চীন-মার্কিন প্রতিযোগিতা প্রবল, কিন্তু কৌশল ও পদ্ধতি বিপরীত
যুক্তরাষ্ট্র যখন নিষেধাজ্ঞা, সামরিক শক্তি আর প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার কৌশলে মত্ত, চীন তখন নীরবে বিশ্ব অর্থনীতির নতুন নিয়মকানুন বিনির্মাণ করে চলেছে। উৎপাদন, জ্বালানি ও অবকাঠামো নির্মাণে চীনের এই নীরব বিপ্লব কি ২০৩০-এর দশকে বদলে দেবে বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তির নাম?
সবাই ইরানে মার্কিন বোমা, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও হরমুজ প্রণালিতে নিষেধাজ্ঞার কথা বলছে। আর অন্যদিকে চীন নীরবে, সতর্কতার সঙ্গে এই শতাব্দীর নতুন নিয়মকানুন লিখে যাচ্ছে। বিগত কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্র যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, তা এই বাস্তবতাকে আরও প্রকট করেছে। তারা জাতিসংঘ ও বিশ্বের নিয়মকানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাই মাদুরোকে নজিরবিহীনভাবে অপহরণ করে নিজ দেশে নিয়ে গেছে এবং দাবি করছে যে, তারা সরকারকে উৎখাত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালিয়েছে এবং চীনের তেল সরবরাহের পথ বন্ধ করার চেষ্টা করেছে। শুধু তাই নয়, চীনের কোম্পানিগুলোকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে এবং তাদের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞাও দিয়েছে।
চারদিক থেকে এমন অবরোধের মুখে পড়লে একটি দেশ কি স্বাভাবিক থাকে? নাকি হুমকি দেয়, হম্বিতম্বি করে এবং পাল্টা আঘাত হানে? কিন্তু চীন এর কোনোটিই করেনি। দেশটি নীরব আছে, শান্ত থাকছে; কারণ তাদের কৌশল এতটাই সহজ যে, অনেক দেশ ও অধিকাংশ মানুষ সেটি খেয়ালই করছে না।
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকে ধ্বংস করার চেষ্টা করছে, আর চীন তাকে ভিন্নভাবে গড়ে তুলতে চাইছে। এই দুই কৌশলই নির্ধারণ করবে এই শতাব্দীর প্রকৃত নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে এবং সেই প্রতিযোগিতার ফসল ও পুরস্কার কার ঘরে যাবে।
একশ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের এক নম্বর শক্তি। কিন্তু চীন এত দ্রুত সেই ব্যবধান কমিয়ে এনেছে যে, উৎপাদন, জ্বালানি ও রপ্তানির ক্ষেত্রে অনেক দিক থেকেই তারা এগিয়ে গিয়েছে। বিশ্বের অনেক খ্যাতিমান বিশ্লেষকের মতে, এই গতিতে চলতে থাকলে ২০৩০-এর দশকে হয়তো চীন বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হবে।
আর সেটা হলে চীন শুধু ধনবান ও বিজয়ীই হবে না, তারা অনেক কিছুর নীতি নির্ধারণও করবে। বিশ্ব কোন মুদ্রা ব্যবহার করবে? কোন প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করবে? কোন নিয়ম মেনে চলবে? চীনের ইচ্ছেতে সেই সব পরিচালিত হবে।
এই সব কিছু ভবিষ্যৎ বিশ্বশক্তির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন–এই দুই শক্তিই তা চায়; কিন্তু অর্জনের আকাঙ্ক্ষা ও পদ্ধতিতে উভয়ের অবস্থান একেবারে বিপরীত।
প্রথমে দেখা যাক মার্কিন পদ্ধতি কী? তাদের নীতি এককথায় বলা যায়—যারা এগিয়ে যেতে চায়, তাদের গতি কমিয়ে দাও। কারণ যুক্তরাষ্ট্র জানে, চীনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো জ্বালানি। চীন তার ব্যবহৃত তেলের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ আমদানি করে, আর যুক্তরাষ্ট্র ঠিক সেখানেই তাকে আটকে ফেলতে চায়।
