Published : 16 Jun 2026, 05:49 PM
দুবাইয়ে পুলিশের কাছে আটক বাংলাদেশের সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা সম্ভব কি না; কত দিনে তাকে ফিরিয়ে আনা যাবে কিংবা বাংলাদেশ চাইলেই আরব আমিরাত তাকে ফেরত দিতে বাধ্য কি না—জনমনে এরকম নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। যদিও তাকে আটকের পর ছেড়ে দিয়েছে দুবাই পুলিশ—এমন খবরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রটেছিল। তবে তাকে ছেড়ে দেওয়ার খবরটি নেহায়েত গুজব বলেই মনে হয়। কেননা, সুনির্দিষ্ট মামলায় ইন্টারপোলের সহায়তায় আটকের পরপরই কোনো আসামিকে ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
১৪ জুন জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, দুর্নীতির মামলায় বেনজীর আহমেদকে আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এটিকে ‘পুলিশের ঐতিহাসিক সাফল্য’ দাবি করে তিনি বলেন, ‘এর মাধ্যমে আমরা বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হব। পাশাপাশি এর মাধ্যমে আমরা জাতিকে আশ্বস্ত করতে চাই যে, অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন। এটি দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও বাংলাদেশের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকবে।’ বেনজীর আহমেদকে ১২ জুন গ্রেপ্তার করা হয়েছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শিগগির তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।
সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বিবৃতির আগেই একাধিক সংবাদমাধ্যমে বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়। এরকম একজন হাইপ্রোফাইল ব্যক্তিকে শুক্রবার গ্রেপ্তার করা হলেও সেটি দুদিন পরে কেন জানাজানি হলো বা সরকার কেন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশের পরে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানাল, সেটি স্পষ্ট নয়।
প্রসঙ্গত, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেয় আদালত। এর আগে ৭৪ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে বেনজীর এবং তার স্ত্রী ও দুই মেয়ের বিরুদ্ধে চারটি মামলা করে দুদক।
সরকারের তরফে বলা হচ্ছে, গ্রেপ্তারের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ (এক্সট্রাডিশন রিকোয়েস্ট) পাঠাতে হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রত্যর্পণ প্রস্তাব প্রস্তুত ও অনুমোদন এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আমিরাত কর্তৃপক্ষের কাছে কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠাবে। এনসিবি (পুলিশ সদর দপ্তরের একটি শাখা, যারা ইন্টারপোলের সঙ্গে যোগাযোগ করে) আমিরাতের রাজধানী আবু ধাবি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করবে।
প্রশ্ন হলো, দুবাই থেকে বেনজীর আহমেদকে ফিরিয়ে আনা কতটা সম্ভব এবং এটি কত দিনের মধ্যে হতে পারে বা আমিরাত সরকার তাকে ফেরত দেবে কি না বা তাকে ফেরত পাঠাতে বাধ্য কি না?
২০১৪ সালের ২৭ অক্টোবর বাংলাদেশ ও আরব আমিরাতের মধ্যে বন্দিবিনিময় চুক্তি স্বাক্ষর হয়। ওই সময় আরব আমিরাতের কারাগারে প্রায় ৯০০ জন সাজাপ্রাপ্ত বাংলাদেশি ছিলেন। তখন বাংলাদেশ সরকারের তরফে বলা হয়েছিল, যেসব বন্দির সাজার মেয়াদ ছয় মাস বাকি, কেবল তাদের ক্ষেত্রেই এই চুক্তি প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ, সাজার বাকি মেয়াদ তাদেরকে দেশের কারাগারে ভোগ করতে হবে। আর যাদের তিন মাস সাজার মেয়াদ বাকি থাকবে, তারা এর অন্তর্ভুক্ত হবেন না। তাদের সে দেশেই সাজা ভোগ করতে হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলছেন, বেনজীর আহমেদকে ফেরত আনতে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠানো হবে। প্রশ্ন হলো, তাকে বন্দিবিনিময় চুক্তির মাধ্যমে কেন আনা হবে না?
