Published : 08 Jan 2026, 04:18 PM
ভোটের মাঠে আওয়ামী লীগ না থাকলে বিএনপি এবং বিএনপি মাঠে না থাকলে আওয়ামী লীগ একাই একশ; কারও সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে তাদের নির্বাচন করার প্রয়োজন নেই—এমন একটি ধারণা রাজনীতিতে প্রচলিত ছিল। কিন্তু ওই ধারণা কি এখনো আছে? যদি থাকে তাহলে এবার আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে বিএনপিকে কেন তুলনামূলক ছোট দলগুলোর সঙ্গে জোট করতে হলো?
এবার বিএনপির সঙ্গে কারা জোট করল আর কাদের সঙ্গে বিএনপির জোট হলো না, তার চেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, জামায়াতের নেতৃত্বাধীন বেশ কয়েকটি ইসলামী দলসহ ১১ দলীয় জোটের সমীকরণ—যেখানে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-ও আছে। আবার এই জোটকে ‘জামায়াতের নেতৃত্বাধীন’ বললে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ‘মনক্ষুণ্ন’ হবে কি না, তাও বলা কঠিন।
অন্যদিকে, জুলাই অভ্যুত্থানের সামনের সারিতে থাকা তরুণদের দল এনসিপি যে এককভাবে তিনশ আসনে প্রার্থী দেবে বলে শোনা যাচ্ছিল এবং যারা ১২৫টি আসনে প্রার্থীও ঘোষণা করেছিল, শেষ মুহূর্তে জামায়াতের সঙ্গে তাদের জোটবদ্ধ হওয়ার ঘটনা অনেককে বিস্মিত করেছে।
ট্র্যাজেডি হলো, ব্যাপক ঢাকঢোল পিটিয়ে এবং জনগণের প্রত্যাশার পারদ চড়িয়ে আত্মপ্রকাশ করা দল এনসিপিকে এখন ১০টির বেশি আসন পাওয়ার জন্য জামায়াতের সঙ্গে দেন-দরবার করতে হচ্ছে বলে সংবাদমাধ্যমে খবর আসছে। অথচ দলটি শুরু থেকে বলছিল, তারা কোনো বলয়ের ভেতরে ঢুকবে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা জামায়াতের বলয়ে ঢুকে একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সম্ভাবনা অঙ্কুরেই নষ্ট করল এবং এনসিপিকে যে জামায়াতেরই ‘বি টিম’ বলা হয়, সেই প্রচারের পালে হাওয়া দিল।
জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার সময় প্রাথমিকভাবে ৩০টি আসনের ব্যাপারে সমঝোতা হয়েছিল এনসিপির। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে তা নেমে আসতে পারে ১০০-এর নিচে। এতে বাদ পড়তে পারেন এনসিপির বেশ কয়েকজন আলোচিত নেতা। যা নিয়ে ফের উত্তাল হতে পারে দলটির অন্দরমহল—এমন গুঞ্জনও রয়েছে। ১০ ও ৩০-এর মাঝামাঝি ২০টি আসন শেষমেষ এনসিপি পাবে কি না, সম্ভবত তা নিয়েই আলোচনা চলছে।
জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ায় দিন শেষে এনসিপি কতটা লাভবান হবে, তা এখনই বলা কঠিন। তবে বোঝা যাচ্ছে, জামায়াতের সঙ্গে তাদের জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনের মূল কারণ নিম্ন ও উচ্চকক্ষে কয়েকটি আসন নিশ্চিত করা। তারা হয়তো ভেবেছে বা মাঠপর্যায়ের জরিপ হয়তো বলছে যে, এককভাবে নির্বাচন করলে তারা একটি আসনও পাবে না। কেননা, এককভাবে নির্বাচন করলে তাদেরকে বিএনপি ও জামায়াত উভয় দলের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে। কিন্তু যে আসনগুলো তারা সমঝোতার ভিত্তিতে পাবে, ওইসব আসনে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলসহ জোটবদ্ধ অন্য দলগুলোর প্রার্থী থাকবে না। ফলে সেখানে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেবল বিএনপির সঙ্গে। যা তাদের জয়ের সম্ভাবনা তৈরি করবে।
