Published : 15 Jun 2026, 02:34 PM
এই লেখাটা যখন লিখছি, তখন বিশ্বকাপ ফুটবলে জার্মানি বনাম কুরাসাও খেলা চলছে। গুগলের সার্চ অপশনে ঢুকে দেখি, কুরাসাও তখন গুগল ট্রেন্ডে এক নম্বরে। অর্থাৎ, সারা বিশ্বের মানুষের কাছে সেই মুহূর্তে সবচেয়ে আগ্রহের বিষয় ক্যারিবীয় অঞ্চলের এই ক্ষুদ্র দ্বীপদেশ।
ঢাকার চেয়েও ছোট এই দ্বীপরাষ্ট্রের আয়তন মাত্র ৪৪৪ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা মিরপুরের চেয়ে ১০ গুণ এবং উত্তরার চেয়ে অন্তত ২০ গুণ কম। একসময় ক্যারিবীয় অঞ্চলের কয়েকটি দ্বীপ নিয়ে নেদারল্যান্ডসের একটি রাজনৈতিক ইউনিট ছিল; ২০১০ সালে সেটি ভেঙে গেলে কুরাসাও স্বায়ত্তশাসিত দেশের মর্যাদা পায়। তবে তারা এখনো পুরোপুরি স্বাধীন নয়।
মাত্র এক দশক আগে আন্তর্জাতিক ফুটবলে পা রাখা দেড় লাখ মানুষের এই দেশ বিশ্বকাপের মঞ্চে দাঁড়িয়ে জার্মানির মতো পরাশক্তির বিপক্ষে খেলছে। ততক্ষণে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ জেনে গেছে এই দেশের নাম। গুগলে ট্রাফিক লেগে গেছে এটা জানতে যে, কোথায় এই দেশ, কেমন তার মানুষ, কেমন তার সংস্কৃতি।
একটি মাত্র সাফল্য, মাত্র একবারের জন্য বিশ্বমঞ্চে উপস্থিতি গোটা দেশের পরিচয়কে পৃথিবীর প্রতিটি কোণায় পৌঁছে দিয়েছে। সামনের দিনগুলোতে লাখ লাখ মানুষ হয়তো এই অচেনা দ্বীপে ভ্রমণ করবে; দেশটির পর্যটন, সংস্কৃতি ও অর্থনীতিতে পড়বে গভীর প্রভাব। রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বড় বড় আন্তর্জাতিক পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে কিংবা মেগাসিটিতে রোডশো করে তৈরি হয় না; বরং এভাবেই দাঁড়ায়। একটি দেশের ভাবমূর্তি গড়ে ওঠে তার অর্থনীতি, সমাজ, নাগরিক আচরণ, আইনের শাসন, মানবাধিকার পরিস্থিতি, কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সম্মিলিত প্রতিফলনে।

বাংলাদেশের একজন নাগরিক যখন বিদেশের কোনো ব্যাংকের লাইনে দাঁড়ান, তখন সেখানে শুধু একজন ব্যক্তি দাঁড়িয়ে থাকেন না; তার সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকে পুরো দেশের ভাবমূর্তি। একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে বিক্রয়কর্মীর সঙ্গে তার আচরণেও ফুটে ওঠে দেশের পরিচয়। বিদেশের মাটিতে প্রতিটি নাগরিকই একেকটি ভ্রাম্যমাণ দূতাবাস; তাদের আচরণ, সততা, দায়িত্ববোধ ও সামাজিক শিষ্টাচার দিয়েই বিশ্বের মানুষ একটি দেশকে বিচার করে।
গত ৫৫ বছরে বাংলাদেশ কতটুকু আন্তর্জাতিক হয়ে উঠতে পেরেছে, তার প্রতিফলন সুইজারল্যান্ড থেকে প্রকাশিত বিশ্বায়ন সূচকে (KOF Globalization Index) দেখা যায়। ২০২৫-২৬ সালের সর্বশেষ প্রতিবেদনে, ১৯৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের সামগ্রিক অবস্থান ১৫০তম। রাজনৈতিক বিশ্বায়নে বাংলাদেশ ৯২তম, সামাজিক বিশ্বায়নে ১৪৫তম এবং অর্থনৈতিক বিশ্বায়নে ১৭৯তম।
এর অর্থ হলো, বাংলাদেশ এখনো বৈশ্বিক অর্থনীতি ও রূপান্তরিত সামাজিক ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত হতে পারেনি। রপ্তানি বাজার অল্প কয়েকটি পণ্যের ওপর নির্ভরশীল, বিদেশি বিনিয়োগ সীমিত, ব্যবসার পরিবেশ জটিল, আমলাতান্ত্রিক জট, নীতির অস্থিরতা এবং দুর্নীতি আন্তর্জাতিক আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আন্তর্জাতিক পরিসরে নাগরিকদের আচরণ, দেশের ভেতর সাংস্কৃতিক অভিযোজন এবং আইন মেনে চলার প্রবণতা সামাজিক বিশ্বায়নের ক্ষেত্রে দেশকে পিছিয়ে রেখেছে।
