Published : 07 Mar 2026, 08:05 AM
ইরানের ঘনিষ্ঠ কৌশলগত মিত্র রাশিয়া ও চীন এখন পর্যন্ত ইরান-সংঘাতে সরাসরি জড়ায়নি। তবে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে তারা ইরানের প্রতি সমর্থন গোপন রাখেনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া এই যুদ্ধকে তারা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে। একইসঙ্গে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে যুদ্ধের বিস্তার রোধ এবং আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানিয়ে আসছে দেশ দুটি।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা এবং জবাবে ইরানের পাল্টা হামলা উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক সংঘাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ইসরায়েল ইরানের ওপর হাজার হাজার বোমা নিক্ষেপ করে আকাশপথে আধিপত্য বিস্তার করেছে এবং ইরানের আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে মূলত ধ্বংস করে দিয়েছে। এর জবাবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল পরিবহন রুট ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে প্রতিশোধমূলক হামলা চালিয়েছে, যার ব্যাপক প্রভাব পড়েছে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয় এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলো আরও জড়িয়ে পড়ে, তাহলে এটি বহুপক্ষীয় জটিল যুদ্ধে পরিণত হতে পারে।
রাশিয়া কেন পারছে না?
ইরানের মিত্র হিসেবে পরিচিত চীন-রাশিয়ার অবস্থান নিয়ে এখন সর্বত্র আলোচনা চলছে। যুদ্ধ শুরুর পর আরটির এক সাক্ষাৎকারে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, “এটি শুধু যুদ্ধ নয়, আমরা পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলকেই অস্থিতিশীলতা দেখছি। এই যুদ্ধ কেবল তারাই থামাতে পারে, যারা এটি শুরু করেছে।” এই বক্তব্যে রাশিয়া স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তারা সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে চায় না এবং সংঘাত থামানোর দায়িত্ব তাদেরই যারা এর সূত্রপাত করেছে।
গত বছর রাশিয়া-ইরান ‘ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি’ স্বাক্ষর করেছে। এতে বাণিজ্য, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি, শিক্ষা এবং প্রতিরক্ষা-গোয়েন্দা সহযোগিতা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে চুক্তিতে কোনো সামরিক হস্তক্ষেপ বা সংঘাতে জড়ানোর বাধ্যবাধকতা নেই। আভ্যন্তরীণ সংকট ও কৌশলগত সীমাবদ্ধতার কারণে রাশিয়া এই যুদ্ধে জড়াতে পারছে না।
এ বছর রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধের চার বছর পূর্ণ হয়েছে। ২০২২ সালে যুদ্ধ শুরুর সময় রাশিয়া হয়তো ভেবেছিল দ্রুতই যুদ্ধটা শেষ করে দিতে পারবে, কিন্তু তা এখনও চলছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর শান্তি চুক্তির প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। মস্কো বর্তমানে ইউক্রেইন সংকট সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। তাই জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাই মাদুরোকে অপহরণ করলেও রাশিয়া শুধু নিন্দা জানিয়েই ক্ষ্যান্ত দিয়েছে।
ইউক্রেইন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা দেশগুলোর নজিরবিহীন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা চলছে। বিপুল সামরিক ব্যয়, মানবিক ক্ষতি ও অর্থনৈতিক চাপ তো আছেই। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে আরেকটি বড় সংঘাতে জড়ানো তাদের জন্য একেবারেই বাস্তবসম্মত নয়। বরং কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থানই তাদের জন্য শ্রেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরান যুদ্ধে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে তা পরোক্ষভাবে রাশিয়াকে ইউক্রেইনে কৌশলগত সুবিধা দেবে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর মনোযোগ ও অস্ত্র সরবরাহের বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যের দিকে সরে যাবে। ইউক্রেইনের আকাশ প্রতিরক্ষা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট মিসাইলের ওপর নির্ভরশীল। একই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের হামলা ঠেকাতে মধ্যপ্রাচ্যে বেশি প্রয়োজন হলে ইউক্রেইনে সরবরাহ কমে যাবে, যা রাশিয়ার জন্য সুবিধাজনক। যুক্তরাজ্যভিত্তিক চ্যাথাম হাউসের ইউরোপ ও রাশিয়া বিভাগের পরিচালক গ্রেগোয়ার রুস বলেছেন, ইরানে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ মস্কোর জন্য ইতিবাচক। কারণ এতে ইউক্রেইনের গুরুত্ব কমে মূল মনোযোগ চলে যাবে মধ্যপ্রাচ্যে। রাশিয়ার স্বার্থের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, “ইরান যুদ্ধে ব্যস্ত থাকায় ওয়াশিংটন কূটনৈতিক ও সামরিক বিষয়ে অন্য কোনো ফ্রন্টে সমর্থন যোগাতে পারবে না। তাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় মধ্যপ্রাচ্যই সবার আগে থাকবে।”
ইরান যুদ্ধের কারণে ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। তেলের দাম বাড়ছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধের আশঙ্কায় তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বড় তেল রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে রাশিয়া অতিরিক্ত অর্থনৈতিক সুবিধা পাচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে বড় আঞ্চলিক যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে দুর্বল করলে জ্বালানির চাহিদাও কমে যেতে পারে।
চীন কেন চায় না?