তারা যদি শেষ পর্যন্ত ১৫টি আসনও পায় এবং আরও কিছু আসনে তাদের প্রার্থী থাকে, সব মিলিয়ে তারা ৩ শতাংশ ভোট পেলেও ভোটপ্রাপ্তির অনুপাতে উচ্চকক্ষে তিনটি আসন পাবে (যদি উচ্চকক্ষ গঠিত হয়)। কিন্তু এককভাবে নির্বাচন করলে নিম্ন ও উচ্চকক্ষ কোনোখানেই তাদের আসন পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বলেই মনে হচ্ছে। সম্ভবত এই ভয়টা এনসিপির নিজেদের মধ্যেও আছে। ওই কারণেই হয়তো তারা জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েছে।
এবারের নির্বাচনি জোটের মধ্যে সঙ্গত কারণেই বিভক্তি ও বিরোধ সবচেয়ে বেশি জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে। দুটি দলের নামের মধ্যেই ‘ইসলাম’ থাকলেও ইসলামের মৌলিক কিছু বিষয়ে এই দল দুটির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে এবং ইসলামী আন্দোলনের শীর্ষ নেতারা কড়া ভাষায় জামায়াতের সমালোচনা করছেন—এরকম প্রচুর ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাসছে। কিন্তু তারপরও এবার আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে বিএনপিকে ঠেকানোর জন্য সকল ইসলামী দলের ভোট একটি বাক্সে আনার যে চেষ্টাটি চলছে, আখেরে সেটি বিএনপিকে যে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে, তাতে সন্দেহ নেই।
আওয়ামী লীগের সব ভোট যে বিএনপি পাবে, তা বলার সুযোগ নেই। উপরন্তু এবার আওয়ামী লীগের অনেক ভোটার ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকবেন বলেই মনে হচ্ছে। এর বাইরে আওয়ামী লীগের প্রচুর ভোট জামায়াত পাবে, এই আলোচনাও শোনা যাচ্ছে। তাছাড়া আওয়ামী লীগের ১৫ বছরে জামায়াত যে ভেতরে ভেতরে কতটা শক্তিশালী হয়েছে, তার কিছুটা ইঙ্গিত নিশ্চয়ই পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচনে দেখা গেছে। সুতরাং, জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতের কৌশল কী এবং একসময়ে তাদের মিত্র বিএনপি এই কৌশল কতটা বুঝতে পারছে, তা বলা কঠিন।
আসা যাক বিএনপি জোটের প্রসঙ্গে। বিএনপির দীর্ঘদিনের মিত্র জামায়াতের সঙ্গে এবার বিএনপির জোট হয়নি। বরং এই দুই দলের সম্পর্কের টানাপোড়েন দৃশ্যমান। এনসিপির সঙ্গেও বিএনপির জোটের যে গুঞ্জন ছিল, তা শেষ পর্যন্ত গুঞ্জনেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। এখন পর্যন্ত বিএনপির জোট হয়েছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি, জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর), নাগরিক ঐক্য, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ এবং ইসলামী ঐক্যজোটের সঙ্গে।
এর মধ্যে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে চারটি আসন ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। এগুলো হচ্ছে সিলেট-৫, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২, নীলফামারী-১ ও নারায়ণগঞ্জ-৪। আরও কয়েকটি আসনে বিএনপি কোনো প্রার্থী দেবে না। শরিক নেতারা সেখানে নিজ নিজ প্রতীকে লড়বেন। আসনগুলো হলো বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ (ভোলা-১), নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না (বগুড়া-২), গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬), গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর (পটুয়াখালী-৩), বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক (ঢাকা-১২), জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার (পিরোজপুর-১) এবং ইসলামী ঐক্যজোটের নেতা রশিদ বিন ওয়াক্কাস (যশোর-৫)।