এর সঙ্গে আরও কিছু বিষয় বিশ্বের সামনে বাংলাদেশের ইমেজকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
যেমন ধরুন, উন্নত দেশগুলোতে আশ্রয় পাওয়ার জন্য কিছু বাংলাদেশিকে নানা অসৎ উপায় অবলম্বন করতে দেখা যায়। মিথ্যা তথ্য দেওয়া, নকল নথি ব্যবহার, এমনকি যৌন পরিচয় গোপন বা ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে আশ্রয় প্রার্থনার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। এটি স্রেফ ব্যক্তিগত প্রতারণা নয়, বরং বাইরের দুনিয়ায় দেশের নাগরিকদের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এসব প্রতারণায় জড়িয়ে পড়ার বড় কারণ, বিদেশে যাওয়ার আগে অনেকেরই উন্নত সমাজের সামাজিক রীতি, আইনি কাঠামো এবং নাগরিক আচরণ সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা থাকে না। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে নাগরিকদের দক্ষ করে তোলার তেমন কোনো চেষ্টা দেখা যায় না।
ইউরোপে অবৈধ পথে প্রবেশের চেষ্টা করতে গিয়ে সাগরে মৃত্যু, সীমান্তে আটক ও মানবপাচারকারীদের হাতে প্রতারণার শিকার হওয়ার খবরের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই বাংলাদেশের নাম আসে। এসব সংবাদ শুধু মানবিক ট্র্যাজেডি নয়; বরং বিশ্বে বাংলাদেশকে একটি ‘অস্থির ও হতাশাগ্রস্ত অভিবাসী-উৎপাদক দেশ’ হিসেবে উপস্থাপন করে। বছরের পর বছর ধরে এমন ঘটনা চললেও এসব বন্ধে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না।
বিদেশি সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশকে নিয়ে নেতিবাচক খবরও বাড়ছে। এর পেছনে শুধু অভ্যন্তরীণ সংকট নয়, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনও ভূমিকা রাখে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অবনতি হলে সেই দেশের মিডিয়াতেও নেতিবাচক বয়ান তৈরি হয়। ফলে কূটনৈতিক সম্পর্ক শুধু রাজনৈতিক নয়, ভাবমূর্তির প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ।
গত কয়েক বছর ধরে দেশের অভ্যন্তরে মব কালচার, খুন ও সহিংসতা আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। গণপিটুনি, জনতার হাতে বিচার, ধর্মীয় বা সামাজিক বিদ্বেষে নৃশংস হত্যার মতো ঘটনা যখন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আসে, তখন তা বিশ্বে বাংলাদেশের আইনের শাসন ও মানবিকতার চিত্রকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ময়মনসিংহে দীপু চন্দ্র দাসকে গাছে ঝুলিয়ে পুড়িয়ে মারার মতো ঘটনা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হওয়া নিঃসন্দেহে দেশের জন্য সুখকর ছিল না।
শিক্ষার্থীদের ভিসা পাওয়ার হারেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তিতে ফাটল দেখা যাচ্ছে। প্রায় প্রতিটি দেশে বাংলাদেশিদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার বেড়েছে। অস্ট্রেলিয়ার স্টুডেন্ট ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে একসময় যেখানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আবেদন গুরুত্ব পেত, এখন সেখানে এ হার উল্লেখযোগ্য হারে কম। চলতি শিক্ষাবর্ষে ৫৪ শতাংশ শিক্ষার্থীর ভিসার আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এর পেছনে নকল কাগজপত্র, দালালচক্র, ভুয়া আর্থিক বিবরণী এবং প্রকৃত শিক্ষার্থী পরিচয়ের অভাব বিশেষভাবে দায়ী। শিক্ষার্থী ভিসায় পড়তে এসে পড়াশোনা না করাও আরেকটি বড় কারণ। প্রশ্ন হলো, এসব বন্ধে সরকার কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে?
