Published : 04 Jun 2026, 06:50 PM
চলতি পথে হঠাৎ কারও সঙ্গে চোখাচোখি। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের সেই দৃষ্টি বিনিময়, অথচ অদ্ভুত এক মোহ তৈরি করে দিয়ে যায় মনে।
বাস, ট্রেন, মেট্রো, ট্রাফিক সিগন্যাল বা কফি শপের সেই অচেনা মুখ, সারাদিন মাথায় ঘুরপাক খায়। শহুরে জীবনে এই অভিজ্ঞতা অনেকেরই হয়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে এই অনুভূতি এখন ‘আইকন্টাক্টশিপ’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। অবাস্তব মনে হলেও, এই ক্ষণিকের ভালোলাগার পেছনে রয়েছে গভীর মনস্তাত্ত্বিক কারণ।
বিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের চোখ শুধু দেখার অঙ্গ নয়, এটি অবিনাশী যোগাযোগের মাধ্যম।
ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের 'ডিপার্টমেন্ট অব এক্সপেরিমেন্টাল সাইকোলজি'-র অধীনে থাকা 'আইথিঙ্ক ল্যাব' থেকে এই বিষয়ে একটি গবেষণা পরিচালিত হয়।
‘অ্যাসোসিয়েশন ফর সাইকোলজিক্যাল সায়েন্স’ সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণাটি পরিচালনা করেন, মনোবিদ অধ্যাপক ড্যানিয়েল সি. রিচার্ডসন।
গবেষণার ফলাফলে বলা হয়, যখন দুজন মানুষের চোখ সরাসরি এক লাইন বা সরলরেখায় আসে, তখন মস্তিষ্কের 'সোশ্যাল নেটওয়ার্ক' অংশটি তীব্রভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে।
এই মনোবিজ্ঞানীর মতে, “অচেনা কারও চোখের দিকে তাকিয়ে থাকার সময়, আমাদের মস্তিষ্ক অপরপক্ষের মনের ভাব পড়ার চেষ্টা করে। আকস্মিক হওয়া এই সংযোগকে মস্তিষ্ক একটি 'বিশেষ ঘটনা' হিসেবে ধারণ করে। ফলে ব্যক্তিটি সামনে থেকে চলে গেলেও, তার রেশ মস্তিষ্কে দীর্ঘক্ষণ থেকে যায়।”
এরপর শুরু হয় যে প্রক্রিয়া, মনোবিজ্ঞানীরা তার নাম দিয়েছেন ‘প্রজেকশন’। মানুষটি অপরিচিত বলে তার সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই। এই শূন্যস্থান পূরণ করতে মস্তিষ্ক নিজের ইচ্ছা, আবেগ এবং কল্পনা দিয়ে মানুষটির একটি চরিত্র তৈরি করে নেয়।
রিচার্ডসন বলেন, “আপনি যদি একাকিত্ব অনুভব করেন, মনে হবে সেও হয়ত একা। প্রেমের খোঁজে থাকলে মনে হবে, তিনিই হয়ত সেই মানুষ।”
'আইকনট্যাক্টশিপ' বলতে যা বোঝায়
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. ফারজানা রহমান দিনা বলেন, “আইকনট্যাক্টশিপ হল- এমন একটি মানসিক ও আবেগঘন অবস্থা, যেখানে দুজন অচেনা মানুষের মধ্যে শুধু চোখের যোগাযোগের মাধ্যমে একটি কল্পনাভিত্তিক সম্পর্কের অনুভূতি তৈরি হয়। এখানে কোনো কথা নেই, পরিচয় নেই। তবু মনে হয়, মানুষটির সঙ্গে হয়ত কিছু একটা হতে পারত।”
মনোবিজ্ঞানে এই অনুভূতিকে বলা হয় ‘জিরো ডেটা লিমেরেন্স’; মানে কোনো বাস্তব তথ্য ছাড়াই একজন মানুষের প্রতি তীব্র আবেগ তৈরি হওয়া।
এখানে বাস্তব মানুষটিকে নয়, বরং সেই মানুষকে নিয়ে নিজের মনে তৈরি করা একটি কল্পিত চরিত্রকেই ভালো লাগতে শুরু করে।
এমন অনুভূতি হওয়ার কারণ
