Published : 05 Jun 2026, 11:58 AM
বাংলার মেলা সংস্কৃতির সঙ্গে সার্কাসের সম্পর্ক বহু পুরোনো। একসময় গ্রামবাংলার মানুষের বিনোদনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল সার্কাস। বিশাল রঙিন তাঁবু, মাইকে প্রচার, সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে আলোর ঝলকানি, ট্রাপিজের দুঃসাহসিক খেলা, জাদু, কৌতুক আর পশুপাখির প্রদর্শনী; সব মিলিয়ে সার্কাস ছিল এক অনন্য আকর্ষণ। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক বিনোদনের যুগে সেই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আজ অস্তিত্বের সংকটে। মঞ্চের আলোয় দর্শকদের আনন্দ দেওয়া শিল্পীদের জীবনের বাস্তবতা এখন অনেকটাই অন্ধকার, অনিশ্চিত ও সংগ্রামময়।
সম্প্রতি বগুড়ার শেরপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী কেল্লাপোশী মেলায় অংশ নেওয়া সার্কাস শিল্পীদের সঙ্গে কথা বললে উঠে আসে ওই বাস্তব চিত্র। বাইরে থেকে যে জীবনকে রঙিন মনে হয়, তার ভেতরে লুকিয়ে আছে দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা, শিক্ষাবঞ্চনা, পেশাগত ঝুঁকি এবং রাষ্ট্রীয় অবহেলার দীর্ঘ ইতিহাস।
সাতক্ষীরার তরুণ সার্কাস শিল্পী মোহাম্মদ বাবু পেশায় একজন জোকার। মঞ্চে তাঁর কাজ দর্শকদের হাসানো। মুখভর্তি রং, বিচিত্র পোশাক আর মজার সব অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে তিনি মুহূর্তেই দর্শকদের আনন্দ দেন। কিন্তু মঞ্চের বাইরে তার জীবন ভীষণ কষ্টের। বাবুর ভাষায়, একসময় রমজান মাস ছাড়া বছরের প্রায় পুরোটা সময়ই সার্কাস চলত। আর এখন বছরে তিন-চার মাসের বেশি কাজ পাওয়া যায় না। বাকি সময় দিনমজুরের কাজ করে কোনোমতে সংসার চালাতে হয়।
বাবুর অভিজ্ঞতা শুধু একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত গল্প নয়; বরং বাংলাদেশের প্রায় সব সার্কাস শিল্পীরই বাস্তবতা। তাঁরা এমন এক শিল্পের সঙ্গে যুক্ত, যার জনপ্রিয়তা কমেছে, আয় কমেছে, কিন্তু বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হয়নি। ফলে শিল্পটিকে আঁকড়ে ধরেই বেঁচে থাকার চেষ্টা করতে হচ্ছে।
সার্কাস শিল্পীদের জীবনের আরেকটি বড় চিন্তার জায়গা হলো তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ। মেলা উপলক্ষে দিনাজপুর, সাতক্ষীরা, যশোর, খুলনাসহ দেশের নানা প্রান্তের সার্কাস পরিবারগুলো বছরের বেশিরভাগ সময় এক মেলা থেকে আরেক মেলায় ঘুরে বেড়ায়। ফলে এসব পরিবারের শিশুরা নিয়মিত স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পায় না।
১৩ বছর বয়সী কিশোরী নূর-ই-জয়নব আকসা তারই এক উদাহরণ। সার্কাস পরিবারে জন্ম নেওয়া এই মেয়েটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পর আর পড়াশোনা করতে পারেনি। এখন সে নিজেই সার্কাসে বিভিন্ন শারীরিক কসরত দেখায়। পড়ার ইচ্ছা থাকলেও পরিস্থিতি তাকে এই পেশায় আসতে বাধ্য করেছে। সার্কাস শিল্পের সঙ্গে যুক্ত এমন শত শত শিশুর গল্প একই রকম। পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রাখতে গিয়ে তারা শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এতে দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার এই চক্র প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ঘুরপাক খাচ্ছে।