আন্তর্জাতিক সূচকগুলোও বাংলাদেশের ভাবমূর্তির সংকটকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির ধারণা সূচকে বাংলাদেশ এখনো বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ। দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি করে না; এটি আন্তর্জাতিক আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতাও কমিয়ে দেয়। 'হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্স'-এর পাসপোর্ট সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৫তম। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশি পাসপোর্টের গ্রহণযোগ্যতা শুধু কমই নয়, সোমালিয়া ও সুদানের মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের কাতারে নেমে এসেছে। হাতেগোণা মাত্র কয়েকটি দেশে বাংলাদেশিরা এখন ভিসা ছাড়া ভ্রমণ করতে পারেন এবং দিন দিন এই সংখ্যা কমছে।
ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্সের বাসযোগ্য শহরের তালিকায় ঢাকা ১৭১তম। রাজধানীর স্বাস্থ্যসেবা, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও অবকাঠামোর দিক এখানে প্রতিফলিত হয়েছে। সুখি দেশের তালিকায় আমাদের অবস্থান ১২৭তম।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক সামাজিক সূচকগুলোর একটি হলো বাল্যবিবাহ। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাল্যবিবাহে বাংলাদেশ এশিয়ায় প্রথম। এটি আন্তর্জাতিকভাবে নারী অধিকার, শিক্ষা এবং মানবিক উন্নয়নের সূচকে দেশের অবস্থানের প্রতিফলন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রীতিমতো প্রকাশ্যে বাল্যবিবাহের পক্ষে প্রচার চলছে, যা নিতান্ত লজ্জার হলেও এসব বন্ধে সরকারের উদ্যোগ নেই।
দেশের ভাবমূর্তির সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ, নাগরিকদের অবাধ যাতায়াত এবং রেমিটেন্স সরাসরি সম্পৃক্ত। ফলে ভাবমূর্তি রক্ষায় প্রচুর টাকা খরচ করে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিলে কাজে আসবে না; বরং দরকার দেশের অভ্যন্তরে সুশাসন, আইনের কঠোর প্রয়োগ, নিরাপদ অভিবাসন ব্যবস্থা, নাগরিকদের আন্তর্জাতিক আচরণবিধি শেখানো, শিক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং সামাজিক সহিংসতা বন্ধ করা।
রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর তার নাগরিকরাই। তাই নাগরিকদের আচরণ ও রাষ্ট্রীয় নীতির মধ্যে সমন্বয় তৈরি না হলে বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উন্নয়ন সম্ভব নয়। ভাবমূর্তি রক্ষা এখন কোনো বিলাসিতা নয়; বরং এটি অর্থনীতি, কূটনীতি, বিনিয়োগ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আবশ্যকীয় বিষয়।
এসব বিবেচনায়, দেশের ভাবমূর্তি উন্নয়নে আসন্ন বাজেটে স্পষ্ট দিক-নির্দেশনা যুক্ত করুন।
রাজু নূরুল উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ও লেখক। বর্তমানে সোমালিয়া সরকারের অর্থ, পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র অ্যাডভাইজার হিসেবে কর্মরত। যোগাযোগ: [email protected]