Published : 16 Jun 2026, 10:41 AM
উনিশ শতকের শেষভাগে ইউরোপজুড়ে ইহুদি-বিদ্বেষের (পশ্চিমা পরিভাষায় অ্যান্টিসেমিটিজম) ঢেউ যখন তীব্র হচ্ছিল, তখন একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন ইহুদি বুদ্ধিজীবী মহলে জরুরি হয়ে উঠল: ইউরোপের ইহুদিরা কি কোনো দিন নিরাপদ এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপন করতে পারবে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে যে রাজনৈতিক মতবাদের জন্ম হয়, তার নাম জায়নবাদ। শব্দটি এসেছে জেরুজালেমের একটি পাহাড়ের নাম 'জায়ন' থেকে, যা ইহুদি ধর্মীয় কল্পনায় প্রতিশ্রুত ভূমির প্রতীক। জায়নবাদ মূলত এই ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত যে বিশ্বের ইহুদিরা একটি জাতি এবং এই জাতির জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রয়োজন।
জায়নবাদের উৎস ও মূল তাত্ত্বিকরা

জায়নবাদের সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠাতা হলেন অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাংবাদিক থিওডোর হার্টজল (১৮৬০-১৯০৪)। ১৮৯৪ সালে ফ্রান্সে আলফ্রেড ড্রেফাস মামলা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করার পর তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে ইউরোপীয় সমাজে ইহুদি-বিদ্বেষ একটি কাঠামোগত সমস্যা, যা সংস্কারের মাধ্যমে দূর করা সম্ভব নয়। ১৮৯৬ সালে তিনি তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘Der Judenstaat’ (ইহুদি রাষ্ট্র) প্রকাশ করেন, যেখানে যুক্তি দেন যে ইহুদিরা ধর্মীয় গোষ্ঠী নয়, একটি জাতি এবং এই জাতির জন্য নিজস্ব সার্বভৌম রাষ্ট্র অপরিহার্য। ১৮৯৭ সালে সুইজারল্যান্ডের বাসেলে তিনি প্রথম জায়নিস্ট কংগ্রেস আহ্বান করেন, যেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনে একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ঘোষিত হয়।
হার্টজলের আগেই অবশ্য লেও পিনস্কার (১৮২১-১৮৯১) তার ‘Auto-Emancipation’ (১৮৮২) গ্রন্থে যুক্তি দেন যে ইহুদিরা ইউরোপে সবসময়ই 'অন্য' বা অপর (the other) হিসেবে বিবেচিত হবে, তাই তাদের নিজস্ব মাটিতে নিজেদের মুক্তি অর্জন করতে হবে। অপরদিকে আশের গিনজবার্গ, যিনি 'আহাদ হা-আম' নামে পরিচিত (১৮৫৬-১৯২৭), হার্টজলের রাজনৈতিক জায়নবাদের বিপরীতে 'সাংস্কৃতিক জায়নবাদ'-এর ধারণা তুলে ধরেন। তার মতে, একটি ভৌগোলিক রাষ্ট্রের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো ইহুদি সংস্কৃতি, ভাষা ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণ। ফিলিস্তিন হবে ইহুদি সভ্যতার আধ্যাত্মিক কেন্দ্র, সব ইহুদির বাসস্থান নয়।
সমাজতান্ত্রিক জায়নবাদের প্রতিনিধি নাহমান সিরকিন (১৮৬৭-১৯২৪) এবং বের কাটজনেলসন (১৮৮৭-১৯৪৪) জায়নবাদকে শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে সংযুক্ত করতে চেয়েছিলেন। তাদের কাছে ইহুদি রাষ্ট্র হবে একটি সমাজতান্ত্রিক সমাজের পরীক্ষাক্ষেত্র। অন্যদিকে ভ্লাদিমির জাবোটিনস্কি (১৮৮০-১৯৪০) 'রিভিশনিস্ট জায়নবাদ' প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে তিনি শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং প্রয়োজনে সামরিক শক্তির প্রয়োগকে ন্যায়সংগত বলে যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। আধুনিক ইসরায়েলের ডানপন্থী রাজনীতিতে জাবোটিনস্কির প্রভাব এখনও সুস্পষ্ট।