নিজের দল ও প্রতীকের বাইরে গিয়ে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করবেন আরও কয়েকজন। তাদের মধ্যে আছেন ঝিনাইদহ-২ আসনে গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খাঁন। সম্প্রতি তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। গণঅধিকার পরিষদ এটিকে ‘ভোটের কৌশল’ বলে অভিহিত করছে। এছাড়া এলডিপির (অলি আহমেদ) মহাসচিব পদ থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দেওয়া রেদোয়ান আহমেদ (কুমিল্লা-৭), এনডিএমের চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ (ঢাকা-১৩) এবং নড়াইল-২ আসনে ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) ফরিদুজ্জামান ফরহাদও ধানের শীষে নির্বাচন করছেন।
দেখা যাচ্ছে, বিএনপি এবার জোট করেছে জামায়াতের চেয়ে দুর্বল কয়েকটি দলের সঙ্গে। যাদের সঙ্গে জোটবদ্ধ না হয়েও এককভাবে নির্বাচন করেই বিএনপির জয়ী হওয়া সম্ভব। কিন্তু তারপরও তারা জোট করল মূলত রাজনৈতিক কমিটমেন্টন্টের কারণে। যেহেতু এই দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে সরকারবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির সঙ্গে ছিল বা এই দলগুলো সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনের শরিক ছিল, তাই ধানের শীষ প্রতীক দিয়ে অথবা বেশ কিছু আসনে ধানের শীষের প্রার্থী না দেওয়ার মধ্য দিয়ে বিএনপি প্রথমত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল, দ্বিতীয়ত বিএনপি-বিরোধী ইসলামিক জোটের বিপরীতে তারাও এটা দেখাতে চাইল যে, ভোটের মাঠে তারা নিঃসঙ্গ নয়।
কিন্তু এটা মনে রাখতে হবে যে, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত তুলনামূলক ভালো নির্বাচনগুলোর ফলাফলের ভিত্তিতে বিএনপির যে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ ভোট আছে বলে মনে করা হয়, ওই বাস্তবতায় বিএনপি এ বছর অন্য দলগুলোর চেয়ে এগিয়ে আছে এটা যেমন ঠিক, তেমনি আওয়ামী লীগের ১৫ বছরে বিএনপির এই ভোট আরও বেড়েছে না কমেছে এবং তার সঙ্গে সঙ্গে জামায়াতের ভোট কী পরিমাণ বেড়েছে সেটি এখনও প্রমাণিত ও পরীক্ষিত নয়। সুতরাং ২০০৮ পূর্ববর্তী অঙ্ক দিয়ে এ বছরের ভোটের অঙ্ক মেলানো যাবে কি না, সেটি একটি বিরাট প্রশ্ন। উপরন্তু আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন ও এনসিপির জোটবদ্ধ হওয়া যে বিএনপির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে এবং দেশের জোটের রাজনীতিতে একটা নতুন মেরুকরণ ও সমীকরণ তৈরি করেছে, তাতে সন্দেহ নেই।
এই সমীকরণ খুব সহজে বিএনপিকে ক্ষমতায় নিয়ে আসার পথে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। তবে এটাও ঠিক যে, নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই না হলে জমে না। আবার কোনো একটি দল দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হলে সংসদ দুর্বল হয়। ক্ষমতাসীনদের স্বৈরাচার হয়ে ওঠার শঙ্কাও প্রবল হয়। অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে যে গণতন্ত্র ও শক্তিশালী আইনসভার প্রত্যাশা জনমনে তৈরি হয়েছে, তাতে কোনো একটি দলের এককভাবে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হওয়ার চেয়ে কাছাকাছি ব্যবধানে কোনো একটি দলের বিজয়ী হওয়া এবং একটি শক্তিশালী বিরোধী দল গঠনই গণতন্ত্রের জন্য তো বটেই, দেশের জন্যও মঙ্গলজনক হবে।