Published : 20 Sep 2025, 03:16 AM
কর্মসংস্থান, শিক্ষা, নিরাপত্তা কিংবা রাজনৈতিক আশ্রয়ের কারণে মানুষ এক দেশ থেকে অন্য দেশে চলে যাচ্ছে। বিশ্বায়নের কালে অভিবাসন আসলে এক অবশ্যম্ভাবী বাস্তবতা। তবে ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশগুলোতে সম্প্রতি অভিবাসনকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক ও আন্দোলন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। একদিকে মানবিক কারণে শরণার্থী গ্রহণের দাবি, অন্যদিকে স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার কারণে আন্দোলন গড়ে উঠছে।
সামগ্রিক অভিবাসনবিরোধী মনোভাবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ধর্মীয় প্রভাবও। পশ্চিমা বিশ্ব ঐতিহাসিকভাবে খ্রিস্টীয় সভ্যতা, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তবে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের অভিবাসন বৃদ্ধি, সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কা ও সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্বের কারণে পাশ্চাত্যে মুসলিমবিরোধী আন্দোলন ও মনোভাব দিন দিন বাড়ছে।
অভিবাসন সংকট ও প্রতিক্রিয়া
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অন্যান্য ধর্মের মানুষের পাশাপাশি এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা বিপুলসংখ্যক মুসলিম অভিবাসীকে যুক্তরাজ্য আশ্রয় দেয়। লন্ডন, বার্মিংহাম ও ম্যানচেস্টারের মতো শহরে মুসলিম সম্প্রদায় এখন দৃশ্যমান। এই দৃশ্যই এখন মুসলিমবিরোধী মনোভাব তৈরির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০০৫ সালের লন্ডন বোমা হামলার পর থেকে মুসলিমদের প্রতি অবিশ্বাস বাড়তে থাকে। ব্রিটিশ ন্যাশনাল পার্টি ও ইংলিশ ডিফেন্স লীগ অভিবাসনবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে সঙ্গে সরাসরি মুসলিমবিরোধী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা গণমাধ্যমে মুসলিমদের ‘চরমপন্থার উৎস’ হিসেবে চিত্রিত করে। হিজাব-নিকাব নিয়ে বিতর্ক ও মুসলিমদেরকে তাদের মূল্যবোধবিরোধী বলে প্রচার করছে।
২০১৫ সালের পর থেকে সিরীয় শরণার্থী সংকট, আফগানিস্তান থেকে শুরু করে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে অবৈধ অভিবাসনের ঢল ইউরোপকে ব্যাপকভাবে নাড়িয়ে দেয়। জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, গ্রিস ও হাঙ্গেরির মতো দেশগুলোতে অভিবাসীদের উপস্থিতি স্থানীয় রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে। ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো অভিবাসনবিরোধী ইস্যুকে মূল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। জার্মানির অলটারনেটিভ ফর জার্মান, ফ্রান্সের ন্যাশনাল র্যালি, ইতালির লিগা নোর্ড বা হাঙ্গেরির ভিক্টর অরবানের সরকার অভিবাসন সীমিত করার দাবি তুলছে। অন্যদিকে, শরণার্থী গ্রহণের পক্ষে থাকা উদার মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সঙ্গে তাদের দ্বন্দ্ব রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়িয়ে তুলেছে।