জায়নবাদের মূল তাত্ত্বিক ভিত্তি হলো 'ইহুদি জাতিসত্তার' ধারণা, অর্থাৎ বিশ্বের যেখানেই ইহুদিরা বসবাস করুক না কেন, তারা একটি একক জাতি। এ ধারণা ঐতিহ্যগত ধর্মীয় পরিচয়কে একটি আধুনিক জাতীয়তাবাদী কাঠামোতে রূপান্তরিত করে। উনিশ শতকের ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদের ঢেউয়ে যখন বিভিন্ন জাতি নিজস্ব রাষ্ট্র দাবি করছিল, ইহুদি চিন্তাবিদরাও সেই একই যুক্তিকাঠামো ব্যবহার করে ‘ইহুদি জাতির’ জন্য রাষ্ট্র দাবি করতে শুরু করেন।
জায়নবাদের সমালোচনা: বিভিন্ন ধারা
জায়নবাদের সমালোচনা বহু দিক থেকে এসেছে এবং এই সমালোচনাগুলো পরস্পর থেকে স্বতন্ত্র ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
ফিলিস্তিনি ও আরব সমালোচনা সবচেয়ে প্রত্যক্ষ এবং ভৌগোলিকভাবে সংশ্লিষ্ট। ফিলিস্তিনি-আমেরিকান চিন্তাবিদ এডওয়ার্ড সাইদ (১৯৩৫–২০০৩) তার ‘The Question of Palestine’ গ্রন্থে যুক্তি দেন যে জায়নবাদ মূলত একটি ইউরোপীয় উপনিবেশবাদী প্রকল্প, যা আরেকটি জাতির ঐতিহাসিক ভূমিতে একটি নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে। তার বিখ্যাত 'Orientalism' তত্ত্বের আলোকে তিনি দেখান কীভাবে পশ্চিমা ডিসকোর্সে ফিলিস্তিনিদের অনুপস্থিত, অপ্রাসঙ্গিক বা প্রান্তিক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্যান-আরব জাতীয়তাবাদীরা ঐতিহাসিকভাবে যুক্তি দিয়েছেন যে ১৯৪৮ সালের 'নাকবা' (মহাবিপর্যয়)—যেখানে সাত লক্ষেরও বেশি ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন—জায়নবাদের অনিবার্য পরিণতি।

ইহুদি জায়নবাদ-বিরোধী ধারা দুটি প্রধান শাখায় বিভক্ত। প্রথমত, ধর্মীয় জায়গা থেকে জায়নবাদ-বিরোধিতা: নেচুরেই কার্তা (Neturei Karta)-সহ বিভিন্ন অতি-অর্থোডক্স ইহুদি গোষ্ঠী মনে করে যে মানবিক রাজনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা ধর্মীয়ভাবে অবৈধ। তাদের বিশ্বাস, ইহুদিদের 'গালুত' বা নির্বাসন ঈশ্বরের ইচ্ছার অংশ এবং কেবল মশিহের আগমনের মাধ্যমেই সেই নির্বাসনের অবসান ঘটবে। জায়নবাদকে তারা ঐশ্বরিক পরিকল্পনার বিরুদ্ধে মানবিক বিদ্রোহ হিসেবে দেখেন। দ্বিতীয়ত, সেক্যুলার ইহুদিদের সমালোচনা: ভাষাবিদ ও রাজনৈতিক দার্শনিক নোম চমস্কি দশকের পর দশক ধরে ইসরায়েলের সম্প্রসারণ নীতির সমালোচনা করেছেন, যদিও তিনি ইসরায়েল রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে অস্বীকার করেন না। ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ ইলান পাপে তার ‘The Ethnic Cleansing of Palestine’ গ্রন্থে নথিভিত্তিক যুক্তি দিয়েছেন যে ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনি জনগণের বাস্তুচ্যুতি দুর্ঘটনা ছিল না, এটি ছিল পরিকল্পিত। এই 'নিউ হিস্টোরিয়ান' ধারার ইতিহাসবিদরা ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার জায়নবাদী আখ্যানের বাইরে গিয়ে ঘটনাপ্রবাহকে নতুনভাবে পাঠ করেছেন।
বামপন্থী ও মানবাধিকারভিত্তিক সমালোচনা মূলত তিনটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে–প্রথমত, জায়নবাদকে একটি ঔপনিবেশিক প্রকল্প হিসেবে দেখা হয়, যেখানে ইউরোপীয় ইহুদিরা ফিলিস্তিনের একটি জনবসতিপূর্ণ ভূখণ্ডে নিজেদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে। দ্বিতীয়ত, অধিকৃত ভূখণ্ডে ইসরায়েলি নীতিমালাকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তৃতীয়ত, জায়নবাদের ধর্মভিত্তিক জাতি-কল্পনাকে একটি exclusive বা অন্তর্ভুক্তি-বিরোধী মতবাদ হিসেবে দেখা হয়, যা জাতিসংঘের সার্বজনীন মানবাধিকার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ এক প্রস্তাবে জায়নবাদকে 'বর্ণবাদের একটি রূপ' হিসেবে চিহ্নিত করেছিল, যদিও ১৯৯১ সালে এই প্রস্তাব প্রত্যাহার করা হয়।
