Published : 06 May 2026, 06:34 PM
ধরুন, সন্তানকে তার বাবা-মা খুব মারধর করল। শিশুটি তখন কাঁদতে কাঁদতে ওই বাবা-মায়ের কোলেই আশ্রয় নিতে চায়। ‘ট্রমা বন্ডিং’ বড়দের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ঠিক একইভাবে কাজ করে— যিনি আঘাত করছেন, তার কাছেই আশ্রয়ের জন্য ফিরে যাওয়া।
আবার দেখা যায়, একজন ব্যক্তি তার সঙ্গীকে জোরে ঝাঁকুনি দিচ্ছেন, চিৎকার করে ভয় দেখাচ্ছেন। আর তার মাত্র কয়েক মুহূর্ত পরই সেই একই মানুষটা তাকে আদর করে কাছে টেনে নিচ্ছেন, মাথায় হাত বুলাচ্ছেন।
সম্পর্কের এই ওঠানামার নামটাও মনোবিজ্ঞানে বলা হয়— ট্রমা বন্ডিং।
ট্রমা বন্ডিং মানে কী — সহজ করে বললে
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. ফারজানা রহমান দিনা বলছেন, “ট্রমা বন্ডিং’ হল এমন একটা আবেগীয় বন্ধন যেখানে একজন মানুষ তার প্রতি ক্ষতিকর বা নির্যাতনকারী সঙ্গীর সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েন।
বাইরে থেকে সম্পর্কটা স্পষ্ট ক্ষতিকর। কিন্তু ভুক্তভোগীর পক্ষে সেখান থেকে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।”
মার্কিন মনোবিজ্ঞানী প্যাট্রিক কার্নেস এই ধারণাটা বিশদে ব্যাখ্যা করেছেন।
তার মতে, ‘যখন কোনো সম্পর্কে নির্যাতন আর ভালোবাসা পালাক্রমে আসে — কখনও অপমান, কখনও অতিরিক্ত যত্ন, কখনও সহিংসতা, কখনও অনুতাপ — তখন ভুক্তভোগীর মধ্যে একটা গভীর আবেগীয় নির্ভরতা তৈরি হয়। এটাই ‘ট্রমা বন্ডিং’।’
যেভাবে বোঝা যায় ট্রমা বন্ডিং
কিছু আচরণ এই অবস্থায় প্রায় সবার মধ্যেই দেখা যায়।
সম্পর্কটা ক্ষতিকর বুঝতে পারছেন, কিন্তু বের হতে পারছেন না। নির্যাতনকারীকে বারবার ক্ষমা করে দিচ্ছেন। নিজের কষ্টকে নিজেই ছোট করে দেখছেন — ‘এতটা খারাপ না’, ‘সবার সংসারেই এমন হয়।’
কাছের মানুষরা সতর্ক করছেন কিন্তু সেটা মানতে পারছেন না।
ডা. দিনা বলেন, “সবচেয়ে চেনা লক্ষণ হল— নির্যাতনের পর সঙ্গী একটু ভালো আচরণ করলেই মনে হয়, ‘হয়তো এবার সত্যিই বদলেছে।’ এই একটুখানি আশাই মানুষকে বারবার ফিরে আসতে বাধ্য করে।”
ধীরে ধীরে পরিবার ও বন্ধু থেকে দূরে সরে যেতে থাকেন, সম্পর্কের বাস্তবতা অন্যদের কাছে লুকিয়ে রাখেন।
মস্তিষ্কের রসায়নই এই ফাঁদ তৈরি করে
‘ট্রমা বন্ডিং’ থেকে বের হতে না পারার জন্য ভুক্তভোগীকে দোষ দেওয়া সহজ। তবে বিজ্ঞান বলছে, এই আটকে থাকার পেছনে মস্তিষ্কের রসায়নও দায়ী।
কানাডা’র মনোবিজ্ঞানী অ্যাবি মেডকাফ এই বিষয়ে নিজের ওয়েবসাইটে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, “সম্পর্কের ভালো সময়ে অক্সিটোসিন নিঃসৃত হয়— যেটাকে বলা হয় 'বন্ধনের হরমোন'। এই হরমোন ভালোবাসা আর আস্থার অনুভূতি বাড়ায়।”
