Published : 07 Jul 2026, 05:10 PM
জীবনের ইনিংসের বৃহস্পতিবার ৩৯ পূর্ণ করার কথা শাপুর জাদরানের। আগের দিনই নিভে গেল জীবন প্রদীপ। ক্রিকেট মাঠে অনেক লড়াইয়ে জিতেছেন তিনি। কিন্তু কঠিন রোগের সঙ্গে লড়তে লড়তে ক্ষান্তি দিতেই হলো। দিল্লির এক হাসপাতালে জীবনাবসান হলো আফগানিস্তানের সাবেক পেসারের।
বেশ কিছু দিন ধরেই ‘হেমোফ্যাগোসাইটিক লিম্ফোহিস্টিওসাইটোসিস (এইচএলএইচ)’ রোগে ভুগছিলেন শাপুর। প্রাণঘাতী একটি বিরল রোগ এটি, যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হতে শুরু করে। এইচএলএইচ-এর ‘অ্যাডভান্সড’ পর্যায়ে ছিলেন তিনি। গত জানুয়ারিতে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে দিল্লিতে আনা হয়।
হাসপাতালে তার সঙ্গে থাকা ছোট ভাই সাবেক ক্রিকেটার গামাই জাদরান নিশ্চিত করেছেন বড় ভাইয়ের মৃত্যুর খবর।
আফগান ক্রিকেটের শুরুর দিকের তারকা ছিলেন শাপুর। ৬ ফুট ২ ইঞ্চি উচ্চতা, কাঁধ পর্যন্ত ঢেউ খেলানো চুল, লম্বা রান আপ, আগ্রাসী বোলিং মিলিয়ে আফগান ক্রিকেটের সবচেয়ে পরিচিত মুখগুলোর একটি ছিলেন বাঁহাতি এই পেসার।

তার ক্রিকেটার হয়ে ওঠার গল্পটা ওই প্রজন্মের আরও অনেক আফগানদের মতোই। আফগানিস্তানের লোগার প্রদেশে জন্ম ও বেড়ে ওঠা তার। কিন্তু ওই অঞ্চলে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে তিনি পাকিস্তানের পেশাওয়ারে চলে যান। সেখানে আরবাব নিয়াজ স্টেডিয়াম ও জিমথানায় খেলতে শুরু করে ও উন্নতি করেন। তখন স্বপ্ন দেখতেন পাকিস্তানের হয়ে খেলার। হতে চাইতেন শোয়েব আখতারের মতো ফাস্ট বোলার।
পরে জানতে পারেন, পাকিস্তানের সাবেক লেগ স্পিনার ইকবাল সিকান্দার কোচিং ক্যাম্প পরিচালনা করছেন আফগাস্তিানে। শাপুর জন্মভূমিতে ফিরে গিয়ে ট্রায়াল দেন এবং ছুটতে শুরু করেন ক্রিকেটের পথে।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার অভিষেক ২০০৯ সালে। দেশের হয়ে খেলেছেন ৪৪ ওয়ানডে ও ৩৬ টি-টোয়েন্টি। শেষবার তাকে জাতীয় দলের হয়ে দেখা গেছে ২০২০ সালে।
২০১৫ ওয়ানডে বিশ্বকাপে ১৫ উইকেট নিয়ে আফগানিস্তানের সেরা বোলার ছিলেন তিনি। বাংলাদেশের বিপক্ষে ক্যানবেরায় ৭ ওভারে ২০ রান দিয়ে নিয়েছিলেন দুটি উইকেট। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি তার সেরা বোলিং পারফরম্যান্স (৩/৪০)।
তার পা পড়েছে বিপিএলেও। ২০১৩ আসরে খুলনা রয়্যাল বেঙ্গলসের হয়ে ৮ ম্যাচে ১০ উইকেট নিয়েছিলেন ওভারপ্রতি ৬.২৯ রান দিয়ে।
ক্রিকেটার হিসেবে দারুণ জনপ্রিয় ছিলেন শাপুর। এছাড়াও আফগান ক্রিকেটে তার পরিচিতি ছিল উদারতা ও দয়ার জন্য। অনেক তরুণ ও উঠতি ক্রিকেটারের ‘মেন্টর’ ছিলেন তিনি, তাদের মধ্যে আছেন আফগান ক্রিকেটের সচেয়ে বড় তারকা রাশিদ খানও। তার চিকিৎসা প্রক্রিয়া চলার সময় রাশিদ, সাবেক অধিনায়ক আসগার আফগানসহ আরও বেশ কজন সাবেক ক্রিকেটার যোগাযোগ রাখতেন নিয়মিত।
গত মাসে ভারতে আফগানিস্তান দলের সিরিজের সময় অধিনায়ক হাশমাতউল্লাহ শাহিদি, কোচ রিচার্ড পাইবাস ও আরও কজন ক্রিকেটার তাকে দেখতে গিয়েছিলে হাসপাতালে।
আফগান ক্রিকেটের এগিয়ে চলায় শাপুরের অবদান ও নিবেদনের কথা মিশে থাকল আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের বিবৃতিতে।

“সাবেক আফগান ফাস্ট বোলার শাপুর জাদরানের মৃত্যুতে গভীর দুঃখ নিয়ে শোক প্রকাশ করছে আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ড। আফগান ক্রিকেটের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারীদের একজন ছিলেন শাপুর, যার নিষ্ঠা, আবেগ এবং অটল অঙ্গীকার আমাদের দেশে ক্রিকেটের উত্থান ও বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তিনি সেইসব গর্বিত ক্রিকেটারদের একজন. যারা আফগান ক্রিকেটের প্রাথমিক যাত্রার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন এবং আফগান ক্রিকেটকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিয়ে আসার পথ তৈরিতে সাহায্য করেছিলেন।
ক্যারিয়ারজুড়ে সম্মান, সাহস এবং গর্ব নিয়ে আফগান ক্রিকেটের সেবা করেছেন শাপুর। তার অবদান ও অর্জন আফগান ক্রিকেটের ইতিহাসে সবসময় গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকবে এবং জাতীয় দলের সেবায় তার প্রচেষ্টা কখনও ভোলা যাবে না।”
সেই বিবৃতিতেই তুলে ধরা হলো, মাঠের সীমানা ছাড়িয়ে কীভাবে ভূমিকা রেখেছেন তিনি।
“মাঠের সাফল্যের বাইরেও, বহু তরুণ আফগান ক্রিকেটার এবং বিশ্বজুড়ে ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য সত্যিকারের অনুপ্রেরণার উৎস ছিলেন শাপুর। তার লড়াকু মনোভাব, দৃঢ় সংকল্প এবং খেলার প্রতি ভালোবাসা অনেককে আশা যুগিয়েছে এবং একটি প্রজন্মকে আরও বড় স্বপ্ন দেখতে ও আফগান ক্রিকেটের ভবিষ্যতের ওপর বিশ্বাস রাখতে উৎসাহিত করেছে।
তার পরিবার, বন্ধু, প্রিয়জন, প্রাক্তন সতীর্থ এবং সমগ্র আফগান ক্রিকেট সম্প্রদায়ের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা ও গভীর সহানুভূতি জানাচ্ছে আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ড। তার অভাব গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে এবং আফগানিস্তানের জনগণ ও ক্রিকেট বিশ্বের হৃদয়ে তার স্মৃতি চিরকাল অমলিন থাকবে।”