Published : 15 Jun 2026, 03:21 PM
ঘুম থেকে ওঠা আবার রাতে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত, মোবাইল ফোনের ব্যবহার স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। যোগাযোগ, তথ্য সংগ্রহ, কাজ, বিনোদন সবকিছুই ফোনের এই প্রযুক্তিতে মিলছে।
তবে প্রযুক্তি যত সুবিধা এনে দিয়েছে, ততই বেড়েছে নির্ভরশীলতা।
ফলে অনেকেই এখন দিনের বড় একটি সময় কাটিয়ে দেন পর্দার দিকে তাকিয়ে। পরিবার, বন্ধু, নিজের চিন্তা কিংবা বাস্তব জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যায় হয়ত এই কারণে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্মার্টফোনকে জীবন থেকে পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং কীভাবে এটি ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রযুক্তি যেন সহায়ক হয়, বিকল্প নয়
যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড কেনেডি স্কুল এবং হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল–এর আচরণ বিজ্ঞানী ও অধ্যাপক আর্থার ব্রুকস, তার নতুন বই ‘দি মিনিং অফ ইয়োর লাইফ: ফাইন্ডিং পারপাস ইন অ্যান এজ অফ এমটিনেস’-এর প্রকাশ উপলক্ষ্যে সিএনএন’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “প্রযুক্তি তখনই উপকারী, যখন এটি জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর সহায়ক হিসেবে কাজ করে। তবে সম্পর্ক, ভালোবাসা, সৃজনশীলতা কিংবা অনুভূতির বিকল্প হয়ে ওঠে প্রযুক্তি, তখন সেটা প্রকৃত অর্থপূর্ণ জীবন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।”
তার মতে, “স্মার্টফোন একটি যন্ত্রমাত্র। এটি মানুষের জীবনকে সহজ করতে পারে। তবে সম্পর্ক, অনুভূতি কিংবা জীবনের উদ্দেশ্যের জায়গা পূরণ করতে পারে না।”
সব সমস্যার সমাধান প্রযুক্তি দিতে পারে না
আর্থার ব্রুকস সমস্যাকে দুই ভাগে ব্যাখ্যা করেন। এক ধরনের সমস্যা রয়েছে, যার নির্দিষ্ট সমাধান আছে। যেমন- একটি ভবন নির্মাণ, কোনো হিসাব করা কিংবা জটিল প্রযুক্তিগত কাজ সম্পন্ন করা। এসব ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের কাজকে সহজ করে।
অন্যদিকে কিছু বিষয় রয়েছে, যেগুলোর কোনো চূড়ান্ত সমাধান নেই। যেমন- ভালো বন্ধু হওয়া, সুখী দাম্পত্য গড়ে তোলা, সন্তানের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা কিংবা জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে পাওয়া।
এসব বিষয় বারবার ভাবতে হয়, বুঝতে হয় এবং অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শেখা যায়। প্রযুক্তি এসব প্রশ্নের সহজ উত্তর দিতে পারে না।
একাকিত্ব কমানোর বদলে বাড়তেও পারে
একসময় ধারণা করা হয়েছিল, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মানুষের একাকিত্ব কমাবে। কারণ, এতে দূরে থাকা মানুষের সঙ্গেও সহজে যোগাযোগ করা সম্ভব।
তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, দীর্ঘ সময় ভার্চুয়াল মাধ্যমে কাটানো একাকিত্ব আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
আর্থার ব্রুকস বলেন, “বাস্তব মানুষের সঙ্গে সামনাসামনি কথা বলা, একসঙ্গে সময় কাটানো কিংবা অনুভূতি ভাগ করে নেওয়ার বিকল্প, কোনো ডিজিটাল মাধ্যম হতে পারে না। তাই বাস্তব সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়াই মানসিক সুস্থতার জন্য কার্যকর।”