ভারতীয় উপমহাদেশে সার্কাসের ইতিহাস প্রায় দেড়শ বছরের হলেও এর শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত। লোকজ কসরত, লাঠিখেলা, ব্যায়াম, দড়ির খেলা আর বিভিন্ন ভ্রাম্যমাণ প্রদর্শনীর মধ্য দিয়েই আজকের আধুনিক সার্কাসের জন্ম। তবে বাঙালি সার্কাসের উত্থান কেবল বিনোদন ছিল না, এটি ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন। উনিশ শতকের শেষভাগে ব্রিটিশরা যখন বাঙালিদের দুর্বল জাতি বলে অবজ্ঞা করত, তখন নবগোপাল মিত্রের শরীরচর্চা আন্দোলন এবং প্রিয়নাথ বসুর ‘গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস’ বাঙালিদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দিয়েছিল। ইউরোপীয় সার্কাস দলগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস প্রমাণ করেছিল যে বাঙালিরাও বিশ্বমানের কসরত দেখাতে সক্ষম।
ক্রমেই সার্কাস গ্রামীণ মেলার অনুসঙ্গ হয়ে ওঠে। দুর্গাপূজা, চৈত্রসংক্রান্তি, বৈশাখী মেলা কিংবা বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবে সার্কাস ছিল অন্যতম আকর্ষণ। শহরে টেলিভিশনের বিস্তার হওয়ার আগ পর্যন্ত গ্রামীণ মানুষের কাছে সার্কাস ছিল বিস্ময়, রোমাঞ্চ এবং বিনোদনের অন্যতম উৎস।
কিন্তু গত কয়েক দশকে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে গেছে। টেলিভিশন, স্যাটেলাইট চ্যানেল, ইন্টারনেট এবং এখনকার স্মার্টফোন মানুষের অবসর কাটানোর ধরন পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে। মানুষ এখন ঘরে বসেই সব ধরনের বিনোদন উপভোগ করতে পারে। ফলে মেলায় গিয়ে টিকিট কেটে সার্কাস দেখার আগ্রহ কমে গেছে।
রংমহল সার্কাসের ব্যবস্থাপক পারভেজ আলীর মতে, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন সার্কাস শিল্পের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। তার ভাষায়, মানুষের হাতে হাতে স্মার্টফোন চলে যাওয়ায় বিনোদনের ধরন পাল্টে গেছে। তবে তিনি মনে করেন, শুধু প্রযুক্তিই নয়, রাষ্ট্রীয় নীতির অসঙ্গতিও এই শিল্পের সংকটকে আরও গভীর করেছে।
সার্কাস সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, একটি প্রদর্শনীর অনুমতি পেতে দীর্ঘ প্রশাসনিক জটিলতা পোহাতে হয়। কখনো কখনো অনুমতি পেতেই কয়েক মাস লেগে যায়। এতে আয়োজকেরা বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকিতে পড়েন এবং নতুন করে কেউ এই শিল্পে টাকা বিনিয়োগ করতে চান না।
প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে সার্কাসের সঙ্গে যুক্ত অরবিন্দ সরকার মনে করেন, প্রশাসনিক জটিলতা শিল্পটির বিকাশে বড় বাধা। তার মতে, প্রতিবেশী ভারতে তুলনামূলক সহজে অনুমতি পাওয়া গেলেও বাংলাদেশে নানা ধরনের জটিলতার কারণে সার্কাস পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তারা এই খাতে আসতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।
সার্কাস বন্ধ হওয়ার আরেকটি বড় কারণ পশুপাখির প্রদর্শনী নিষিদ্ধ হওয়া। একসময় বাঘ, ভাল্লুক, ঘোড়া, বানর আর নানা পাখির খেলা ছিল সার্কাসের মূল আকর্ষণ। বিশেষ করে শিশুরা এই প্রাণীদের দেখতেই সার্কাসে আসত। কিন্তু বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন কঠোর হওয়ার পর এসব প্রদর্শনী পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
প্রাণী অধিকার ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি অবশ্যই একটি ভালো সিদ্ধান্ত, কারণ অনেক সময় সার্কাসে প্রাণীদের ওপর নিষ্ঠুরতা করা হতো। তবে চিড়িয়াখানাতেও তো বন্যপ্রাণী খাঁচায় রাখা হয়। চিড়িয়াখানার মতো নির্দিষ্ট নিয়ম ও মানবিক দিক ঠিক রেখে যদি সীমিত পরিসরে পশুপাখির প্রদর্শনী চালু রাখা যেত, তবে সার্কাসগুলো টিকে থাকত। বিকল্প কোনো আকর্ষণ তৈরি না করেই পুরোনো ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়ায় দর্শক একদম কমে গেছে বলে মনে করেন সার্কাসকর্মীরা।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। আধুনিক বিশ্বে বহু দেশ তাদের সার্কাস শিল্পকে নতুনভাবে সাজিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে চীনের অ্যাক্রোবেটিক সার্কাস কিংবা কানাডার বিশ্বখ্যাত সমকালীন সার্কাস মডেলকে উল্লেখ করা যায়। সেখানে মানবদেহের কসরত, নাটকীয় উপস্থাপনা, প্রযুক্তিনির্ভর আলোকসজ্জা এবং সৃজনশীল মঞ্চ পরিকল্পনার মাধ্যমে নতুন ধরনের দর্শক তৈরি করা হয়েছে। বাংলাদেশের সার্কাস শিল্পেও এমন আধুনিকায়নের সুযোগ রয়েছে।
কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন উন্নত প্রশিক্ষণ, সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ ও সহজ নীতিমালা। বর্তমানে দেশের সার্কাস দলগুলো নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর মতো অবস্থা নিয়ে টিকে থাকার লড়াই করছে। তাদের পক্ষে আধুনিক প্রযুক্তি বা আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ নেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
এর পাশাপাশি সার্কাস শিল্পীদের কর্মপরিবেশও চরম ঝুঁকিপূর্ণ। ট্রাপিজ, আগুনের খেলা বা উঁচুতে কসরত করার সময় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। কিন্তু তাদের কোনো জীবন বিমা বা পেশাগত নিরাপত্তা নেই। আহত হলে নিজেদের খরচেই চিকিৎসা করতে হয়।
সার্কাস শিল্পী সালেহা খাতুনের অভিজ্ঞতা ওই বাস্তবতারই প্রতিফলন। তিনি জানান, সার্কাস বন্ধ থাকলে অনেক সময় না খেয়ে থাকতে হয়। অন্য কোনো পেশায় যাওয়ার সুযোগও নেই। তাই ঝুঁকি জেনেও তারা এই পেশায় টিকে আছেন। তার অভিযোগ, অন্যান্য সাংস্কৃতিক অঙ্গনের শিল্পীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের সহায়তা থাকলেও সার্কাস শিল্পীদের জন্য কার্যকর কোনো সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই।
তাছাড়া, সার্কাসকে ঘিরে সমাজে কিছু ভুল ধারণাও রয়েছে। মেলায় কোনো অসামাজিক কাজ হলে তার দায় অনেক সময় সার্কাসের ওপর চাপানো হয়। শিল্পীদের দাবি, কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে তার শাস্তি হোক, কিন্তু তার জন্য পুরো সার্কাস সম্প্রদায়কে যেন দায়ী করা না হয়।
প্রকৃতপক্ষে সার্কাস শুধু সস্তা কোনো বিনোদন নয়, এটি আমাদের লোকসংস্কৃতির একটি বড় অংশ। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারও মানুষের রুটি-রুজি এবং গ্রামীণ সমাজের ইতিহাস। সার্কাস হারিয়ে গেলে শুধু কিছু মানুষ বেকার হবে না, আমাদের সংস্কৃতির একটি বড় বৈচিত্র্যও হারিয়ে যাবে।
তাই বাংলাদেশে সার্কাস শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রথমত, অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিল্পীদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, সার্কাস পরিবারের শিশুদের জন্য ভ্রাম্যমাণ বা বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। চতুর্থত, বন্যপ্রাণী ব্যবহারের নীতিমালা সংশোধন করে নিরাপত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নতুন ধরনের সার্কাস বিকাশে সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন।
মঞ্চের আলো নিভে গেলে দর্শকরা ঘরে ফিরে যায়। কিন্তু সার্কাস শিল্পীদের জীবনসংগ্রাম তখনও শেষ হয় না। তারা আবার পরের দিনের শোর প্রস্তুতি নেয়, নতুন দর্শকের অপেক্ষা করে। করতালির আড়ালে লুকিয়ে থাকা ওই মানুষগুলোর জীবন আমাদের সাংস্কৃতিক বাস্তবতারই একটি অংশ। তাই সার্কাসকে শুধু অতীতের স্মৃতি হিসেবে নয়, একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব সমাজ ও রাষ্ট্র উভয়েরই। নইলে হয়তো একদিন রঙিন তাঁবুগুলো থাকবে না, থাকবে না হাস্যরসের জোকার, দুঃসাহসিক ট্রাপিজ কিংবা মেলার সেই চিরচেনা আকর্ষণ। তখন হারিয়ে যাবে বাংলার লোকসংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
রঞ্জন কুমার দে সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয়