Published : 10 Jan 2026, 08:08 AM
বর্তমানের ইরানকে বুঝতে গেলে ইসরায়েল, আমেরিকা বা পশ্চিমা প্রভাবের পাশাপাশি সেখানকার সংক্ষুব্ধ সামাজিক বাস্তবতাও অনিবার্যভাবে সামনে চলে আসে। কারণ, প্রকাশ্য সংকটের চেয়েও গভীরতর এক ক্ষত এই সমাজের অন্তর্মনকে গ্রাস করে রেখেছে। বিপ্লবের মধ্য দিয়ে স্বৈরতান্ত্রিক রাজ পরিবারকে উৎখাত করা ইরানের সমাজব্যবস্থা আজ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে আরেক ধরনের একচেটিয়া ও অনমনীয় ক্ষমতাকাঠামোর ভেতরে বন্দি হয়ে আছে। এই বন্দিত্ব একাধারে রাজনৈতিক, মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক।
বিপ্লব–পরবর্তী সময়ে ইরানের রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে যে ধর্মীয় কাঠামোকে বসানো হয়েছিল, তা ক্ষমতার নিজস্ব ধর্ম মেনে নৈতিক নেতৃত্বের বদলে একদেশদর্শী শাসনে রূপ নিয়েছে। ভিন্নমত ও চিন্তার স্বাধীনতাকে রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখা হয়ে আসছে। প্রশ্ন করার আরেক অর্থ হয়ে গেছে ষড়যন্ত্র, যেজন্য স্বাধীন দেশের নাগরিকেরা সেখানে ক্রমে সন্দেহভাজন প্রজায় পরিণত হয়েছে। সমাজে গড়ে উঠেছে এক ধরনের ভয়ের সংস্কৃতি; বাইরে নীরবতা, আর অন্তরে ক্রমবর্ধমান ক্ষোভ, হতাশা ও বিচ্ছিন্নতা।
অন্যসব আঞ্চলিক ও আন্তঃমহাদেশীয় অনুঘটকের সমান্তরালে সমাজের দীর্ঘস্থায়ী এই মনস্তাত্ত্বিক সংকট ইরানকে এমন এক অবস্থায় নামিয়ে এনেছে, যেখানে রাষ্ট্র ও সমাজ একই ভূখণ্ডে থেকেও একে অপরের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলছে। এই বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্যও অস্বস্তিকরভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ বাংলাদেশও আজ ধর্মীয় আবেগ ও রাষ্ট্রক্ষমতার মধ্যকার জটিল সম্পর্কের সমীকরণে সৃষ্ট এক অনিশ্চিত মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইরানকে কেবল আন্তর্জাতিক রাজনীতির দাবার ঘুঁটি হিসেবে দেখলে যেমন ভুল হবে, তেমনি বাংলাদেশের সমাজের সম্ভাব্য এই সূক্ষ্ম সংকটগুলোকে উপেক্ষা করাও হবে আরেক ধরণের অবিমৃষ্যকারিতা। কারণ, উপেক্ষিত এই সংকট একদিন মানুষের অন্তর থেকে শুরু হয়ে রাষ্ট্রের ভেতর-বাহিরকে তোলপাড় করে দিতে পারে।
১৯৭৯ সালের ইরান বিপ্লব ছিল সেখানকার নাগরিকের মর্যাদা, ন্যায়বোধ ও আত্মপরিচয়ের এক সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ। রাজতান্ত্রিক শাহের স্বৈরশাসন, বহুমাত্রিক বৈষম্য, পশ্চিম নির্ভরতা ও সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে গড়ে উঠা সেই বিস্ফোরণ তৎকালীন বাস্তবতায় এক ধরনের ইসলামি ভাষা পেয়েছিল। কিন্তু ইসলামকে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে বসানোর পর দ্রুতই তা সমাজের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, ভিন্নমত ও স্বাধীনতাকে নিজের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখতে শুরু করে। এতে করে বিপ্লবের অংশীদার বামপন্থি, সেক্যুলার, নারীবাদী, ভিন্নমতাবলম্বী ও প্রগতিশীল শক্তিগুলো একে একে কোণঠাসা হয়ে কারাগারে, ফাঁসির দড়িতে কিংবা দেশান্তরে যেতে বাধ্য হয়। ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলোও ধীরে ধীরে রাজনৈতিক পরিসর থেকে মুছে যেতে থাকে। ইসলাম তখন নৈতিক প্রেরণা হিসেবে না থেকে হয়ে উঠে রাষ্ট্রীয় শাসনের হাতিয়ার। আর, এর মধ্য দিয়েই বিপ্লবকালীন অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বহুত্ববাদী স্বপ্ন এক ধরনের ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের বাস্তবতায় রূপ নেয়।