বিরক্তিকর সময়ও দরকার
অবসর পেলেই মোবাইল হাতে তুলে নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেন বেশিরভাগ মানুষ। কোথাও কয়েক মিনিট অপেক্ষা করতে হলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চোখ চলে যায়।
তবে এই বিশেষজ্ঞে মতে, “এই অভ্যাস চিন্তাশক্তিকে সীমিত করে দিতে পারে।”
আর্থার ব্রুকস বলেন, “মস্তিষ্কের এমন একটি স্বাভাবিক অবস্থা রয়েছে, যখন এটি কোনো নির্দিষ্ট কাজে ব্যস্ত থাকে না। এই সময়েই নতুন চিন্তা আসে, সৃজনশীলতা বাড়ে এবং নিজের জীবন নিয়ে ভাবার সুযোগ পায়।”
গোসলের সময়, হাঁটার সময় কিংবা দীর্ঘ ভ্রমণে মাথায় নতুন ধারণা আসতে পারে। কারণ তখন মস্তিষ্ক কিছুটা স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পায়। তবে প্রতিটি অবসর মুহূর্ত যদি মোবাইল দেখেই কাটানো হয়, তাহলে সেই সুযোগ আর তৈরি হয় না।
দিনের প্রথম এক ঘণ্টা হোক নিজের জন্য
ব্রুকস বলেন, “ঘুম থেকে ওঠার পর প্রথম এক ঘণ্টা মোবাইল ব্যবহার ঠিক না।”
এই সময়ে হাঁটা, বই পড়া, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলা, ব্যায়াম করা অথবা নিজের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো নিয়ে ভাবা উপকারী।
তার মতে, “দিনের শুরু যদি মোবাইলের বদলে নিজের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে করা যায়, তাহলে পুরো দিনের মানসিক অবস্থা ইতিবাচক থাকে।”
খাওয়ার সময় মোবাইল দূরে
একসঙ্গে বসে খাওয়া শুধু খাবার গ্রহণের বিষয় নয়, এটি পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ সময়। তবে খাওয়ার টেবিলে বসেও, সবাই নিজের মোবাইলে ব্যস্ত থাকাটাও এখন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে যাচ্ছে।
আর্থার ব্রুকসের মতে, “মোবাইল টেবিলের ওপর উল্টো করে রাখলেও মনোযোগ পুরোপুরি কথোপকথনে থাকে না। কারণ মস্তিষ্ক জানে, যে কোনো সময় নতুন বার্তা বা বিজ্ঞপ্তি আসতে পারে। ফলে পরিবারের সঙ্গে কাটানো সময়ও বাধাগ্রস্ত হয়।”
ঘুমানোর আগে যান্ত্রিক পর্দা থেকে দূরে থাকা
দিনের শেষ এক ঘণ্টাও মোবাইলমুক্ত রাখার পরামর্শ দেন, আর্থার ব্রুকস। কারণ, রাতে ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহার করলে মস্তিষ্ক সহজে বিশ্রামের জন্য প্রস্তুত হতে পারে না।
এতে ঘুমের মান খারাপ হতে পারে এবং পরদিন ক্লান্তি অনুভূত হওয়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়।
বরং এই সময়টুকু বই পড়া, পরিবারের সঙ্গে কথা বলা কিংবা নিজের দিনের অভিজ্ঞতা নিয়ে ভাবার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে।
প্রযুক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কই সমাধান
আর্থার ব্রুকসের মতে, “প্রযুক্তিকে পুরোপুরি ত্যাগ করার প্রয়োজন নেই। বরং এটি যেন জীবনকে সহজ করার একটি উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।”
কাজের প্রয়োজনে মোবাইল ব্যবহার করা স্বাভাবিক। তবে প্রতিটি অবসর মুহূর্ত যদি পর্দার সামনে কাটে, তাহলে ধীরে ধীরে বাস্তব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতাগুলো হারিয়ে যেতে পারে।
প্রতিদিন কিছু সময় প্রযুক্তি থেকে দূরে থেকে নিজের মানুষদের সঙ্গে কথা বলা, প্রকৃতির কাছে যাওয়া, বই পড়া কিংবা নিজের চিন্তার সঙ্গে সময় কাটানো মানসিক প্রশান্তি বাড়াতে সাহায্য করে।
আরও পড়ুন
দৈনিক পাঁচ ঘণ্টা ফোন ব্যবহারে স্থূলতার ঝুঁকি