অস্ট্রেলিয়া ভৌগোলিকভাবে অপেক্ষাকৃত বিচ্ছিন্ন হলেও অভিবাসনকে কেন্দ্র করে সেখানে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক চলছে। বিশেষত নৌকাযোগে আসা শরণার্থীদের আটকে রাখা ও ‘অফশোর ডিটেনশন সেন্টারগুলোতে’ রাখার সরকারি নীতি আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচিত হলেও স্থানীয়রা তাতে সমর্থন দিয়েছে। অনেকে মনে করেন, অতিরিক্ত অভিবাসী দেশে প্রবেশ করলে চাকরি, সামাজিক সুযোগ-সুবিধা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় হুমকির মুখে পড়বে। এ কারণেই অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতেও অভিবাসন নীতি নিয়ে কঠোর অবস্থান গ্রহণ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
অভিবাসনবিরোধী আন্দোলন
যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবে অভিবাসীদের দেশ হলেও, সম্প্রতি সীমান্ত সুরক্ষা ও অবৈধ অভিবাসন নিয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা তীব্র হয়েছে। বিশেষত মেক্সিকো সীমান্ত হয়ে মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা থেকে লাখো মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করছে। এর ফলে নিরাপত্তা, মাদক পাচার, সস্তা শ্রমের প্রতিযোগিতা এবং সামাজিক সেবার ওপর চাপ নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ‘বিল্ড দ্য ওয়াল’ স্লোগান এবং রিপাবলিকানদের কঠোর অভিবাসন নীতি অভিবাসনবিরোধী আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করেছে। বর্তমানে রাজনীতিতেও অভিবাসন একটি প্রধান বিতর্কিত ইস্যু।
ইউরোপের ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও সুইডেনসহ প্রতিটি দেশেই অভিবাসনবিরোধী ও ইসলামবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলন জোরদার হচ্ছে। ‘ফ্রান্স একটি সেক্যুলার রাষ্ট্র’ এটা বলে তারা মুসলিম নারীর হিজাব, আবায়া-বোরকা নিষিদ্ধের দাবি করছে। ফ্রান্সের ডানপন্থী নেতা মারিন লে পেন ইসলামকে ‘জাতীয় পরিচয়ের জন্য হুমকি’ হিসেবে উল্লেখ করছেন। জার্মানিতে অলটারনেটিভ ফর জার্মানি পার্টি মুসলিমদের সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ করছে। নেদারল্যান্ডে গির্ট উইল্ডার্স প্রকাশ্যে কোরান নিষিদ্ধের দাবি করেছেন। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলোতে শরণার্থী গ্রহণের নীতি শিথিল করায় ইসলামবিরোধী বিক্ষোভ ও কোরান পোড়ানোর মতো উসকানিমূলক কাজ বাড়ছে।
ইউরোপে প্যাট্রিয়টিক ইউরোপিয়ানস এগেইনস্ট দ্য ইসলামাইজেশন অব দ্য ওয়েস্ট, স্টপ ইসলামাইজেশন অব নরওয়ে, স্টপ ইসলামাইজেশন অব ইউরোপ, অলটারনেটিভ ফর জার্মানিসহ বিভিন্ন অতি ডানপন্থী সামাজিক ও রাজনৈতিক দল মুসলিম অভিবাসনবিরোধী প্রচারণা চালাচ্ছে।
অভিবাসন ও মুসলিমবিরোধী এই মনোভাব তৈরির পেছনে কয়েকটি কারণ খুঁজে পাওয়া যায়—
১) ২০০১-এর ৯/১১ হামলার পর থেকে মুসলিমদেরকে ইউরোপে নিরাপত্তা ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত করা শুরু হয়। বিশেষত লন্ডন (২০০৫), মাদ্রিদ (২০০৪), প্যারিস (২০১৫) ও ব্রাসেলস (২০১৬) এর ভয়াবহ জঙ্গি হামলাগুলো ইউরোপীয় জনগণের মধ্যে গভীরভাবে মুসলিমভীতি তৈরি করেছে। প্যারিসে শার্লি হেবদো এবং পরবর্তীতে বাটাক্লান থিয়েটারে হামলা ফরাসি সমাজে ইসলামকে ‘সহিংসতার ধর্ম’ হিসেবে চিত্রিত করেছে।
২) হিজাব, হালাল খাবার, মসজিদ নির্মাণ ইত্যাদি বিষয়কে ‘পাশ্চাত্য মূল্যবোধের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে দেখছে। অভিবাসীদের ভিন্ন সংস্কৃতি ও ধর্ম স্থানীয় পরিচয়কে হুমকির মুখে ফেলছে। ফ্রান্সে স্কুলে হিজাব নিষিদ্ধ, সুইজারল্যান্ডে মসজিদের মিনার নির্মাণে গণভোটে নিষেধাজ্ঞা—এসব পদক্ষেপ ইসলামোফোবিক মনোভাবের প্রতিফলন।