যেসব দেশ চীনের কাছে সস্তায় তেল বিক্রি করে, তাদের দিকে নজর দিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে। ইরান যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার চাপে রয়েছে কয়েক যুগ ধরে, রাশিয়া বহু বছর ধরে নিষেধাজ্ঞার মুখে এবং ভেনেজুয়েলার ওপরও ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। এই দেশগুলোর ক্ষেত্রে অভিন্ন মিলের দিকটি হলো—তারা সবাই কোনো না কোনোভাবে চীনের জ্বালানি ও অর্থনীতিকে সহায়তা করছে। এবং বিষয়টি সেখানেই থেমে থাকেনি; যুক্তরাষ্ট্র চীনের উত্থানকে এগিয়ে নেওয়া কোম্পানিগুলোকেও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। আলিবাবা, বিওয়াইডি, বাইডুর মতো বড় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
লক্ষ্য একটাই—চীনকে দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ইঞ্জিনগুলোর গতি কমিয়ে দেওয়া। কিন্তু এই পদ্ধতির একটি অদৃশ্য সমস্যাও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যত বেশি ফ্রন্টে আক্রমণাত্মক অবস্থান নেয়, ততই তার মিত্রদের ওপর তার চাপ বাড়ে। উপসাগরীয় দেশগুলোর দিকে তাকালেই সেই দৃশ্য স্পষ্ট হবে, এমনকি তার ইউরোপীয় মিত্রদের দিক থেকেও সে কথা খাটে।
ইরান অল্প মূল্যের ড্রোন ব্যবহার করে ক্রমাগত হামলা চালিয়ে তাদের নিরাপত্তা জাল ছিন্ন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিক্রি করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কার্যকরভাবে সবসময় সেই হুমকি ঠেকাতে পারেনি। মাত্র ৩৫ হাজার ডলারের একটি ড্রোন ধ্বংস করতে কখনও কখনও মিলিয়ন ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হচ্ছে। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উপলব্ধি করেছে যে, নিরাপত্তার হিসাব আর আগেকার মতো সরল নেই।
এরপরও যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, আমাদের দেশে বিনিয়োগ অব্যাহত রাখুন; কিন্তু তার পরিণতি ও ফলাফলও দৃশ্যমান, যা নগদে সবাই দেখছে। কিন্তু সৌদি আরব, আরব আমিরাত ও কাতার যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি পুনর্বিবেচনা করেছে—এমন আলোচনার কথা বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র যখন প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে, তখন তার মিত্রদের মধ্যেও এক্ষেত্রে সংশয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।
এই অস্থিরতার মধ্যে চীন কী করছে? সেখানেই রয়েছে এই গল্পের প্রকৃত রহস্য ও কৌশল। প্রথমত, চীন সহজে নতি স্বীকার করছে না। যুক্তরাষ্ট্র যখন চীনা কোম্পানিগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে, তখন চীন ২০২১ সালে এমন একটি আইন কার্যকর করে, যার মাধ্যমে নিজেদের ভূখণ্ডে বিদেশি কিছু নিষেধাজ্ঞাকে অকার্যকর ঘোষণা করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে যে বার্তাটি ছিল, তা স্পষ্ট—চীন কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না।