ইরানের এই দীর্ঘ সামাজিক অসন্তোষের ফল আজ বৈশ্বিকভাবে স্পষ্ট। বাধ্যতামূলক পর্দাপ্রথা, নীতি পুলিশি ও ব্যক্তিজীবনে রাষ্ট্রচালিত আচরণের আগ্রাসী উপস্থিতি ইরানের তরুণ সমাজকে দিনে দিনে নিদারুণ ক্লান্ত ও ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। নিছক হিজাব না পরার অভিযোগে মাশা আমিনির মৃত্যুকে ঘিরে যে শত শত তরুণ-তরুণী প্রাণ হারিয়েছিল, তা ছিল ইরানি সমাজে জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ মাত্র। অনুসরণের প্রশ্নে অন্ধত্ব দাবিকারী কোনো আদর্শ চাপিয়ে দিলে সমাজে একসময় এ ধরণের প্রতিক্রিয়া অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র যখন প্রতিবাদকে শত্রুতা আর গুলি, গ্রেপ্তার ও হত্যাকে নিরাপত্তার ভাষা বানায়, তখন শাসন কাঠামো টিকে থাকলেও সমাজ আর ঐক্যবদ্ধ থাকে না।
এই অভ্যন্তরীণ সংকটের মধ্যেই ইরান নিজেকে জড়িয়েছে দীর্ঘস্থায়ী আন্তর্জাতিক সংঘাতে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, আঞ্চলিক প্রক্সি রাজনীতি এবং ইসরায়েলের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান ছায়াযুদ্ধ দেশটির অর্থনীতি ও রাষ্ট্রক্ষমতাকে ভেতর থেকে ক্ষয় করে দিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সামরিক ও গোয়েন্দা কাঠামোর যে ভঙ্গুরতা প্রকাশ পেয়েছে, সেটা একইসঙ্গে তার নিরাপত্তা ব্যর্থতার ফল, এবং রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান দূরত্বেরও প্রতিফল। একটি রাষ্ট্র যখন নিজের নাগরিককে বিশ্বাস করে না, তখন নাগরিকরাও সেই রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে আবেগ অনুভব বা দায়বোধ অনুভব না। বাইরে থেকে আঘাত এলে সাময়িক জাতীয়তাবাদী সংহতি তৈরি হতে পারে ঠিকই, কিন্তু আপাত ইস্যুভিত্তিক সেই সংহতি ভেতরের ক্ষতকে ঢাকতে পারে না।
এই জায়গাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের সমাজে আজ যে অনৈক্য, সন্দেহ ও দ্বিধার সংকট দৃশ্যমান, তার বড় দায় সেখানকার ইসলামপন্থি রাষ্ট্ররাজনীতির। ধর্মীয় ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বিভেদাত্মক ক্ষমতার বৈধতা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে রাষ্ট্র শুরু থেকেই সমালোচনাকে ষড়যন্ত্র ও প্রতিবাদকে বিদেশি এজেন্ডার বাস্তবায়ন বলে চিহ্নিত করে নিজের সবচেয়ে বড় শক্তি–জনগণকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে ফেলেছে। এজন্য দেখা যায় সাম্প্রতিক ইসরায়েলি হামলায় উদ্ভূত ঘোর ক্রান্তিকালেও দেশের নাগরিকেরা নির্বিশেষে রাষ্ট্রের পাশে দাঁড়াতে পারেনি, দাঁড়ায়নি। অবশ্যই এ ধরণের মনস্ততত্ত্ব কোনো জাতির স্বভাবগত দুর্বলতা নয়। এটা রাষ্ট্র পরিচালনার নামে তাদের সঙ্গে করে আসা দীর্ঘকালীন রাজনৈতিক প্রতারণার স্বাভাবিক পরিণতি।
রাজনীতি যখন নৈতিকতার ভাষা ধার করে, তখন শুরুতে তা মানুষকে আকৃষ্ট ও আশ্বস্ত করে। কিন্তু খুব দ্রুতই সেই ভাষা রাষ্ট্রক্ষমতার একমাত্র বৈধ ব্যাখ্যায় পরিণত হয়। যারা শরিয়া, ইসলামি শাসন বা ধর্মনির্ভর রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেন ও দেখান, তাদের জন্য ইরান কোনো দূরবর্তী ইতিহাস নয়, এটি একটি জলজ্যান্ত সতর্ক সংকেত। সেখানে ধর্মকে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে বসানোর পর ন্যায়বিচার শক্তিশালী হয়নি; বরং ধর্মের দোহাই দিয়ে ক্ষমতাসীনরা নিজেদের দায়মুক্তি খুঁজেছেন, নিজেদের সীমাবদ্ধতাকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখতে চেয়েছেন।