ড্যানিয়েল সি. রিচার্ডসনের গবেষণায় কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা হয়।
ডোপামিন হরমোনের ক্ষরণ: পছন্দের কারও সঙ্গে চোখাচোখি হলে মস্তিষ্কে ‘ফিল-গুড’ হরমোন ডোপামিন নিঃসৃত হয়। এটি সাময়িক আনন্দ তৈরি করে।
কল্পনার ডালপালা: অচেনা মানুষটি সম্পর্কে, আমাদের কাছে কোনো তথ্য থাকে না। ফলে শূন্যস্থান পূরণ করতে মস্তিষ্ক নিজের মতো করে সুন্দর গল্প বা কল্পনা সাজিয়ে নেয়।
একাকিত্ব ও সংযোগের আকাঙ্ক্ষা: অনেক সময় অবচেতন মনে আমরা মানুষের সাথে সংযোগ খুঁজি। ক্ষণিকের দৃষ্টি বিনিময় সেই সামাজিক চাহিদাকে তীব্র করে তোলে।
চোখের ভাষা: চোখ মানুষের ভেতরের আকর্ষণ বা আগ্রহ সবচেয়ে দ্রুত প্রকাশ করে। এই নীরব আমন্ত্রণ মনকে আলোড়িত করে।
ভালো দিক
মেজাজ ভালো করে: এটি একঘেয়ে বা বিষণ্ণ দিনে, তাৎক্ষণিক আনন্দের জোগান দেয়।
আত্মবিশ্বাস বাড়ায়: কেউ ইতিবাচক দৃষ্টিতে তাকালে, নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস ও আকর্ষণীয়তা বাড়ে।
কল্পনাশক্তির বিকাশ: এটি মানুষের সৃজনশীল চিন্তাভাবনা ও কল্পনাশক্তিকে উদ্দীপিত করে।
মন্দ দিক
মনোযোগে ব্যাঘাত: সারাদিন ওই ব্যক্তির কথা ভাবলে, পড়ালেখা বা কাজে মনোযোগ নষ্ট হয়।
অবাস্তব প্রত্যাশা: মনের ভেতর মানুষটিকে নিয়ে অতিরিক্ত ‘ফ্যান্টাসি’ তৈরি হলে, বাস্তব জীবনের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সাময়িক বিষণ্ণতা: ব্যক্তিটিকে আর কখনও দেখতে না পাওয়ার আফসোস থেকে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হতে পারে।
এই অনুভূতি সামলানোর উপায়
ক্ষণিকের এই ভালোলাগাকে উপভোগ করা দারুণ বিষয়। তবে সেটা যেন সারাদিনের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট না করে। সেজন্য কিছু কৌশল অবলম্বনের কথাও উল্লেখ করা হয় গবেষণায়।
বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া: শুরুতেই নিজেকে বোঝাতে হবে, এটি কেবলই এক সেকেন্ডের একটি সাধারণ ঘটনা ছিল। এর পেছনে কোনো ভবিষ্যৎ বা গভীর গল্প নেই।
মনোযোগ অন্য কাজে ঘোরানো: যখনই সেই অচেনা মুখের কথা মনে পড়বে, তখনই কোনো কঠিন কাজে হাত দিতে হবে বা পছন্দের গান শোনা যেতে পারে।
ভাবনাকে ডায়েরিতে লেখা: মন থেকে চিন্তা দূর করতে চাইলে, কাগজে লিখে ফেলা উপকারী। মনের ভাব প্রকাশ হয়ে গেলে মস্তিষ্ক হালকা বোধ করে।
বর্তমান মুহূর্তে বাঁচা: অতীত বা কল্পনার দুনিয়ায় না থেকে, চারপাশের বাস্তব মানুষ এবং কাজের প্রতি মনোযোগ দিতে হবে।
সব চোখাচোখি প্রেমের শুরু নয়। তবে কিছু মুহূর্ত মনে একটা অদ্ভুত আলোড়ন তৈরি করে। সেই মুহূর্তগুলো উপভোগ করাই জীবনের ছোট ছোট সৌন্দর্যের অংশ।
গাড়িতে বা মেট্রোতে যে চোখ চোখ পড়েছিল, সে হয়ত আর কখনও দেখা দেবে না। তাই সেই কয়েক সেকেন্ডের অনুভূতিটুকু মিষ্টি স্মৃতি হিসেবে মনে রেখে, নিজের কাজে এগিয়ে যাওয়াই হবে বুদ্ধিমানের পরিচয়।
আরও পড়ুন
ট্রমা বন্ডিং: কষ্ট পেয়েও যে সম্পর্ক ধরে রাখা হয়