Published : 03 Jun 2026, 06:40 PM
ভালোবাসার রসায়নে সম্পর্কে জড়ানো মানুষের একটি সহজাত প্রবৃত্তি। যুগের পর যুগ ধরে কবি, সাহিত্যিক থেকে শুরু করে বিজ্ঞানীরাও খোঁজার চেষ্টা করেছেন— মানুষ আসলে ঠিক কী কারণে, অন্য একজন মানুষের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং প্রেমের সম্পর্কে জড়ায়?
সম্প্রতি বিভিন্ন দেশের মনস্তত্ত্ববিদ ও বিবর্তনীয় বিজ্ঞানীদের নানান গবেষণায়, এর পেছনে মূল কিছু কারণ উঠে এসেছে, যা বিজ্ঞান সাময়িকী 'সাইকোলজি টুডে' এবং 'জার্নাল অব পার্সোনালিটি অ্যান্ড সোশ্যাল সাইকোলজি’তে প্রকাশিত হয়েছে।
‘স্বনির্ভরতা বনাম বাহ্যিক’ অনুপ্রেরণা
বিজ্ঞান সাময়িকী সাইকোলজি টুডে’তে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়, কানাডার মনস্তত্ত্ববিদ ও গবেষক ডা. ম্যাকডোনাল্ড এবং তার সহযোগী গবেষকরা মানুষের সম্পর্কে জড়ানোর পেছনে মূল ৬টি কারণ বা অনুপ্রেরণা খুঁজে পেয়েছেন।
সহজাত আনন্দ: মানুষ মূলত সম্পর্ককে ভেতর থেকে উপভোগ করে। এর মধ্যে এক ধরনের মানসিক তৃপ্তি পায় বলেই সম্পর্কে জড়াতে চায়।
সামাজিক ও পারিবারিক চাপ: অনেকের ক্ষেত্রে সম্পর্কে জড়ানোর কারণটি পুরোপুরি নিজের ভেতর থেকে আসে না, বরং পরিবার বা বন্ধুদের খুশি করা কিংবা সমাজ কী ভাববে— এমন বাহ্যিক চাপ কাজ করে।
মনস্তাত্ত্বিক সাদৃশ্য ও দীর্ঘমেয়াদী আকর্ষণ
আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (এপিএ) প্রকাশিত ‘জার্নাল অফ পার্সোনালিটি অ্যান্ড সোশাল সাইকোলজি’তে প্রকাশিত, গবেষণায় মার্কিন মনোবিজ্ঞানী ডোনেল বার্ন এবং ডি. নেলসন দেখিয়েছেন যে, মানুষ কেন অন্য একজনের প্রেমে পড়ে।
তারা এই কারণের নাম দিয়েছেন ‘একই মানসিকতা’। এই মনোবিদদের ‘অ্যাট্রাকশন থিওরি’ অনুযায়ী, মানুষের চিন্তাভাবনা, সামাজিক মূল্যবোধ এবং জীবনযাত্রার মধ্যে যত বেশি মিল বা সাদৃশ্য থাকবে, তাদের মধ্যে অবচেতনভাবে প্রেমের আকর্ষণ তত তীব্র হবে।
উত্তেজনা ও পরিস্থিতির প্রভাব
একই সাময়িকীতে প্রকাশিত, আরেকটি গবেষণায় কানাডার মনোবিজ্ঞানী ডোনাল্ড ডাটন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মনোবিজ্ঞানী আর্থার আরন দেখিয়েছেন যে, অনেক সময় বিশেষ কোনো পরিস্থিতি মানুষকে দ্রুত সম্পর্কে জড়াতে উদ্বুদ্ধ করে। যেমন-
ভয় বা উত্তেজনা থেকে প্রেম: কোনো রোমাঞ্চকর বা ভীতিজনক পরিস্থিতিতে মানুষের হৃদস্পন্দন যখন বেড়ে যায়, তখন মস্তিষ্ক সেই উত্তেজনাকে সামনের মানুষটির প্রতি ‘আকর্ষণ বা প্রেম’ হিসেবে ভুল ব্যাখ্যা করে বসে। যা মানুষকে দ্রুত সম্পর্কে জড়াতে প্ররোচিত করে।
হরমোনের প্রভাব ও মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সার্কিট
যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের নিউরোবায়োলজিস্টদের মতে, মানুষ যখন কারও প্রতি তীব্র আকর্ষণ অনুভব করে, তখন মস্তিষ্কের ‘রিওয়ার্ড সার্কিট’ বা পুরস্কার পাওয়ার কেন্দ্রটি সক্রিয় হয়ে ওঠে।
ডোপামিন ও অক্সিটোসিন: গবেষকদের মতে, কারও প্রতি ভালোলাগা তৈরি হলে, মস্তিষ্কে ডোপামিন হরমোন নিঃসরণ বাড়ে। ফলে তীব্র আনন্দ ও উত্তেজনার অনুভূতি তৈরি হয়।
অন্যদিকে, দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কে একে অপরের প্রতি বিশ্বাস ও নিবিড়তা তৈরি করে ‘লাভ হরমোন’ নামে পরিচিত অক্সিটোসিন।
বিশেষজ্ঞদের এই সমস্ত বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট হয় যে, সম্পর্কের শুরুটা শারীরিক বা বাহ্যিক আকর্ষণ দিয়ে হলেও, মানুষ মূলত মনস্তাত্ত্বিক সাদৃশ্য, নিজের অভ্যন্তরীণ আনন্দ এবং এক ধরণের মানসিক ও জৈবিক নিরাপত্তার তাগিদেই একে অপরের সাথে সম্পর্কে জড়ায়।
প্রকৃতিগতভাবেই মানুষ এমন এক সামাজিক সত্তা, যা অন্যের সঙ্গে মানসিক বন্ধনে আবদ্ধ না হয়ে সম্পূর্ণ হতে পারে না।
আরও পড়ুন
প্রেমের শুরুটা অনেক সুন্দর, পরে কেন সব বদলে যায়?