Published : 15 Jun 2026, 06:39 PM
উত্তর আমেরিকায় শুরু হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় আসর ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ। কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরুর পর থেকেই পুরোনো অনেক আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নিয়েছে।
প্রধান আয়োজক দেশ আমেরিকার কঠোর অভিবাসন নীতি, ভিসা জটিলতা, প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা এবং বর্ণবাদী আচরণ উৎসবমুখর পরিবেশকে অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা খেলোয়াড়, কর্মকর্তা, সাংবাদিক ও সমর্থকদের দেশটিতে প্রবেশের সময় নানা ধরনের বাধা ও হয়রানির মুখে পড়তে হচ্ছে।
বিশ্বকাপ শুরুর আগেই দেশটিতে বন্দুক সহিংসতা, কঠোর অভিবাসন নীতি এবং বাড়তি নজরদারি চলছিল। এমনকি বিশ্বকাপ দেখতে আসা দর্শকদের জন্য বিশেষ ভ্রমণ সতর্কতাও যুক্তরাষ্ট্র জারি করে রেখেছিল। এ অবস্থায় অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ ১২০টির বেশি মানবাধিকার সংগঠন যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।
প্রস্তুতি চলাকালে মিসৌরি অঙ্গরাজ্যে ইংল্যান্ড দলের ক্যাম্পের কাছে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। ইরাকের স্ট্রাইকার আইমান হুসেনকে শিকাগোর ও’হেয়ার বিমানবন্দরে সাত ঘণ্টা ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একই দলের একজন আলোকচিত্রীকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। এদিকে কোনো স্পষ্ট কারণ না দেখিয়েই সুইজারল্যান্ড ও মরক্কো দলের কয়েকজন খেলোয়াড়ের ভিসা বাতিল বা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। গত শনিবার বৈধ ভিসা থাকা সত্ত্বেও মিয়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক সোমালি রেফারিকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। স্কটল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশের সমর্থকদেরও সীমান্ত থেকে ফিরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে, ইরান ও হাইতির অনেক সমর্থক নিজ দলের খেলা দেখতে আমেরিকায় যাওয়ার সুযোগই পাচ্ছেন না।
এসব ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সাংবাদিকদের সংগঠন ‘ইন্টারন্যাশনাল স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশন’। সংগঠনটি ইরানি ও আফ্রিকান সাংবাদিকদের ভিসা না দেওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
ফুটবল বিশ্বকাপ দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বজুড়ে সংযোগ, পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সম্মিলিত আবেগের এক অনবদ্য প্রতীক। কিন্তু অভিবাসন ও ভিসা নীতিতে বৈষম্য, বিদেশের মাটিতে যুদ্ধবাজি কিংবা নারী-শিশুর ওপর আমেরিকার সহিংসতা এখনও থামছেই না। তাই বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ক্রীড়া আসরের আয়োজক হিসেবে দেশটির উপযুক্ততা প্রশ্নবিদ্ধ।
আমেরিকার ‘স্পোর্টসম্যাক্সিং’ বনাম ‘স্পোর্টসওয়াশিং’
‘স্পোর্টসওয়াশিং’ বলতে বোঝায়, কোনো রাষ্ট্র বড় ক্রীড়া আসরের আয়োজন করে যখন মানবাধিকার লঙ্ঘন বা বিতর্কিত নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করে। যদিও পশ্চিমা উদারপন্থী চিন্তাবিদরা এ শব্দটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আরব রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে ব্যবহার করেন। কিন্তু বাস্তবে গণতান্ত্রিক ও কর্তৃত্ববাদী—উভয় ধরনের রাষ্ট্রই এই কৌশল ব্যবহার করে থাকে।
কিন্তু ট্রাম্পের পরিকল্পনা একেবারেই ভিন্ন। বিশ্বকাপ আয়োজন করে আমেরিকার ভাবমূর্তি বদলানোর বাসনা ট্রাম্পের নেই। ট্রাম্পের কাছে বিশ্বকাপ ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করার পরিবর্তে যেন বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ সম্প্রসারণেরই এক নতুন অস্ত্র।
তাই এটি ‘স্পোর্টসওয়াশিং’ নয়, বরং ‘স্পোর্টসম্যাক্সিং’—অর্থাৎ বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়া আসরকে কাজে লাগিয়ে আধিপত্য প্রদর্শন এবং রাজনৈতিক এজেন্ডা এগিয়ে নেওয়া। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফুটবল আসরে কে দেশে প্রবেশ করতে পারবে আর কে পারবে না, কে খেলতে পারবে, কে মাঠে থাকবে—এসব বিষয়ে প্রভাব খাটানোর চেয়ে বড় ক্ষমতার প্রদর্শন আর কী-ই বা হয়!
