Published : 15 Jun 2026, 04:09 PM
বাস্তব জগতের বিভিন্ন সাইবার হামলার তদন্ত ও তা ঠেকানোর উদ্দেশ্যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে প্রশিক্ষণ দিতে অ্যালাবামায় আস্ত এক কৃত্রিম শহর তৈরি করেছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই।
অ্যালাবামার হান্টসভিলে নিজেদের ক্যাম্পাসে ২২ হাজার বর্গফুটের এক কৃত্রিম শহর তৈরি করেছে মার্কিন সংস্থাটি। এবার সেই শহরের ভেতরের চিত্র এফবিআই সবার সামনে উন্মোচন করেছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি সাইট টেকক্রাঞ্চ।
এ কৃত্রিম শহরের মূল উদ্দেশ্য ক্লাসরুমের গণ্ডি পেরিয়ে এক নিরাপদ ও সুরক্ষিত পরিবেশের মধ্যে তদন্তকারীদের হাতে-কলমে বাস্তবমুখী শিক্ষা দেওয়া।
এখানে তারা ব্যবহার করছেন আধুনিক প্রযুক্তির নিত্যনতুন সব কনজিউমার ও এন্টারপ্রাইজ ডিভাইস, যেগুলো প্রতিনিয়ত ক্ষতিকারক হ্যাকারদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হয়ে থাকে। সাইবার অপরাধের পরিসংখ্যান দেখলে এফবিআইয়ের এ প্রশিক্ষণের গুরুত্ব বোঝা যায়।
এফবিআইয়ের ২০২৫ সালের ‘ইন্টারনেট ক্রাইম রিপোর্ট’ অনুসারে, ১০ লাখেরও বেশি অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে সাইবার অপরাধের কারণে ক্ষতির পরিমাণ রেকর্ড ২ হাজার ৯০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২৬ শতাংশ বেশি।
এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ও চলমান হুমকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ‘র্যানসমওয়্যার’, যা দেশটির গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন অবকাঠামোকে ক্রমাগত ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
‘কাইনেটিক সাইবার রেঞ্জ’ নামে এফবিআইয়ের এ বিশেষ ছোট শহরটি ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে চালু হয়। আসল মার্কিন শহরের আদলে তৈরি এ কৃত্রিম জনপদে রয়েছে আসবাবপত্রে সাজানো সম্পূর্ণ বাড়িঘর, হোটেল, গ্যাস স্টেশন, গ্রোসারি মার্ট, আদালত, হাসপাতাল ও একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কোম্পানি।
এসবের সঙ্গে রয়েছে বাস্তবসম্মত রাস্তাঘাট ও ট্রাফিক লাইট ব্যবস্থা। সংস্থাটি বলেছে, উদ্বোধনের পর থেকে এ পর্যন্ত এ কেন্দ্রে ১ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে এফবিআইয়ের নিজস্ব কর্মীসহ অন্যান্য ফেডারেল ও স্থানীয় সংস্থার অংশীদাররাও রয়েছেন।
শহরের প্রতিটি অংশ সচল ডিভাইস ও প্রযুক্তির এমন এক নেটওয়ার্ক দিয়ে যুক্ত, যা ঠিক আসল এক সমাজ বা ব্যবসায়িক কোম্পানির মতোই কাজ করে। তবে এখানে এমন এক সুরক্ষিত ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যাতে প্রশিক্ষণের সময় চালানো কৃত্রিম বিভিন্ন সাইবার হামলা কোনোভাবেই এ কেন্দ্রের বাইরে ছড়িয়ে পড়তে না পারে।
এ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে রয়েছে বড় আকারের ডেটা সেন্টার, যেখানে দুইশোটিরও বেশি ফিজিক্যাল সার্ভার বসানো হয়েছে। এর কোনোটি উইন্ডোজ আবার কোনোটি লিনাক্স অপারেটিং সিস্টেমে চলে।
বাস্তব জীবনে কোনো কোম্পানিতে সাইবার হামলা হলে বা সার্চ ওয়ারেন্ট নিয়ে তদন্তে গেলে তদন্তকারীরা ঠিক যেমন কর্পোরেট পরিবেশের মুখে পড়েন বিষয়টি হুবহু তেমনই।
এ প্রশিক্ষণ পরিবেশ সম্পর্কে কেন্দ্রের প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডেভ বিচবোর্ড বলেছেন, “এসব জায়গা প্রচণ্ড ঠান্ডা, সংকীর্ণ, কোলাহলপূর্ণ, অন্ধকার ও বেশ অস্বস্তিকর।” তদন্তকারীদের আসল পরিস্থিতির মানসিক ও শারীরিক চাপের অভ্যাস করাতেই এ পরিবেশ তৈরি করেছে সংস্থাটি।
এ কৃত্রিম শহরটির আরেকটি বড় সুবিধা হচ্ছে এখানে হুবহু আসল র্যানসমওয়্যার হামলা ও বাস্তব জীবনে তার মারাত্মক বিভিন্ন প্রভাব ফুটিয়ে তোলা যায়। যেমন, সাইবার হামলার কারণে হঠাৎ হাসপাতালের পুরো সিস্টেম বন্ধ হয়ে গেলে মানুষের জীবন নিয়ে যে চরম ঝুঁকি তৈরি হয় তেমন উচ্চ-চাপের পরিস্থিতিতে তদন্তকারীদের কতটা দ্রুত ও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয় তা এ শহরের মাধ্যমে বাস্তবসম্মতভাবে অনুশীলন করা সম্ভব।
‘কাইনেটিক সাইবার রেঞ্জ’ মার্কিন তদন্তকারীদের ‘ডিজিটাল ফরেনসিকে’র বিষয়েও প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। কোনো সাইবার অপরাধ তদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে আধুনিক এনক্রিপ্টেড বা সুরক্ষিত ডিভাইসগুলোর সাইবার নিরাপত্তা প্রাচীর ভেদ করতে পুলিশ এ ফরেনসিক পদ্ধতি ব্যবহার করে।
তবে এ কাজের জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন টুল বা প্রযুক্তি বেশ বিতর্কিত। কারণ, এগুলো অ্যাপল বা গুগলের মতো বিভিন্ন ডিভাইস নির্মাতা কোম্পানির অজান্তে তাদের সিস্টেমে থাকা এমন কিছু দুর্বলতা বা ত্রুটিকে কাজে লাগায়, যা এসব কোম্পানি কখনই জানতে পারে না। ফলে, ব্যবহারকারীদের সুরক্ষার জন্য এসব টেক জায়ান্ট যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলে তা সহজেই ভেঙে ফেলা সম্ভব।