Published : 01 Apr 2026, 06:51 PM
“বাহাত্তরের সংবিধান মুজিববাদী সংবিধান। এই সংবিধানের কবর রচনা করতে হবে।” জুলাই অভ্যুত্থানের সামনের সারিতে থাকা তরুণদের কেউ কেউ, যারা পরবর্তীকালে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গঠন করেছেন, তাদের তরফে এরকম কথা শোনা গেছে বহুবার। বক্তব্যে তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু বাহাত্তরের সংবিধান। যে সংবিধানটি রচিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরের বছর।
বাহাত্তরের সংবিধানকে তারা কেন ছুঁড়ে ফেলতে চান বা এর কবর রচনা করতে চান, কীভাবে এটি ‘ফ্যাসিস্ট সংবিধান’—এ বিষয়ে তাদের ব্যাখ্যা খুব একটা পরিষ্কার নয়। সংবিধানের কোনো বিধান বা অনুচ্ছেদ নিয়ে আপত্তি থাকলেও, পুরো সংবিধান ছুঁড়ে ফেলা বা তার কবর রচনার মতো বক্তব্যের পেছনে অন্য কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে কি না—জনমনে ওই প্রশ্নও রয়েছে।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে স্বয়ং আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপির সংসদ সদস্য আন্দালিভ রহমান পার্থ ওই প্রশ্ন তুলেছেন। যারা বাহাত্তরের সংবিধান ছুঁড়ে ফেলতে চায় তাদের (জামায়াত ও এনসিপি) উদ্দেশ করে পার্থ প্রশ্ন রাখেন, “সংবিধানকে ছুড়ে ফেলব কেন? সংবিধান কি মনে করিয়ে দেয় যে, এটা একাত্তরের পরাজয়ের দলিল? সংবিধান নিয়ে এত গাত্রদাহ কেন?”
আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, বাহাত্তরের সংবিধানের সাথে লাখো শহীদের রক্তের ঋণ জড়িয়ে আছে। লাখো মা বোনের সম্ভ্রম জড়িয়ে আছে। এই সংবিধানকে সামনে রেখেই যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।
গত ২৯ মার্চ জাতীয় সংসদে এনসিপির সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ বলেন, নতুন প্রজন্ম বা ‘জেন-জি’রা আর বাহাত্তরের সংবিধান চায় না। এর পরদিন জামায়াতের এমপি শফিকুল ইসলাম মাসুদ বিএনপিকে লক্ষ্য করে বলেন, “যে সংবিধান খালেদা জিয়া ছুঁড়ে ফেলে দিতে চেয়েছিলেন, সেই বাহাত্তরের সংবিধানের প্রতি সরকারি দলের কেন এত প্রেম জাগ্রত হলো, তা জনগণ জানতে চায়।” এরপর মঙ্গলবার জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ নিয়ে বিরোধী দলীয় নেতার মূলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় জামায়াত ও এনসিপির আরও অনেক এমপি একই সুরে কথা বলেন। তাদের প্রশ্ন, খালেদা জিয়া যে সংবিধান ছুঁড়ে ফেলতে চেয়েছিলেন, ওই সংবিধানের প্রতি বিএনপির কেন এত প্রেম? প্রশ্ন হলো, খালেদা জিয়া কি সত্যিই সংবিধান ছুঁড়ে ফেলার কথা বলেছিলেন? ওই প্রশ্নে পরে আসছি।
সংবিধান কোনো ধর্মগ্রন্থ নয়, তবে এটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। নাগরিকের মৌলিক অধিকারের রক্ষাকবচ হলো এই দলিল। সংবিধান এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, সেখানে বর্ণিত মৌলিক অধিকারের পরিপন্থি কোনো আইন রাষ্ট্র প্রণয়ন করতে পারে না। পৃথিবীর খুব কম দেশই এত বড় ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা ও সংবিধান অর্জন করেছে। তাই একে ছুঁড়ে ফেলার কথা বলা রীতিমতন ধৃষ্টতা। পৃথিবীর অন্য অনেক বড় ও গণতান্ত্রিক দেশও লাখো মানুষের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশের মতো একটি ছোট্ট ভূখণ্ড স্বাধীন হয়েছে লাখ লাখ মানুষের রক্ত আর অসংখ্য নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে। ওই শহীদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে লিখিত হয়েছে যে সংবিধান, ওই সংবিধান ছুঁড়ে ফেলা বা তার কবর রচনা করতে চাওয়ার পেছনে সংবিধানের কোনো বিধানের ত্রুটি-বিচ্যুতি নয়, বরং অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে।