চীন বিশ্বের বহু গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ শৃঙ্খলার কেন্দ্রে অবস্থান করছে। যুদ্ধবিমানের চুম্বক থেকে শুরু করে স্মার্টফোনের চিপ, সার থেকে গাড়ির ব্যাটারি—অসংখ্য পণ্যের উৎপাদনে চীনের সরবরাহ করা কাঁচামাল ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে বিরল খনিজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীন যখন এসবের রপ্তানি সীমিত করে, তখন বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়ে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র চীনের কোম্পানিগুলোকে সংকটে ফেলতে পারে; একই সঙ্গে চীনও বৈশ্বিক শিল্প ব্যবস্থাকে চাপে ফেলতে পারে—তেমন উপায়ও তাদের হাতে আছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয় হচ্ছে—চীন যেখানে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করছে, সেটা এমন জায়গায়, সেখানে অনেকেরই নজর নেই। গত দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরাক ও আফগানিস্তানে যুদ্ধের পেছনে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে; সেই সময়ে চীন আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে অবকাঠামো নির্মাণ করেছে। বন্দর, রেলপথ, বাঁধ, টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। কেননা আফ্রিকা হচ্ছে বিশ্বের দ্রুত উন্নয়নশীল একটি মহাদেশ।
২০৫০ সালের মধ্যে আফ্রিকার জনসংখ্যা আড়াইশো কোটির বেশি হতে পারে। যে শক্তি একটি মহাদেশের অবকাঠামো গড়ে তোলে, সে তার ভবিষ্যতের ওপরও প্রভাব বিস্তার করে। চীন একই সঙ্গে ক্রমশ মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে। মার্কিন বন্ডের অংশ কমিয়ে সোনা কিনছে, নিজস্ব অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা গড়ে তুলছে এবং ইউয়ানের ব্যবহার বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি তারা ‘ব্রিকস’ সম্প্রসারণে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র ডলারের প্রভাব থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে চেষ্টা করছে।
এখন দুই বিপরীতমুখী কৌশলকে পাশাপাশি রাখলে পার্থক্যটি নিজেই সব বলে দেবে—পরিস্থিতি কী? যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে দুর্বল করার মাধ্যমে খেলছে। ক্ষেপণাস্ত্র, নিষেধাজ্ঞা, সরবরাহ লাইন কাটা—প্রতিটি পদক্ষেপকেই আপাত শক্তিশালী দেখায়, কিন্তু প্রতিটির জন্যই আলাদা মূল্য চুকাতে হয়।
বিপরীতে চীন খেলছে গড়ে তোলার মাধ্যমে। বন্দর নির্মাণ করছে, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নতি করছে, নানামুখী চুক্তি করছে, নতুন ব্যবস্থা গড়ে তুলছে। প্রতিটি পদক্ষেপ নীরব, কিন্তু প্রতিটি বিষয়ই স্থায়ীভাবে তাদের কিছু এগিয়ে নিচ্ছে।
যেকোনো কিছু ধ্বংস করা যায় অতি দ্রুত, কিন্তু তা ক্ষয় ও বিপর্যয়ের পথ খুবই সহজ। কিন্তু কোনো কিছু ধীরে ধীরে গড়ে তুললে তা হয় সমৃদ্ধির ও শক্তির। দীর্ঘ দৌড়ে ধ্বংসকারীর হাত হয় শূন্য, আর নির্মাতার হাত হয় পূর্ণ।
তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি কঠোর পদক্ষেপ কখনও কখনও বিশ্বকে সেই বিকল্প ব্যবস্থার দিকেও ঠেলে দেয়, যা চীন গড়ে তোলার কাজ করছে। চীনকে থামানোর জন্য নেওয়া প্রতিটি পদক্ষেপই হয় তার জন্য নতুন সুযোগ, না হয় নতুন প্রতিজ্ঞা তৈরি করেছে।
খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে চীনের প্রাচীন সামরিক কৌশলবিদ, দার্শনিক ও লেখক সুন জু তার বিখ্যাত ‘দ্য আর্ট অব ওয়ার’ বইয়ে বলেছিলেন, “সর্বশ্রেষ্ঠ বিজয় হলো সেই বিজয়, যা যুদ্ধ না করেই অর্জিত হয়।” অনেক বিশ্লেষকের অভিমত, শি জিনপিংয়ের রাজনৈতিক কৌশলের অনেক কিছু এই ধারণার সঙ্গে মিলে যায়।
ড. মঞ্জুরে খোদা লেখক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ই-মেইল: torikbd@gmail.com