তার কারণ এই যে, বন্দিবিনিময় চুক্তির মাধ্যমে ফেরত আনা হয় যারা সংশ্লিষ্ট দেশের কারাগারে সাজা ভোগ করছেন, তাদের। যেমন—নানা কারণে আরব আমিরাতে সাজাপ্রাপ্ত হয়ে যারা সে দেশের কারাগারে আছেন এবং যাদের সাজার মেয়াদ তিন মাসের বেশি, তাদেরকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে বন্দিবিনিময় চুক্তির প্রয়োজন। কিন্তু বেনজীর আহমেদ যেহেতু দুবাইয়ে সাজাপ্রাপ্ত নন বা তিনি সেই দেশের কোনো মামলায় গ্রেপ্তার হননি, বরং তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বাংলাদেশের মামলায় এবং বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে—ফলে তার ক্ষেত্রে বন্দিবিনিময় চুক্তি প্রযোজ্য হবে না। তাকে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন প্রত্যর্পণের অনুরোধ।
দুবাই থেকে বাংলাদেশে আসামি ফেরানোর উদাহরণ রয়েছে। গত ৬ মে নরসিংদীর শিবপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা হারুনুর রশিদ খান হত্যা মামলার আসামি আরিফ সরকারকে ইন্টারপোলের সহায়তায় দুবাই থেকে গ্রেপ্তার করে দেশে ফিরিয়ে এনেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
প্রত্যর্পণ অনুরোধের জন্য কিছু শর্ত মানতে হয়। যেমন—যে অপরাধের জন্য প্রত্যর্পণ চাওয়া হয়েছে, সেটি আরব আমিরাত এবং অনুরোধকারী দেশে অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে হবে এবং এর শাস্তি অন্তত এক বছর কারাভোগ বা তার বেশি হতে হবে। বেনজীর আহমেদকে যে মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সেটি বাংলাদেশ ও আরব আমিরাত উভয় দেশেই অপরাধ এবং এর সাজা এক বছরের বেশি কারাদণ্ড। সুতরাং, এই যুক্তিতে আরব আমিরাত সরকার তাকে ফেরত দিতে পারে।
তবে এটা ঠিক যে, বাংলাদেশ প্রত্যর্পণের অনুরোধ করলেও আরব আমিরাত সরকার বেনজীর আহমেদকে ফেরত দিতে বাধ্য নয়। কারণ, অনুরোধে সাড়া দেওয়া নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশসমূহের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর। এটি কোনো খবরদারি বা বাধ্যবাধকতার প্রশ্ন নয়। তবে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানানোর পরেও আরব আমিরাত কোনো আসামিকে ফেরত না-ও দিতে পারে যদি অভিযুক্ত ব্যক্তি আরব আমিরাতের নাগরিক হন; যদি ওই অপরাধ আরব আমিরাতের নিজস্ব আদালতে বিচারযোগ্য হয়; যদি অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বা সামরিক অপরাধের (সন্ত্রাসবাদ, যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা বাদে) অভিযোগ থাকে; যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ধর্ম, জাতি বা রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে শাস্তি পাওয়ার আশঙ্কা থাকে; যদি একই অপরাধে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আগে দণ্ড বা খালাস পেয়ে থাকেন এবং তার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়।
বেনজীর আহমেদকে যে মামলায় আটক করা হয়েছে, তাতে তার ক্ষেত্রে এর কোনো পরিস্থিতি নেই। তবে তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠালে তিনি রাজনৈতিক কারণে শাস্তি পেতে পারেন—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে হয়তো আরব আমিরাত সরকারের কাছে তাকে বাংলাদেশে ফেরত না পাঠানোর অনুরোধ করতে পারেন। কেননা, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন বলছে, মতিঝিলের শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ড, কক্সবাজারের একরামুলের ক্রসফায়ার এবং গুম ও অপহরণসহ অন্তত ১০টি অপরাধে বেনজীরের সম্পৃক্ততা মিলেছে।
