয়কেন্দ্রে কেউ নেই।”
প্রতিমন্ত্রী বলেন, “সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ও ক্ষতির ধরণ যদি আমরা বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখব চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, বোয়ালখালী ও সন্দ্বীপ উপজেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”
এ ছাড়া কক্সবাজারে রামু, পেকুয়া, চকরিয়া, মাতামুহুরী উপজেলা, রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি, বরকল, বিলাইছড়ি, জুড়াছড়ি, কাপ্তাই ও কাউখালি উপজেলা, খাগড়াছড়ি জেলার দিঘীনালা, মহালছড়ি, খাগড়াছড়ি সদর, পানছড়ি ও মাটিরাঙা উপজেলা এবং বান্দরবান জেলার বান্দরবান সদর, নাইক্ষ্যংছড়ি, লামা ও রুমা উপজেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও তথ্য দেন তিনি।
‘দুই ঘণ্টার মধ্যে খাবার পৌঁছাবে’
বন্যার্ত পরিবারের প্রয়োজনে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পেলে দুই ঘণ্টার মধ্যে সেই পরিবারের কাছে খাবার পৌঁছানোর চেষ্টা করার কথা ব্রিফিংয়ে তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী অমিত।
তার কথায়, “এই আত্মবিশ্বাস কেন রয়েছে? কারণ আমরা একটি কাজ প্রথম দিন থেকে করছি। আমরা প্রতিটি উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য একজন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাকে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করেছি। যাতে করে আমরা কাজটা সুচারুরূপে করতে পারি।
“সে কারণে আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি, এই যে উপদ্রুত এলাকার যে প্রান্তে ভুক্তভোগী মানুষ রয়েছে, যার কাছে আমরা এখনো পৌঁছাতে পারিনি। আপনারা আমাদের তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সহায়তা করবেন। আমি আপনাদেরকে কথা দিচ্ছি, চেষ্টা করব সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টার মধ্যে সেখানে খাবার পৌঁছাতে।”
তিনি বলেন, “জরুরি গৃহনির্মাণ ও সংস্কারের অনুদান আমরা দেব। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান করতে ভিজিডি, ভিজিএফ কর্মসূচির কর্ম সৃজন আওতা বৃদ্ধি করব। একইসঙ্গে সহজ শর্তে কৃষি ও ক্ষুদ্র ঋণের সুবিধা প্রদান করব।
“দুর্যোগ সহনশীল অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ, ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ সড়ক-কালভার্ট-বাঁধগুলো কেবল মেরামতই করা হবে না; বরং জলবায়ু পরিবর্তন ও ভবিষ্যতের বন্যা মোকাবেলার উপযোগী করে আধুনিক টেকসই প্রযুক্তিতে পুনঃনির্মাণ করা হবে।”
ব্রিফিংয়ে চট্টগ্রামের সিটি মেয়র শাহাদাত হোসেন, সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান, চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা উপস্থিত ছিলেন।