৩) অর্থনৈতিক মন্দার সময় অভিবাসীদের চাকরির বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিবাসীরা সস্তা শ্রম দিয়ে চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াচ্ছে। অর্থনৈতিক মন্দার সময় গ্রিস ও ইতালিতে শরণার্থীদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব বৃদ্ধি পায়।
৪) ডানপন্থী দলগুলো ভোটারদের আকৃষ্ট করতে মুসলিমবিরোধী ভাষ্য ব্যবহার করছে। জনমত কুক্ষিগত করতে অভিবাসনবিরোধী স্লোগানকে বড় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। যেমন, ফ্রান্সের মারিন লে পেন, নেদারল্যান্ডসের গির্ট উইল্ডার্স, হাঙ্গেরির ভিক্টর অরবান—সবাই অভিবাসন ও মুসলিমবিরোধী স্লোগানকে নির্বাচনি প্রচারণার কেন্দ্র করেছেন।
৫) ইউরোপে ‘গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট থিওরি’ সূত্রে বলা হয় যে, মুসলিম অভিবাসীরা একসময় ইউরোপীয় খ্রিস্টানদের ‘প্রতিস্থাপন’ করবে—এই ধারণা ফেইসবুক, ইউটিউব ও এক্সে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এই তত্ত্বে বিশ্বাস করা হয় যে, মুসলিম অভিবাসীরা পশ্চিমা দেশগুলোতে ঢুকে তাদের উচ্চ জন্মহারকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে ‘প্রতিস্থাপন’ করছে। মুসলিম অভিবাসীরা পশ্চিমাদের খ্রিস্টান ও ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতি ধ্বংস করে ইসলামী সংস্কৃতি চাপিয়ে দেবে।
বিরোধীদের বক্তব্য কী?
যুক্তরাজ্যে মুসলিমবিরোধী আন্দোলনকারীরা ইসলামকে সন্ত্রাস ও সহিংসতার উৎস হিসেবে উপস্থাপন করছে। এই ইসলামোফোবিক অভিযোগের ভিত্তি হলো তারা মুসলিম সম্প্রদায়কে ‘র্যাডিকাল ইসলাম’ ‘ইসলামী জঙ্গিবাদের’ সঙ্গে যুক্ত করে।
তারা অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ ও অভিবাসীদের ওপর কঠোর আইন প্রয়োগের কথা বলছে, বিশেষত মুসলিম অভিবাসীদের ক্ষেত্রে। পশ্চিমা মূল্যবোধ রক্ষা করতে—হিজাব, নিকাব, ধর্মীয় পোশাক, মসজিদের আওয়াজ, ধর্মীয় স্কুলের বিধি নিষিদ্ধ করার দাবি তুলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুসলিমবিরোধী বক্তব্য, ভিডিও, তথ্য প্রচার করছে। সরকারের নীতি ও আইনকে সংশোধনের কথা বলছে।
জনমতের একাংশ মুসলিমবিরোধী এই মনোভাবকে সহানুভূতি দেখাচ্ছে, বিশেষত যখন দেশে-বিদেশের কোথাও কোনো ইসলামী জঙ্গি ও উগ্রবাদীদের দ্বারা সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটে। তবে একটি বড় অংশ মনে করে, মুসলিমরা বৈষম্যের শিকার, সরকার ও পুলিশকে হেট-ক্রাইম মোকাবেলায় কঠোর হতে হবে। তবে অভিযোগ আছে সরকার ও রাজনীতিবিদরা কখনো কখনো মুসলিমবিরোধী বক্তব্যের যথেষ্ট সমালোচনা করেন না।
অভিবাসন প্রশ্নে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার সমাজে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তা শুধু রাজনীতি নয়, সামাজিক সম্পর্ক ও আন্তর্জাতিক নীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলছে। একদিকে মানবিক দায়বদ্ধতা ও বহুসংস্কৃতির আদর্শ, অন্যদিকে জাতীয় নিরাপত্তা ও স্থানীয় স্বার্থের সংঘাত—এই দ্বন্দ্বই অভিবাসনবিরোধী আন্দোলনকে উসকে দিচ্ছে।
আগামী দিনে এসব দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজের ভবিষ্যৎ অনেকাংশেই নির্ভর করবে তারা কীভাবে অভিবাসন ইস্যুকে সামলে নেবে। প্রশ্ন হচ্ছে, তারা বহুসংস্কৃতির ঐতিহ্য ধরে রাখবে, নাকি অভিবাসন ও মুসলিমবিরোধী আন্দোলন তাদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক মানচিত্র পাল্টে দেবে?