জায়নবাদ, হিন্দুত্ববাদ ও মুসলিম জাতীয়তাবাদ: তুলনামূলক বিশ্লেষণ
জায়নবাদকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে উনিশ ও বিশ শতকে উদ্ভূত ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে এর তাত্ত্বিক কাঠামো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। হিন্দুত্ববাদ এবং ব্রিটিশ ভারতে জন্ম নেওয়া মুসলিম জাতীয়তাবাদের সঙ্গে জায়নবাদের কিছু গভীর কাঠামোগত মিল এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।

কাঠামোগত মিল: তিনটি মতবাদেই ধর্মীয় পরিচয়কে জাতি গঠনের মূল উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ভিনায়ক দামোদর সাভারকার (১৮৮৩–১৯৬৬), যিনি 'হিন্দুত্ব' ধারণার প্রবক্তা, তিনি হিন্দুদের একটি জাতি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন যাদের পিতৃভূমি ও পুণ্যভূমি উভয়ই ভারতবর্ষ। মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ এবং মুসলিম লিগের দ্বি-জাতি তত্ত্ব (Two-Nation Theory) অনুযায়ী, ব্রিটিশ ভারতের মুসলিমরা হিন্দুদের থেকে আলাদা একটি জাতি, কারণ তাদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও জীবনদর্শন ভিন্ন। জায়নবাদীরাও ঠিক এভাবে দেখেন যে বিশ্বের ইহুদিরা, তারা যে দেশেই বসবাস করুক, একটি পৃথক জাতি। তিনটি ক্ষেত্রেই ধর্মকে জাতীয়তার সংজ্ঞা নির্ধারণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, যা ঐতিহ্যগত উদারনৈতিক জাতীয়তাবাদের ধারণা থেকে মৌলিকভাবে আলাদা।
ঐতিহাসিক সাদৃশ্য: জায়নবাদ এবং মুসলিম জাতীয়তাবাদ উভয়ই বিশ শতকের প্রথমার্ধে পরিপক্ব হয়েছে এবং উভয়ই প্রায় একই সময়ে—১৯৪৭-৪৮ সালে—রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সফল হয়েছে। পাকিস্তান ও ইসরায়েল উভয়ই এমন রাষ্ট্র যার জন্ম হয়েছে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে। উভয় রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠাকালীন নেতৃত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিয়েছিল: ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠিত হলেও, রাষ্ট্রটি পরিচালিত হবে সেক্যুলার, অর্থাৎ ধর্মনিরপেক্ষ নীতিতে।

জিন্নাহ তার বিখ্যাত ১১ অগাস্ট ১৯৪৭ ভাষণে বলেছিলেন পাকিস্তানে সকল নাগরিক ধর্ম নির্বিশেষে সম মর্যাদার অধিকারী হবে। ইসরায়েলের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রেও সব নাগরিকের সমতার প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই বাস্তবতা এই প্রতিশ্রুতি থেকে বিচ্যুত হয়েছে—পাকিস্তানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অবস্থান ক্রমশ প্রান্তিক হয়েছে, এবং ইসরায়েলে আরব নাগরিকরা বিভিন্ন আইনি বৈষম্যের মুখোমুখি।
মৌলিক পার্থক্য: তবে এই তিনটি মতবাদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও রয়েছে, যা অনুধাবন না করলে বিশ্লেষণ অসম্পূর্ণ থাকবে। সবচেয়ে মৌলিক পার্থক্য হলো ভৌগোলিক দাবির প্রকৃতিতে। হিন্দুত্ববাদ এবং মুসলিম জাতীয়তাবাদ উভয়ই এমন একটি ভূখণ্ডে জন্ম নিয়েছে যেখানে সংশ্লিষ্ট ধর্মাবলম্বীরা শতাব্দী ধরে বসবাস করছেন। অর্থাৎ তারা বিদ্যমান একটি ভূখণ্ডের সংজ্ঞা ও মালিকানা পুনর্নির্ধারণ করতে চেয়েছেন। কিন্তু জায়নবাদ মূলত একটি diaspora আন্দোলন—ইউরোপ থেকে বিচ্ছিন্ন একটি জনগোষ্ঠী এমন একটি ভূখণ্ডে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে যেখানে তখন অন্য একটি জনগোষ্ঠী—ফিলিস্তিনি আরবরা—বসবাস করছিল। এই ভৌগোলিক মাত্রার পার্থক্য জায়নবাদকে অনেক বেশি জটিল এবং আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কিত করে তুলেছে।