এই অভিজ্ঞতা শুধুমাত্র ইরানের নয়। মিশরে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতায় এসেও মোহাম্মদ মুরসি ও মুসলিম ব্রাদারহুড ধর্মীয় নীতিমালা আদর্শের নামে চাপিয়ে দিতে গিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্র এবং সমাজ–উভয় দিক থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে করুণ পরিণতি ভোগ করেছে। ধর্মীয় রাজনীতি এভাবেই এক অদ্ভুত ফাঁদে আটকে যায়; ক্ষমতায় গেলে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ, ক্ষমতা হারালে নিজেকেই নিপীড়নের প্রতীক বানায়। জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিটা এখানেই সবচেয়ে বড়। কারণ, ক্ষমতার নিয়মে রাষ্ট্রের প্রতিটি ব্যর্থতা ও দমনমূলক সিদ্ধান্ত এক পর্যায়ে ধর্মের ভাষাতেই তার বৈধতা খোঁজে। এর ফলে সমাজের বড় একটি অংশ দীর্ঘস্থায়ী বঞ্চনা ও অপমানের অভিজ্ঞতা নিয়ে বাঁচে। নারী, সংখ্যালঘু, ভিন্নমতাবলম্বী এমনকি প্রশ্ন করতে চাওয়া সাধারণ মানুষও নিজেদের অপরাধী ভাবতে শুরু করে। এই অবস্থা কোনো ভাবমূর্তিকেই শক্তিশালী বা মহিমান্বিত করে না।
সত্যিকারের সংকট আসলে ইসলাম ভালো না মন্দ–এই শিশুসুলভ প্রশ্নে আটকে নেই। সমস্যাটা এখানে ধর্মের নয়, সমস্যাটা ক্ষমতার চরিত্রের। আধুনিক রাষ্ট্র একটি জটিল, বহুমাত্রিক ও দায়বদ্ধ কাঠামো, যেখানে অর্থনীতি, কূটনীতি, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, বৈশ্বিক বাজার ও নাগরিক অধিকার একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক নির্ভরতা আর নিরাপত্তা জোটের ভেতরে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রকে প্রতিনিয়ত নানাবিধ ইস্যুতে আপস করতে হয়। রাষ্ট্রের প্রতি আবেগ ও আনুগত্য আবশ্য বা পবিত্র কর্তব্য মানুষের কাছে অপশনে পরিণত হয়।
বাংলাদেশ ইরান নয়–এ কথা সত্য। কিন্তু এ কথাকে স্বস্তিদায়ক সাব্যস্ত করারও সুযোগ নেই। ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বাস্তবতায় দুই দেশের পার্থক্য বিস্তর। ইরান তার বিশাল ভূখণ্ড, বিপুল জ্বালানি সম্পদ ও আঞ্চলিক প্রভাবের কারণে বহু নিষেধাজ্ঞার মাঝেও টিকে থাকতে পারে, যেহেতু বিশ্বব্যবস্থা তাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করতে পারে না। বাংলাদেশের সেই শক্তিমত্তা বা সক্ষমতা নেই। বাংলাদেশ গভীরভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত; রপ্তানি, প্রবাসী শ্রম, বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল একটি দেশ। এখানে ইরানের মতো স্বাবলম্বিতার রোমান্টিক কল্পনা বাস্তবে একেবারেই ধোপে টেকে না।
ধর্ম মানুষের বিশ্বাসের জায়গা, আর রাষ্ট্র মানুষের সহাবস্থানের কাঠামো। অতীতের কোনো সমৃদ্ধ অধ্যায়কে উদাহরণ বানিয়ে, স্মৃতি আর গৌরবকে ভক্তি ও ভরসার জায়গায় বসিয়ে যদি এই দুইকে জোর করে একাকার করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে বদলে যাওয়া বাস্তবে দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ বিশ্বাস চলে নৈতিকতার ওপর, আর রাষ্ট্র চলে ক্ষমতা, স্বার্থ, আপস আর জবাবদিহির কঠিন বাস্তবতার ওপর। এই দুইয়ের গতি আলাদা, দায়িত্ব আলাদা, ব্যর্থতার ভাষাও আলাদা। ইরান এর স্পষ্ট একটি উদাহরণ। ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সম্পদে সমৃদ্ধ হয়েও দেশটিকে আজ ধর্মকে রাষ্ট্রক্ষমতার ঢাল বানানোর মূল্য দিতে হচ্ছে–প্রতিবাদ দমনে প্রাণহানি ঘটিয়ে, ভিন্নমতাবলম্বীদের নিকেশ করে দিয়ে, নাগরিকদের নির্বাসনে ঠেলে দিয়ে এবং আকাশ থেকে নেমে আসা ক্ষেপণাস্ত্রের নিচে দাঁড়িয়ে।
নদীবাহিত নরম পলি আর জীবনাচরনে সহজিয়া দর্শনের অনুরাগী বাংলাদেশ নামের এই জনপদকে ইরানের মতো কঠোর আর আত্মরক্ষামূলক স্থানে ঠেলে দিতে না চাইলে, আবেগের বদলে অভিজ্ঞতাকে আমলে নিতে হবে। শিক্ষা নিতে হবে ইরানের ঘটমান পরিস্থিতি থেকে, যেখানে আদর্শের মোহ বাস্তবতার ধাক্কায় ভেঙেচুরে পড়েছে। কারণ, ইতিহাস অত্যন্ত নির্দয়–ভুল থেকে শিক্ষা না নিলে, সেই ভুলই একসময় সবচেয়ে বড় পরিচয়ে পরিণত হয়।