ফিফার ভূমিকাও সমালোচনার মুখে পড়েছে। গত বছর ডনাল্ড ট্রাম্প নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করার পর ফিফা তাকে নবগঠিত শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করে। এরপর ফিফা ইভাঙ্কা ট্রাম্পকে ১০০ মিলিয়ন ডলারের একটি শিক্ষা উদ্যোগের পরিচালনা পর্ষদে যুক্ত করে, যে অর্থের একটি অংশ বিশ্বকাপের টিকিট বিক্রি থেকে আসে।
আমেরিকা যে সময় ব্যাপকভাবে অভিবাসীদের আটক ও কারাবন্দি করছে, ইরানের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত হচ্ছে, ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি গণহত্যার প্রধান সহযোগী কিংবা লেবাননে জাতিগত নিধনে অস্ত্র সহায়তা দিচ্ছে, তখন সেই দেশকেই বিশ্বকাপের আয়োজক করা ফিফার ঘোষিত মূল্যবোধ ও আদর্শ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
এই বিশ্বকাপ আরও একটি কারণে ব্যতিক্রম। এটিই প্রথম বিশ্বকাপ যেখানে আয়োজক দেশ অংশগ্রহণকারী একটি দেশের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়িত থেকে টুর্নামেন্ট আয়োজন করছে। ট্রাম্প প্রশাসন আয়োজক দেশের ক্ষমতা ব্যবহার করে ইরান ফুটবল ফেডারেশনের জন্য পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে, অথচ ফিফা নীরব। যা আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার মৌলিক নীতির পরিপন্থী।
ফুটবলের বিবেক ও ফিফার কার্যকলাপ
নিশ্চিতভাবেই, ট্রাম্পের সঙ্গে ফিফার অংশীদারত্ব শুধু বিতর্কিত ২০২৬ বিশ্বকাপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি ফিলিস্তিন প্রশ্নে মার্কিন নীতির প্রতি নীরব সমর্থন পর্যন্ত বিস্তৃত। গত শরতে ট্রাম্পের তথাকথিত ‘শান্তি বোর্ড’ জাঁকজমকপূর্ণভাবে ঘোষণা করা হলে, সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো।

ফিফা গাজার ফুটবল অবকাঠামো পুনর্গঠনে অংশ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু গাজায় ২৬৫টিরও বেশি ক্রীড়া স্থাপনা ইসরায়েলি বাহিনী ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত করলেও সংস্থাটি কখনো এ বিষয়ে নিন্দা জানায়নি। গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যায় এক হাজারেরও বেশি ক্রীড়াবিদ নিহত হন। এর মধ্যে রয়েছেন সাবেক ফুটবলার ও ফিলিস্তিন অলিম্পিক দলের কোচ হানি আল-মাসদার। তারপরেও ইসরায়েলের সদস্যপদ স্থগিত করার দাবি ফিফা পাত্তাই দেয়নি।
গত সপ্তাহেও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনী ফিলিস্তিন নারী দলের বর্তমান খেলোয়াড় রন্দ হালওয়ানি ও সাবেক খেলোয়াড় নাতালি আবু দিয়েহকে কোনো অভিযোগ ছাড়াই আটক করে।
২০২২ সালের বিশ্বকাপে কাতারের রাস্তাঘাট ও স্টেডিয়ামগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানবদরদী সমর্থকেরা ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের দখলদারিত্ব ও জাতিগত নিধনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। সে সময় ফিলিস্তিন প্রশ্নটি এতটাই আলোচনায় ছিল যে, ‘নিউইয়র্ক টাইমস’ ফিলিস্তিনকে ‘বিশ্বকাপের অনানুষ্ঠানিক দল’ হিসেবে আখ্যা দেয়। ফলে ফিফার নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও, ফিলিস্তিনের ন্যায়বিচারের বৈশ্বিক সংগ্রামে ফুটবল এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
