Published : 11 May 2026, 02:53 PM
কিছুদিন আগেও ডেইটিং মানে ছিল সহজ— পছন্দ হল, কথা বললো, সম্পর্ক হল। ভালো না লাগলে বলে দিল।
তবে এখন সেই সরল সমীকরণ আর নেই। ফ্যাশন, প্রযুক্তি, বিনোদনের মতো প্রেমের জগতেও এখন জেন–জি প্রজন্মই ট্রেন্ড বা ধারা নির্ধারণ করছে।
তারা কেবল নতুন ধরনে সম্পর্ক করছে না, প্রতিটি আচরণকে দিচ্ছে নতুন নাম। তৈরি হচ্ছে একটি সম্পূর্ণ নতুন ডেইটিং ডিকশনারি।
‘দিনট ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন অবলম্বনে এই ডিকশনারির কয়েকটি প্রচলিত শব্দ সম্পর্কে এখানে জানানো হল।
ইমোশনাল এয়ারবিএনবি: কাঁধ ধার নিয়ে কাজ শেষ
এয়ারবিএনবি মানে তো জানেন— প্রয়োজনের সময় একটু থাকলাম, কাজ মিটলে চলে গেলাম। জেন–জি এই ধারণাটাকে এনেছে সম্পর্কের মধ্যে।
'ইমোশনাল এয়ারবিএনবি' হল এমন একটি সম্পর্ক, যেখানে একজন মানুষ অপরজনকে কেবল নিজের আবেগগত প্রয়োজন মেটাতে ব্যবহার করেন। মন খারাপ হলে ছুটে আসেন, কাঁধে মাথা রাখেন, দুঃখের কথা বলে হালকা হন।
তবে যখনই নিজে একটু স্থির হয়ে যান, মানসিকভাবে ভালো অনুভব করেন, তখন হুট করেই সরে পড়েন।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. ফারজানা রহমান দিনা বলেন, “এই ধরনের সম্পর্কে যে কাঁধটি দিচ্ছেন, তার মানসিক ক্ষতি হয় সবচেয়ে বেশি। কারণ তিনি সম্পর্কটিকে বাস্তব ভাবেন। তবে অপর পক্ষের কাছে সেটি স্রেফ সাময়িক আশ্রয়।”
জম্বিড: মরে গিয়েও ফিরে আসা
হরর সিনেমার জম্বি যেমন মরেও মরে না, হঠাৎ উঠে আসে— এই শব্দটার মানেও ঠিক সেরকম।
'জম্বিড' হল সেই পরিস্থিতি, যেখানে কেউ হঠাৎ করে সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। ফোন নেই, বার্তা নেই, কোনো কারণ নেই। মনে হয় সম্পর্কটা শেষ। তারপর এক সপ্তাহ বা দুই সপ্তাহ পর হঠাৎ বার্তা আসে— 'কী করছ? গত কয়দিন যে কী ব্যস্ততায় ছিলাম!'
যেন কিছুই হয়নি। যেন এই নিখোঁজ থাকাটা একদম স্বাভাবিক ঘটনা। অপর পক্ষ এতদিন কী অনুভব করেছেন, সেটা নিয়ে ভাবনা নেই।
জম্বিড যারা করেন, তারা সাধারণত কোনো দায়বদ্ধতা ছাড়াই সম্পর্কে ঢুকতে ও বেরোতে অভ্যস্ত। এই আচরণ অপর মানুষটির আত্মবিশ্বাস এবং মানসিক স্বাস্থ্যে গভীর ক্ষত তৈরি করতে পারে।
রোচিং: একজনকে দেখিয়ে আরও অনেককে
নামটা এসেছে তেলাপোকা থেকে। তেলাপোকা যেমন অন্ধকারে লুকিয়ে থাকে, আলো দেখলে পালায়— 'রোচিং' করা মানুষগুলোও অনেকটা সেরকম।
বাইরে থেকে দেখে মনে হবে তিনি কেবল আপনার সঙ্গেই আছেন। আপনিই তার সব। তবে আড়ালে তিনি একসঙ্গে দুজন, তিনজন বা আরও বেশি মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখছেন।
রোচিং আসলে একটি সুপরিকল্পিত প্রতারণা। এখানে মিথ্যা বলা হয় না সরাসরি, বরং সত্যটাকে লুকিয়ে রাখা হয় সযত্নে।
এই ধরনের সম্পর্ক যখন ভেঙে পড়ে এবং আসল ঘটনা বেরিয়ে আসে। তখন যিনি না জেনে সম্পর্কে ছিলেন তার বিশ্বাস ও আত্মসম্মান দুটোই চুরমার হয়ে যায়।
ফিজলিং: ঝগড়া নেই, তবু সম্পর্ক শেষ
এটাই হয়ত সবচেয়ে বেশি চেনা অভিজ্ঞতা। কোনো বড় ঝগড়া হয়নি। কেউ কাউকে সরাসরি ছেড়ে যায়নি। শুধু ধীরে ধীরে বার্তার উত্তর দিতে দেরি হতে লাগল। কথা কমে গেল। দেখা আর হয় না। একসময় টের পাওয়া গেল—সম্পর্কটা আর নেই।
'ফিজলিং' হল এই ধীরে ধীরে নিভে যাওয়ার নাম। এখানে কোনো ব্যাখ্যা নেই, কোনো সমাপ্তির মুহূর্ত নেই।
অনেকে মনে করেন এটা কম কষ্টের। তবে মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন উল্টো কথা। স্পষ্ট সমাপ্তি না থাকায় মানুষ দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তায় থাকেন, নিজেকে দোষ দেন এবং মানসিকভাবে আটকে থাকেন।
পকেটিং: পকেটে ঢুকিয়ে রাখা সম্পর্ক
সম্পর্কে আছেন, তবে পরিবার বা বন্ধুদের কাছে একেবারে 'সিঙ্গেল'। সঙ্গীকে কখনও পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় না, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নেই, গ্রুপে নেই— যেন সম্পর্কটা পকেটে লুকিয়ে রাখা। এই আচরণের নামই 'পকেটিং'।
সম্পর্কের শুরুতে কিছুটা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রাখা স্বাভাবিক। তবে দীর্ঘদিন ধরে কোনো কারণ ছাড়াই পকেটিং চলতে থাকলে সেটিকে বিশেষজ্ঞরা 'রেড ফ্ল্যাগ' বলছেন।
এর পেছনে সাধারণত থাকে সমান্তরাল সম্পর্ক, পারিবারিক চাপ বা দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি এড়ানোর ইচ্ছা।
নতুন শব্দ, পুরোনো কষ্ট
শব্দগুলো নতুন, তবে এর পেছনের যন্ত্রণা চিরকালের।
ডা. দিনা বলেন, “সম্পর্কে থেকে মানুষ প্রতারিত হয়েছে, উপেক্ষিত হয়েছে, অনিশ্চয়তায় কষ্ট পেয়েছে। এটা নতুন কিছু নয়। জেন–জি শুধু সেই অভিজ্ঞতাগুলোকে একটা নাম দিয়েছে, চেনার সুবিধা করে দিয়েছে।”
এই শব্দগুলো জানা থাকলে অন্তত নিজের সঙ্গে কী হচ্ছে সেটা বুঝতে পারা যায়। আর বুঝতে পারলেই সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়— থাকব, নাকি যাব।
আরও পড়ুন
সম্পর্কের উদ্বেগ: প্রেমের আনন্দে কেনো বাসা বাঁধে ভয়?