দ্বিতীয় পার্থক্য হলো জাতির ভৌগোলিক বিস্তারে। হিন্দুত্ববাদ ভারতের মাটিতে বসবাসকারীদের নিয়ে জাতি গঠনের কথা বলে। মুসলিম জাতীয়তাবাদ ব্রিটিশ ভারতের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোকে ঘিরে রাষ্ট্র দাবি করেছে। কিন্তু জায়নবাদ দাবি করে যে পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা ইহুদিরা একটি জাতি এবং তাদের সকলের জন্য একটি 'স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের অধিকার' (Law of Return) রয়েছে। এই দাবি রাষ্ট্র ও জনগণের সম্পর্ক বিষয়ক একটি ভিন্ন ধারণা তৈরি করে, যা অন্য দুটি জাতীয়তাবাদে এভাবে নেই।
বর্তমানে রাজনৈতিক মতবাদ হিসেবে জায়নবাদ একটি সন্ধিক্ষণে রয়েছে। ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে জায়নবাদ আর কেবল একটি আন্দোলন নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের আধিকারিক আদর্শ। ২০১৮ সালে ইসরায়েলের পার্লামেন্ট 'Nation-State Law' পাস করে, যেখানে ইসরায়েলকে 'ইহুদি জনগণের ঐতিহাসিক মাতৃভূমি' হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার কেবল ইহুদি জনগণের জন্য সংরক্ষিত বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এই আইনটি আন্তর্জাতিকভাবে এবং ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বৈশ্বিক পর্যায়ে, পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এবং আন্তর্জাতিক বামপন্থী রাজনীতিতে জায়নবাদ ক্রমশ একটি বিতর্কিত শব্দে পরিণত হয়েছে। ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি সংঘাতের দীর্ঘায়িত রূপ এবং ফিলিস্তিনি স্বাধীনতার প্রশ্ন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এখনও অমীমাংসিত। একই সঙ্গে, ইহুদি বিশ্বে জায়নবাদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি একমাত্রিক নয়—সেখানেও উদারনৈতিক জায়নিজম, ধর্মীয় জায়নিজম এবং পোস্ট-জায়নিজমের মতো বিভিন্ন ধারা সক্রিয়।
পরিশেষে বলা যায়, জায়নবাদ একটি জটিল এবং বহুমাত্রিক রাজনৈতিক মতবাদ। এটি একদিকে ইউরোপীয় ইহুদি-বিদ্বেষের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার প্রতিক্রিয়া হিসেবে জন্ম নিয়েছিল, অন্যদিকে এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে। হিন্দুত্ববাদ ও মুসলিম জাতীয়তাবাদের সঙ্গে তুলনায় দেখা যায় যে ধর্মভিত্তিক জাতি-কল্পনা উনিশ ও বিশ শতকের বৈশ্বিক রাজনীতিতে একটি পুনরাবৃত্তিমূলক প্রবণতা। এই তিনটি মতবাদই exclusive—অর্থাৎ এরা জাতীয় পরিচয়ের একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সংজ্ঞা নির্ধারণের মাধ্যমে সেই সংজ্ঞার বাইরে থাকা মানুষদের সম্পর্কে একটি অস্বস্তিকর নীরবতা বা প্রান্তিকীকরণের প্রবণতা তৈরি করে। ফলে আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রতত্ত্বের সঙ্গে এই মতবাদগুলোর টানাপোড়েন আজও অব্যাহত।
সাঈদ ইফতেখার আহমেদ শিক্ষক, স্কুল অব সিকিউরিটি অ্যান্ড গ্লোবাল স্টাডিজ, আমেরিকান পাবলিক ইউনিভার্সিটি সিস্টেম। ই-মেইল: [email protected]