বিশ্বে চীনের ইমেজ এমন যে, তারা সাধারণত কোনো যুদ্ধে জড়ায় না। ইরানের সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনাও তাদের বিবেচনায় রয়েছে। চীন সবসময় দূরদর্শী স্বার্থ বিশেষ করে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য অব্যাহত রাখার কথা মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত নেয়। আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় আসার পরও যখন অন্য দেশগুলো দূরে সরে গিয়েছিল, চীন তখন বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। তাদের কাছে দেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও মুনাফাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
চীন-ইরানের বাণিজ্যিক সম্পর্ক অত্যন্ত শক্তিশালী। সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, তেল বাদ দিয়েও দু-দেশের বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৩৪.১ বিলিয়ন ডলার। তেলসহ ধরলে এই অঙ্ক অনেক বেশি। ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৮৭.২ শতাংশই যায় চীনে। এটি তেহরানের জন্য চীনকে কতটা অপরিহার্য করে তুলেছে, তা স্পষ্ট করে দেয়।
চীন সবসময়ই ‘স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি লাভ নিশ্চিত করা’ নীতিতে এগিয়ে থাকে। তাই তারা সরাসরি যুদ্ধে জড়ায় না। কূটনৈতিক সমর্থন ও বাণিজ্যিক বিনিয়োগের মাধ্যমেই নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করার চেষ্টা করছে।
চীনের জন্য তাইওয়ান স্পর্শকাতর ইস্যু হয়ে আছে। ইরানের পক্ষে সরাসরি জড়ালে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল তাইওয়ানকে ব্যবহার করে চীনের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে। চীন কোনোভাবেই এই ঝুঁকি নিতে যাবে না।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে চীনের বিশাল বাণিজ্যিক ও বিনিয়োগ সম্পর্ক রয়েছে। ইরান যুদ্ধের জড়িয়ে বাণিজ্যের এই সম্পর্ক নষ্ট করার কোনো ইচ্ছা চীনের জাগবে না। তাই মুসলিম বিশ্বের জনমত বিবেচনায় নিয়ে তারা ইরানের বিরুদ্ধে না গিয়ে নীতিগত, কূটনৈতিক ও কৌশলগত সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।
ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করুক, চীন এটা চায় না। তারা বহুবার আন্তর্জাতিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট চুক্তি সমর্থন করে। ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচির অধিকার স্বীকার করলেও অস্ত্র তৈরির বিরোধিতা করে এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধান চায়। মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা চীনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই অঞ্চল জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যের জন্য অপরিহার্য।
তবে ইরান যদি কোনোভাবে পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করে, তাহলে এশিয়ার নিরাপত্তা ভারসাম্য নষ্ট হবে। বিশেষ করে জাপানের মতো প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত দেশ খুব দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা রাখে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান পারমাণবিক শক্তি অর্জন করলে দক্ষিণ কোরিয়া, সৌদি আরব, তুরস্কসহ অন্যান্য দেশও একই পথে হাঁটার চেষ্টা করবে। এটি চীনের জন্য বড় কৌশলগত সংকট তৈরি করবে, কারণ জাপানের পারমাণবিকীকরণ পূর্ব এশিয়ার শক্তির ভারসাম্য সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে, যা সরাসরি চীনের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলবে।
সার্বিকভাবে, ইরানের দুই প্রধান কৌশলগত মিত্র চীন ও রাশিয়া নিজেদের জাতীয় স্বার্থ ও বাস্তবতার কারণে এ যুদ্ধে সরাসরি জড়াতে চায় না বা পারছে না। রাশিয়া ইউক্রেইনে যুদ্ধ ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় আটকে থাকায়, আর চীন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও তাইওয়ান ইস্যুকে প্রাধান্য দিয়ে কূটনৈতিক সমর্থনেই সীমাবদ্ধ রেখেছে। ফলে ইরানকে মূলত একাই এই কঠিন সংঘাত মোকাবিলা করতে হচ্ছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতাকে আরও দীর্ঘায়িত ও জটিল করে তুলতে পারে।