Published : 08 Jul 2025, 02:52 PM
প্রেম ভালোবাসার সম্পর্কে থাকা মানুষদের মাঝে কখনও কখনও একটা অজানা অস্বস্তি কাজ করে। মনে হয় কিছু একটা ঠিকঠাক চলছে না। এই অনুভূতিটা খুব স্বাভাবিক।
অনেক সময় এর পেছনে সঙ্গীর কোনো দোষ না থেকে নিজেদের ভেতরের অনিরাপত্তা কাজ করে।
মনোবিজ্ঞান বলছে, অনিরাপত্তা তখনই জন্ম নেয়, যখন নিজেকে অপ্রতুল বা অযোগ্য মনে করে। সম্পর্কে এই অনুভূতির শুরু হতে পারে একটি উত্তর না দেওয়া বার্তা কিংবা হঠাৎ বাতিল হওয়া পরিকল্পনা থেকে।
তবে সময়মতো মনোযোগ না দিলে এই অনিরাপত্তা ধীরে ধীরে আচরণে ছাপ ফেলে এবং ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে সম্পর্কটা জটিল করে তোলে।
সম্পর্কের অনিরাপত্তার মূল কারণ
নিজে কীভাবে একটি সম্পর্ক গড়ে তুলি, তার শেকড় কিন্তু শৈশবের অভিজ্ঞতায় নিহিত।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থেরাপি প্রতিষ্ঠানের বৈবাহিক ও পারিবারিক পরামর্শক ক্রিশ্চিয়ান বাম্পস ওয়েলঅ্যান্ডগুড ডটকম-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেন, “আজকের অনিরাপত্তার শেকড় অনেক সময়ই আমাদের প্রাথমিক সম্পর্কের অভিজ্ঞতায়। এটি অবশ্যই বড় ধরনের ট্রমা নাও হতে পারে। হতে পারে ছোট ছোট ঘাটতির অভিজ্ঞতা, যা নিজের আত্মমর্যাদায় প্রভাব ফেলেছে।”
যদি সেই সময়কার অস্পষ্টতা ও নিরাপত্তাহীনতা সমাধান না হয়, তবে তা ভবিষ্যতের সম্পর্কেও ছাপ ফেলতে পারে।
যেমন- কেউ যদি আগে বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়ে থাকেন, তবে তার মনে ‘আমি যথেষ্ট ভালো না’ এই বিশ্বাস গেঁথে যেতে পারে।
এ রকম বিশ্বাস যদি মনের গভীরে রয়ে যায়, তাহলে বর্তমানের সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব।
ক্রিশ্চিয়ান বাম্পস আরও বলেন, “মানুষ স্বাভাবিকভাবেই নিজেকে অন্যদের সঙ্গে তুলনা করে, যাতে বুঝতে পারে সে সমাজের মানদণ্ডে ঠিক আছে কি-না। তবে সমস্যা হল, এখন যা দেখছি তা অনেকটাই সাজানো ও বিকৃত বাস্তবতা। যেখানে সম্পর্কগুলোর একটি রূপকথার চেহারা দেখানো হয়।”
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের মন-চিকিৎসক দানি সালিয়ানি মনে করেন, “ইন্টারনেট-ভিত্তিক অপরিপক্ব পরামর্শও অনেক সময় অনিরাপত্তা বাড়িয়ে দেয়।”
তিনি বলেন, “আজকাল ‘যদি সে চাইত, সে করত’ এমন অতিসরলীকৃত ধারণা বা ‘মাইক্রো প্রতারণা’, ‘লাভ বম্ব’ বা ‘ভালোবাসার বিস্ফোরণ’ ইত্যাদি বিষয়গুলো সম্পর্কের স্বাভাবিক ওঠানামাকে অতিমাত্রায় বিশ্লেষণ করতে মানুষকে প্ররোচিত করে। ফলে তারা নিজেদের সম্পর্কেও অতিরিক্ত সতর্ক হয়ে পড়ে।”
আবেগগত বিচ্ছিন্নতা বা দূরে সরে যাওয়া
দানি সালিয়ানি বলেন, “অনেক সময় কোনো ঝামেলা বা দ্বন্দ্ব দেখা দিলে নিজেদের গুটিয়ে নিই। এটি তখন হয় সহজ পথ, কারণ আমরা ভাবি ‘আবার কষ্ট কেন নেব?’ কিন্তু এই দূরত্ব যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে সেটা সঙ্গীর মনে উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে। আর সম্পর্কটা হয়ে পড়ে এক ধরনের টানাপড়েনের খেলা।
অতিরিক্ত বিশ্লেষণ বা মানসিক গোলকধাঁধা
ক্রিশ্চিয়ান বাম্পস বলেন, “কারও বার্তার অর্থাৎ ‘টেক্সক্ট মেসেজে’র শব্দের ভঙ্গি, সময়মতো উত্তর না দেওয়া ইত্যাদি নিয়ে বারবার চিন্তা করাও অনিরাপত্তার একটি বড় লক্ষণ।”
যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিনিক্যাল থেরাপিস্ট শেরিল গ্রস্কফ বলেন, “যখন ভেতরে স্থিরতা থাকে না তখন মস্তিষ্ক নিজে থেকেই সমস্যা খুঁজে ফেরে মূলত যখন প্রকৃত অর্থে কোনো সমস্যা থাকে না।”
সঙ্গীর অন্য সম্পর্ক নিয়ে হুমকির অনুভব
‘জেলাসি’ বা ঈর্ষা কেবল প্রতিদ্বন্দ্বী প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
‘সোশ্যাল সাইকোলজিক্যাল অ্যান্ড পারসোনালিটি সায়েন্স’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণা বলছে- সঙ্গীর বন্ধুবান্ধবদের নিয়েও হুমকির অনুভূতি কাজ করতে পারে; যদি মনে হয় তারা সময় বা ঘনিষ্ঠতা কেড়ে নিচ্ছে।
বারবার নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা
বিশ্বাস চাওয়াটা স্বাভাবিক। তবে যদি কেউ বারবার জানতে চায় ‘তুমি কি আমাকে ভালোবাসো?’ কিংবা ‘আমি কি কিছু ভুল করেছি?’ তাহলে সেটা দুশ্চিন্তা, অস্থিরতা, রাগ আর ক্লান্তির জন্ম দেয়।
শেরিল গ্রস্কফ বলেন, “এভাবে সব সময় ভয় আর সন্দেহে থাকা মানেই হচ্ছে আপনি নিরাপদ বোধ করছেন না।”
কীভাবে আত্মবিশ্বাসী সঙ্গী হবেন?
অনিরাপত্তা আসলে স্বাভাবিক। প্রত্যেকের মধ্যেই কোনো না কোনো সময়ে এমন অনুভূত হয়। তবে সমস্যাটা হয়, যখন এই অনুভব গোপনে পুষে রাখা হয় বা অন্ধভাবে এর প্রতিক্রিয়াতে কাজ করা হয়।
শেরিল গ্রস্কফ বলেন, “সম্পর্কে নিরাপত্তা তৈরি মানে এই নয় যে ‘কুলভাব’ বা নির্বিকার হয়ে থাকবেন। বরং নিজেকে বোঝা, নিজের অনুভবকে স্বীকার করা এবং ধীরে ধীরে সেটা সঙ্গীর সঙ্গে ভাগ করে নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।”
প্রয়োজনে নিজের ভেতরের পুরানো অভিজ্ঞতা ও ট্রমার উৎস খুঁজে দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে যদি বারবার সঙ্গীর আচরণ ভুল বুঝে ফেলেন বা অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখান।
দানি সালিয়ানি বলেন, “যখন অতিরিক্ত অনিরাপদ বোধ হয় তখন যেন ভুলে যাই আমি কে, আমার সঙ্গী কে এবং আমরা এখন কোন সময়ের মধ্যে আছি। তাই প্রথমে নিজেকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনা দরকার।”
আর কথা বলার সময় সতর্ক থাকা প্রয়োজন। ‘তুমি কখনও ভালোবাসো না’ ধরনের অভিযোগের বদলে ‘আমি কষ্ট পেয়েছি যখন তুমি এটা বললে’—এভাবে নিজের অনুভব প্রকাশ করলে সঙ্গী আত্মপক্ষ সমর্থনের চেয়ে বোঝার মনোভাবে থাকবে।
ক্রিশ্চিয়ান বাম্পস বলেন, “যদি আপনার সঙ্গী আন্তরিক ও সহানুভূতিশীল হন, তবে একসঙ্গে একটা ‘নিশ্চয়তার ভাষা’ তৈরি করুন। যেমন- ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি, আমি এখানে আছি, আমরা ঠিক আছি’। এতে দুজনই নিরাপত্তা পাবেন।”
তবে অনেক সময় নিজের চেষ্টাতেও কোনো সমাধান নাও আসতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘গটম্যান ইন্সটিটিউট’ যেটাকে বলে ‘গ্রিডলক’ অর্থাৎ বারবার এক বিষয় নিয়ে ঝগড়া হওয়া এবং সমাধানহীন অবস্থায় পড়ে যাওয়া।
এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই একক বা যুগল থেরাপি গ্রহণ করেন, যা বেশ কার্যকর হতে পারে।
আরও পড়ুন
মনে কি হচ্ছে সম্পর্ক পুড়ে ছাই? তাহলে যা করতে পারেন