Published : 19 May 2026, 01:04 PM
একটা সময়ে প্রেম মানেই ছিল অপেক্ষা। সে মেসেজ দেবে কি দেবে না, উত্তর আসতে দেরি হচ্ছে কেন, কাল কেন একটু দূরে দূরে ছিল— এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই ছিল যেন রোমান্সের রস।
সম্পর্কে যত নাটক, তত গভীর ভালোবাসা— এটাই ছিল প্রচলিত ধারণা।
তবে এখন? অনেকেই এই 'উত্তেজনাপূর্ণ' সম্পর্ক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন অনেকে। বদলে যাকে একসময় 'বোরিং' বা একঘেয়ে বলে এড়িয়ে যাওয়া হত- সেই স্থির, শান্ত, অনুমানযোগ্য সম্পর্কই হয়ে উঠছে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত।
উত্তেজনা যখন ক্লান্তিতে পরিণত হয়
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. ফারজানা রহমান দিনা বলছেন, “আগের প্রজন্মে সম্পর্ক মানেই ছিল একটা খেলা। কে আগে মেসেজ দেবে, কে কতক্ষণ না দেখেও থাকতে পারে, কে কাকে বেশি অপেক্ষায় রাখতে পারে— এই প্রতিযোগিতার মধ্যেই প্রেম টিকে থাকত। তখন মনে হতো, এই টানাপোড়েনটাই প্রমাণ করে সম্পর্ক কতটা তীব্র।”
“তবে ধীরে ধীরে মানুষ বুঝতে শুরু করেছে, এই অনিশ্চয়তা আসলে রোমান্স নয়— এটা মানসিক চাপ। সারাক্ষণ দুশ্চিন্তায় থাকা, প্রতিটি বার্তার পেছনে অর্থ খোঁজা, সম্পর্ক টিকবে কি-না সেই অস্থিরতায় ঘুম না হওয়া- এগুলো ভালোবাসার লক্ষণ নয়, এগুলো ক্লান্তির লক্ষণ। এবং এই ক্লান্তি পুঞ্জীভূত হতে হতে একদিন মানুষ ঠিক করে নেয় — আর নয়।” মন্তব্য করেন এই মনোবিদ।
‘নরম’ সম্পর্কই যেন এখন আকর্ষণীয়
নিউজএইটিন ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই বিষয়ে ভারতীয় লাইফস্টাইল সাংবাদিক সোয়াতি চাতুরভেদি বলেন, “বোরিং’ সম্পর্ক বলতে এখন বোঝায়— যেখানে কেউ হঠাৎ উধাও হয়ে যায় না, প্রতিদিন নতুন করে সন্দেহ জন্ম নেয় না, মেসেজের রিপ্লাই পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় না। যেখানে মানুষটা বলে যা করে, করে যা বলে। যেখানে পরিকল্পনা হয় এবং সেই পরিকল্পনা মেনে চলা হয়।”
এই স্থিরতাকেই এখন অনেকে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বলে মনে করছেন।
এই বিষয়ে ‘সাইকোলজি টুডে ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে মার্কিন মনোবিজ্ঞানী ড. মার্ক ট্রাভার্স উল্লেখ করেছেন, “মানসিকভাবে স্থিতিশীল সঙ্গীদের আবেগের পারদ হুটহাট ওঠানামা করে না। তারা ঝগড়ার সময়ও শান্ত থাকেন এবং মধ্যরাতে নাটকীয় কোনো বার্তা পাঠান না। এই ধারাবাহিকতা দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কের সফলতার জন্য সবচেয়ে বড় স্তম্ভ।”
ডোপামিনের প্রভাব কমে যাওয়া
সম্পর্কের শুরুতে মানুষের মস্তিষ্কে 'ডোপামিন' হরমোনের কারণে তীব্র উত্তেজনা ও ভালোলাগা কাজ করে।
ড. ট্রাভার্স বলেন, “সম্পর্ক যখন পরিপক্ক হয়, তখন এই উত্তেজনা কমে গিয়ে এক ধরনের পরম শান্তি আসে। একে অনেকেই ভুল করে 'বোরিং' ভাবেন, যা আসলে গভীর মানসিক নিরাপত্তা।”
দেরিতে রিপ্লাই এখন রোমান্টিক নয়, রেড ফ্ল্যাগ
এক প্রজন্ম আগে দেরিতে রিপ্লাই দেওয়া মানে ছিল রহস্যময়তা। মনে করা হতো, সহজলভ্য হলে আকর্ষণ কমে যায়। তাই ইচ্ছে করে দূরত্ব তৈরি করা, একটু অধরা থাকাটা- কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হতো।
সোয়াতি বলেন, “এই প্রজন্মের চোখে সেই কৌশলগুলো এখন আর মোহময় নয়। বরং এগুলো সংকেত দেয় যে মানুষটা বিশ্বস্ত নয়, স্থির নয়, নির্ভর করা যাবে না। এর বদলে যে মানুষটা নিয়মিত কথা বলে, সময়মতো উত্তর দেয়, বলে রাখলে সময়মতো হাজির হয়— সেই মানুষটাকেই এখন বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়।”
কারণ এই আচরণগুলো বলে দেয়, মানুষটা পরিপক্ব এবং সম্পর্কে বিনিয়োগ করতে প্রস্তুত।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও একই চিত্র
ফেইসবুক, টিকটক বা ইন্সটাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো বিভিন্ন দেশের যুগলদের নানান কর্মকাণ্ড জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। ‘ভাইরাল’ ভিডিওগুলোয় দেখা যায় তারা একসঙ্গে রান্না করছেন, বাজার করতে যাচ্ছেন, পাশাপাশি বসে বই পড়ছেন বা কফি নিয়ে ছোট কোনো কৌতুক পড়ে শোনাচ্ছেন।
সোয়াতি এই ঘটনাগুলো উল্লেখ করে বলেন, “এগুলোতে বড় কোনো ঘটনাই নেই, নাটকীয় কোনো মুহূর্ত নেই— শুধু সাধারণ জীবনের ছোট ছোট দৃশ্য। আর ভিডিওগুলোতেই লাখো মানুষ 'এটাই চাই' বলে মন্তব্য করছেন। এটা শুধু ট্রেন্ড নয়, এটা একটা সমষ্টিগত অনুভূতির প্রকাশ।”
মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে নাটকে, উত্তেজনায়, অনিশ্চয়তায়। তারা চাইছে এমন কেউ, যার সঙ্গে সাধারণ দিনগুলোও সুন্দর লাগে।
সাইকোলজি টুডে’র প্রতিবেদনে বেলজিয়ান বংশদ্ভূত সম্পর্ক-বিষয়ক মার্কিন থেরাপিস্ট ড. এস্থার পেরেল বলেন, “আধুনিক যুগে আমরা সঙ্গীর কাছ থেকে সব ধরনের রোমাঞ্চ, বিনোদন ও বন্ধুত্বের আশা করি। তবে কোনো মানুষের পক্ষেই সবসময় এই তীব্রতা ধরে রাখা সম্ভব নয়। আরামদায়ক নীরবতা ও একসঙ্গে ঘরের সাধারণ কাজ করতে পারাটাই সুস্থ সম্পর্কের লক্ষণ।”
আরও পড়ুন