পুলিশের সাবেক এই মহাপরিদর্শককে ‘কুখ্যাত সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে তাকে বিচারের মুখোমুখি করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামও। তিনি জানান, এই ট্রাইব্যুনালেই তার বিরুদ্ধে তিনটি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে। সুতরাং, এসব মামলাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক দাবি করে তাকে বাংলাদেশে ফেরত না পাঠানোর অনুরোধ করতে পারেন বেনজীর আহমেদ। যদিও তার সেই অনুরোধ আমলে নেওয়া হবে কি না, সেটি আরব আমিরাতের আদালতের এখতিয়ার। তবে এটা ঠিক যে, আন্তর্জাতিক সতর্কতা ও প্রত্যর্পণ ব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে অপরাধীরা কোনো দেশের সীমান্ত ব্যবহার করে বিচার এড়াতে না পারে।
আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষও বাংলাদেশকে জানিয়েছে যে, বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের ৩০ দিনের মধ্যে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ (extradition) আবেদন জমা দিতে হবে।
উল্লেখ করা প্রয়োজন, ইন্টারপোলের রেড নোটিশ কোনো আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নয়। বরং এটি কেবল সংশ্লিষ্ট দেশকে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আটক করার অনুরোধ। ফলে বেনজীর আহমেদকে প্রত্যর্পণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আরব আমিরাতের আদালত নেবে। আদালত দেখবে অভিযোগগুলো যথেষ্ট গুরুতর কি না, নথিপত্র ঠিক আছে কি না এবং মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কি না। যদি সে দেশের আদালত সন্তুষ্ট হয়, তাহলে তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব। আর যদি আইনি আপত্তি গ্রহণ করা হয়, তাহলে প্রক্রিয়া দীর্ঘ হতে পারে বা প্রত্যর্পণ না-ও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারকে বেশ কিছু নথি ও তথ্য-প্রমাণ দিতে হবে। বিশেষ করে আরব আমিরাতের আদালতকে এ বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ দিতে হবে যে, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে যেসব মামলা আছে, সেগুলো রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক নয় এবং বাংলাদেশে তিনি ন্যায়বিচার পাবেন। তবে এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কত দিন লাগবে এবং বাংলাদেশে ফেরত না পাঠানোর অনুরোধ জানিয়ে বেনজীর আহমেদ আরব আমিরাতের আদালতে আপিল করলে সেটি কত দিনে নিষ্পত্তি হবে, তার ওপর নির্ভর করছে তাকে কত দিনের মধ্যে দেশে আনা যাবে।
শোনা যায়, বাংলাদেশ ছাড়ার পর তিনি তুর্কিয়ের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন। এমনকি সে দেশে তার বড় বিনিয়োগ আছে বলেও গুঞ্জন রয়েছে। যদি তাই হয়, তাহলে তৃতীয় কোনো দেশের নাগরিক হিসেবে তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। কেননা, হত্যা মামলার পলাতক আসামি রবিউল ইসলাম ওরফে আরাভ খানকেও বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।
দুবাইয়ে স্বর্ণের দোকান চালু করে আলোচনায় এসেছিলেন আরাভ খান। তিনি পুলিশ কর্মকর্তা মামুন ইমরান খান হত্যা মামলা এবং একটি অস্ত্র মামলার পলাতক আসামি। হত্যা মামলা দায়েরের পর তিনি ভারতে পালিয়ে যান এবং আরাভ খান নাম নিয়ে ভারতীয় নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। তিনি দুবাইতে ইন্টারপোলের হাতে গ্রেপ্তার হলেও ভারতীয় নাগরিক হওয়ার কারণে বাংলাদেশ সরকার তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে পারেনি।
আমীন আল রশীদ সাংবাদিক ও লেখক। [email protected]