ফিলিস্তিনের জন্য ভালোবাসাই ফুটবলের আসল সৌন্দর্য
গ্লাসগো, প্যারিস, বিলবাও, আলজিয়ার্স, কায়রো, ইস্তাম্বুলসহ বিশ্বের নানা শহরের ফুটবল মাঠে এখন হাজার হাজার সমর্থকের কণ্ঠে ফিলিস্তিনের পক্ষে স্লোগান, পতাকা এবং প্রতিবাদী ব্যানার এক চিরাচরিত দৃশ্য।
বিশ্বকাপ যেমন মুহূর্তের মধ্যে সারা বিশ্বে উৎসবের আবহ তৈরি করে, তেমনি গণহত্যার বিরুদ্ধেও বিশ্বের মানুষ সরব হতে দ্বিধা করে না। লাখো সমর্থক যখন এই নৈতিক অবস্থান নিয়েছেন, তখন ফুটবলের কিংবদন্তিরাও নীরব থাকেননি। পেপ গার্দিওলার মতো প্রসিদ্ধ কোচ, তরুণ তারকা লামিন ইয়ামাল কিংবা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্ট ‘মরক্কো ফুটবল দল’ ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অথচ ফিলিস্তিন প্রশ্ন সামনে এলেই ফিফা বারবার রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার ভান ধরে।
গত বছরের ডিসেম্বরে ট্রাম্প প্রশাসন ঘোষণা দেয়, বিশ্বকাপ দেখতে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে ইচ্ছুক ভিসা আবেদনকারীদের গত পাঁচ বছরের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রম জমা দিতে হবে। আমেরিকার শহরে শহরে বর্তমানে বর্ণবৈষম্য ও নজরদারি চলছে, অনেকেই হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। এ ছাড়া ম্যাচ চলাকালে অভিবাসন সংস্থার কর্মকর্তারা স্টেডিয়ামে টহল দিতে পারেন বলে আশঙ্কা রয়েছে। ফলে খেলার মাঠে কঠোর পুলিশি আচরণে দর্শকেরা তিক্ত অভিজ্ঞতার স্বাদ পেতে পারেন।
এসব বিষয়ে নীরব থেকে ফিফা কার্যত ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থানকেই সহায়তা করছে। তাই ট্রাম্পের ‘স্পোর্টসম্যাক্সিং’, অর্থাৎ জনপ্রিয় ক্রীড়া আসরকে কাজে লাগিয়ে আধিপত্য প্রদর্শন এবং রাজনৈতিক এজেন্ডা এগিয়ে নেওয়ার কাজ সহজ করে দিচ্ছে স্বয়ং ফিফা।
আগামী সপ্তাহগুলোতে বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীরা এমন এক বিশ্বকাপের নাটকীয়তা দেখবেন, যার পেছনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক ছাপ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠবে।
তবে ইতিহাস বলে, ফুটবলকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা বহুবার হয়েছে। কখনও দমনমূলক রাষ্ট্র, কখনও দুর্নীতিগ্রস্ত ক্রীড়া প্রশাসন, আবার কখনও করপোরেট স্বার্থ ফুটবলকে ব্যবহার করতে চেয়েছে। কিন্তু সব বাধা পেরিয়েই ফুটবল টিকে থেকেছে। আর সেখানেই ফুটবলের প্রকৃত শক্তি নিহিত।
তাই মার্কিন নীতির অশুভ ছায়া পেরিয়ে এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখা। আর সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ফুটবলের চিরন্তন ভিত্তি সমতা, ন্যায়বোধ ও সত্য দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
এই লেখাটি ‘মিডল ইস্ট আই’ থেকে ঈষৎ সংক্ষেপে অনূদিত; এর লেখক আব্দুল্লাহ আল-আরিয়ান কাতারের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। তিনি ইতিহাস, সমাজ ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি নিয়ে গবেষণা করেন। ‘Football in the Middle East: State, Society, and the Beautiful Game’ গ্রন্থের সম্পাদক তিনি।