পৃথিবীর কোনো সংবিধানই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। পৃথিবীর কোনো সংবিধানই সম্ভবত ওই দেশের শতভাগ নাগরিকের শতভাগ অধিকার নিশ্চিত করতে পারে না। আবার আজ যে বিধান করা হলো, ১০ বছর পরে ওই বিধানটি সময়ের বাস্তবতায় পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে। যে কারণে সংবিধানের ভেতরেই সংবিধান সংশোধনের বিধান রাখা হয়।
বাংলাদেশের সংবিধানের কোনো অনুচ্ছেদ নিয়েও নাগরিকদের অস্বস্তি বা আপত্তি থাকতে পারে। ওই আপত্তি নিয়ে নাগরিকরা কথা বলতে পারেন। লিখতে পারেন। যেমন সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংসদ সদস্যদের বাকস্বাধীনতা খর্ব করে—এই অভিযোগ বেশ পুরোনো এবং এ নিয়ে বহু বছর ধরে সমালোচনা চলেছে। এমনকি ১৯৭২ সালে যখন নতুন রাষ্ট্রের জন্য সংবিধান রচনা করা হয়, তখনও গণপরিষদে এই বিধানের সমালোচনা করে সদস্যরা বক্তব্য দিয়েছেন। নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন। সমালোচনার মুখে এই অনুচ্ছেদটি একাধিকবার পরিবর্তনও করা হয়েছে। এটাই গণতান্ত্রিক রীতি। বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধান প্রধানমন্ত্রীকে যে অবারিত ক্ষমতা দিয়েছে এবং রাষ্ট্রপতিকে যেভাবে ঠুঁটো জগন্নাথ বানিয়ে রেখেছে—তারও সমালোচনা আছে। এ নিয়েও একাডেমিক ও জনপরিসরে বিস্তর সমালোচনা আছে। কিন্তু সংবিধানের এক বা একাধিক অনুচ্ছেদের সমালোচনা আছে মানে ওই সংবিধান ছুঁড়ে ফেলতে হবে বা তার কবর রচনা করতে হবে—এই ধরনের বক্তব্য খুবই বিপজ্জনক।
মুক্তিযুদ্ধের পর গণপরিষদে যে সংবিধান প্রণীত হয়, এনসিপির কোনো কোনো নেতা তাকে ‘মুজিববাদী সংবিধান’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। অথচ ১৯৭২ সালের ওই সংবিধানে শেখ মুজিবুর রহমানের নাম কোথাও নেই। বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা ঘোষণা, ৭ মার্চের ভাষণ ও ২৫ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা সংবিধানে যুক্ত করা হয়েছে ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে।
তাই যদি ‘মুজিববাদী সংবিধান’ বলতেই হয়, তাহলে সেটা পঞ্চদশ সংশোধনীর পরের সংবিধানকে বলা যায়। ১৯৭২ সালের সংবিধানকে মুজিববাদী বলার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তবে এটা ঠিক যে, সংবিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় বঙ্গবন্ধুর নিয়ন্ত্রণ ও ভূমিকা ছিল—যা সে সময়ের বাস্তবতায় স্বাভাবিক ছিল।
বরং বাহাত্তরের সংবিধান থাকলে জামায়াত রাজনীতি করারই সুযোগ পেত না। কেননা বাহাত্তরের মূল সংবিধানে ধর্মভিত্তিক দলের রাজনীতি করার কোনো সুযোগ ছিল না। সংবিধানের ৩৮ নম্বর অনুচ্ছেদের বিধান ছিল এরকম: “জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতার স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে সমিতি বা সঙ্ঘ গঠন করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে; তবে শর্ত থাকে যে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যসম্পন্ন বা লক্ষ্যানুসারী কোনো সাম্প্রদায়িক সমিতি বা সঙ্ঘ কিংবা অনুরূপ উদ্দেশ্যসম্পন্ন বা লক্ষ্যানুসারী ধর্মীয় নামযুক্ত বা ধর্মভিত্তিক অন্য কোনো সমিতি বা সঙ্ঘ গঠন করিবার বা তাহার সদস্য হইবার বা অন্য কোনো প্রকারে তাহার তৎপরতায় অংশগ্রহণ করিবার অধিকার কোনো ব্যক্তির থাকিবে না।”