“আবার উত্তেজনা, ভয় বা সংঘাতের সময় ডোপামিন এবং অ্যাড্রেনালিন বের হয়। এই রাসায়নিকগুলো সম্পর্কটাকে তীব্র ও আসক্তিমূলক করে তোলে” বলেন তিনি।
ভালো সময়, খারাপ সময়, আবার ভালো— এই ওঠানামায় মস্তিষ্কে এক ধরনের 'ইমোশনাল অ্যাডিকশন' বা আবেগের নেশা তৈরি হয়। এটা নিছক দুর্বলতা নয়, এটা শরীরের রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া।
আত্মবিশ্বাস ভেঙে পড়লে বের হওয়া আরও কঠিন হয়
নিয়মিত মানসিক নির্যাতনে একসময় মানুষ নিজেকে ছোট ভাবতে শুরু করেন। মনে হয়, ‘আমার এর চেয়ে ভালো কিছু পাওয়ার যোগ্যতা নেই।’, ‘আমি চলে গেলে কে তোমাকে চাইবে?’
“এই ভাবনাগুলো নির্যাতনকারী সুচিন্তিতভাবে তৈরি করেন- বারবার সমালোচনা করে, অপমান করে, নির্ভরশীলতা বাড়িয়ে। ধীরে ধীরে ভুক্তভোগী বিষাক্ত সম্পর্কটাকেই স্বাভাবিক মনে করতে শুরু করে” বলেন অ্যাবি।
এর সঙ্গে যোগ হয় বাস্তব ভয়। সম্পর্ক ছাড়লে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক কথাবার্তা, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ। এই ভয়গুলো ‘ট্রমা বন্ডিং’কে আরও শক্তিশালী করে।
বের হওয়ার পথ আছে, তবে একা নয়
‘ট্রমা বন্ডিং’ থেকে বের হওয়া কঠিন, তবে অসম্ভব নয়। এবং এই পথ একা হাঁটা আরও কঠিন।
প্রথম ধাপ হলো স্বীকার করা— ‘সম্পর্কটা ক্ষতিকর এবং আমি আহত হচ্ছি’। এই স্বীকৃতিটুকুই অনেক বড় পদক্ষেপ।
ডা. দিনা বলেন, “সম্ভব হলে নির্যাতনকারীর সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত বা বন্ধ করতে হবে। কী ঘটছে সেটা লিখে রাখা যেতে পারে। এতে নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে বিভ্রান্তি কমে, বাস্তবতা স্পষ্ট হয়।”
বন্ধু বা পরিবারের কাছে মন খুলুন। একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলুন— এটা বিলাসিতা নয়, প্রয়োজনীয়তা।
নিজের আত্মসম্মান পুনর্গঠনে সময় দিন। নিজের প্রয়োজন, নিরাপত্তা আর সুস্থতাকে আগে রাখুন।
সম্পর্ক ভাঙা ব্যর্থতা নয়, অনেক সময় এটাই নতুন শুরু
ডা. দিনা বলেন, “যারা কাছের মানুষকে বিষাক্ত সম্পর্কে দেখছেন, তাদের কাছে একটাই অনুরোধ— সহানুভূতি রাখুন। ‘ছেড়ে দিলেই হয়’ — এটা বলা সহজ, কিন্তু ‘ট্রমা বন্ডিং’য়ে আটকে থাকা মানুষের জন্য এটা অতটা সহজ নয়”
একটা সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া জীবনের শেষ নয়। অনেক সময় সেখান থেকে বেরিয়ে আসাই সুস্থ জীবনের শুরু।
‘ট্রমা বন্ডিং’ ভাঙার প্রথম ধাপটা ছোট- শুধু স্বীকার করতে হবে যে, ‘আপনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন’, এবং ‘আপনি এর চেয়ে ভালো জীবন পাওয়ার যোগ্য’।
আরও পড়ুন