তার মানে ধর্মীয় নামযুক্ত কোনো রাজনৈতিক দল তো দূর থাক, সংগঠন করাও নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু পঁচাত্তরের ১৫ অগাস্টের পটপরিবর্তনের পরে জিয়াউর রহমান যখন বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথ উন্মুক্ত করলেন, তখন সংবিধানের এই ৩৮ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সুযোগ উন্মুক্ত করা হয়। অর্থাৎ ৩৮ নম্বর অনুচ্ছেদ সংশোধন করে জিয়াউর রহমান এই সুযোগ করে দিয়েছিলেন বলেই ধর্মভিত্তিক বা ধর্মীয় নামযুক্ত দল হওয়া সত্ত্বেও, উপরন্তু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি বিরোধিতা করা সত্ত্বেও জামায়াতে ইসলামী এখন দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলই শুধু নয়, বরং তারা সংসদের প্রধান বিরোধী দল।
সুতরাং জামায়াত ও এনসিপি যে সংবিধানকে ‘বাহাত্তরের সংবিধান’ বলে ছুঁড়ে ফেলতে চায়, সেই সংবিধান আসলে এখন দেশে কার্যকর নেই। বাহাত্তরের সংবিধান কার্যকর থাকলে জামায়াতের রাজনীতিই বিকশিত হতো না। মোদ্দা কথা, জামায়াত ও এনসিপি যে বাহাত্তরের সংবিধান ছুঁড়ে ফেলতে চায় বা এর কবর রচনা করতে চায়, ওই সংবিধানটি এই মুহূর্তে দেশে নেই।
প্রশ্ন হলো, বাহাত্তরের সংবিধানটি আওয়ামী লীগ নেতাদের হাতে রচিত এবং তা প্রণয়নে বঙ্গবন্ধুর অনেক বড় ভূমিকা ছিল বলেই কি মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি এবং তাদের পরবর্তী প্রজন্ম তা ছুঁড়ে ফেলতে চায় বা এর কবর রচনা করতে চায়? প্রশ্নটি আন্দালিভ রহমান পার্থের মনে যেমন আছে, তেমনি এই প্রশ্ন আছে দেশের অগণিত মানুষের মনে।
আসা যাক খালেদা জিয়ার প্রসঙ্গে। জামায়াত ও এনসিপির দাবি, খালেদা জিয়া সংবিধান ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার কথা বলেছিলেন। আসলে কি তা-ই? ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাহাত্তরের সংবিধানের অনেক বিধান ফিরিয়ে আনা হয়। যদিও সংবিধানের শুরুতে বিসমিল্লাহ এবং রাষ্ট্রধর্মসহ আরও অনেক বিধান বহাল রাখা হয়। ওই সংশোধনীর প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকেই তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপি এর কড়া সমালোচনা করেছে। এমনকি সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটিতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার নাম চাইলেও তাতে সাড়া দেয়নি বিএনপি।
সংবিধান সংশোধনের পরের মাসে খালেদা জিয়া বিএনপির একটি গণঅনশন কর্মসূচিতে বলেন, “আওয়ামী লীগ আজীবন ক্ষমতায় থাকার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ বিভিন্ন সংশোধনী এনেছে। আমরা বলতে চাই, এসব সংশোধনী আওয়ামী ইশতেহার। এটা জনগন মানে না। আগামী সরকার পরিবর্তনের পর এসব সংশোধনী ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হবে।” (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ১৩ জুলাই ২০১১)। অর্থাৎ তিনি এ কথা বলেননি যে সংবিধান ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হবে কিংবা তিনি সুনির্দিষ্টভাবে এটা বলেননি যে, বাহাত্তরের সংবিধান ছুঁড়ে ফেলা দেয়া হবে। তবে তর্কের খাতিরে ধরা যাক, খালেদা জিয়া সংবিধানের সংশোধনী নয়, বরং সংবিধান ছুঁড়ে ফেলার কথাই বলেছিলেন। যদি তিনি এটা বলেও থাকেন, ওই রেফারেন্স ধরে অন্যরাও একইভাবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইনকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার কথা বলবেন, তা কাঙ্ক্ষিত নয়। যৌক্তিক নয়। বরং সংবিধানের কোনো বিধান নিয়ে আপত্তি থাকলে সেটি সংশোধনের সুযোগ সংবিধানের ভেতরেই আছে।