Published : 23 Jul 2026, 02:39 PM
জীবনের প্রতিটি সময়ে আনন্দে থাকা যায় না। কর্মক্ষেত্র, পরিবার কিংবা বন্ধুমহলে এমন অনেকেই থাকেন, যারা প্রায় প্রতিটি বিষয়েই অভিযোগ, হতাশার কথা কিংবা সবকিছুর নেতিবাচক দিকটি আগে দেখেন।
এমন মানুষের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটাতে কাটাতে নিজের মনও ভারী হয়ে যেতে পারে। একসময় দেখা যায়, অন্যের হতাশা নিজের মানসিক শক্তিকেও দুর্বল করে দিচ্ছে।
মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট কাম ডটকম-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অন্যের কষ্টকে অস্বীকার না করেও, নিজের মানসিক সুস্থতা রক্ষা করা সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন সহমর্মিতা, আত্মসচেতনতার মতো অভ্যাস।
সব সময় নেতিবাচক মানুষ কেন এমন আচরণ করেন?
প্রতিবেদনে মার্কিন মনোবিদ ক্রিস মোসুনিক বলেন, “একজন মানুষের নেতিবাচক আচরণের পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। অনেক সময় শৈশবের অভিজ্ঞতা, পারিবারিক পরিবেশ কিংবা জীবনের কঠিন ঘটনাগুলো মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করে।”
প্রিয়জন হারানো, আর্থিক সংকট কিংবা সম্পর্কের ভাঙনের মতো ঘটনা, দীর্ঘ সময়ের জন্য হতাশা তৈরি করতে পারে।
এই চিকিৎসকের মতে, মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যাও একটি বড় কারণ। বিষণ্নতা বা উদ্বেগজনিত সমস্যায় ভুগলে ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত ও অন্ধকার মনে হতে পারে।
আবার দীর্ঘদিনের শারীরিক অসুস্থতা বা ব্যথাও বিরক্ত, ক্লান্ত ও নেতিবাচক করে তুলতে পারে।
অনেকের ক্ষেত্রে নেতিবাচকভাবে চিন্তা করা একসময় অভ্যাসে পরিণত হয়। এমন পরিবেশে বড় হলে, যেখানে সব সময় অভিযোগ, হতাশা বা সমালোচনা ছিল, সেই আচরণ অজান্তেই স্বাভাবিক অভ্যাস হয়ে যেতে পারে।
সীমারেখা তৈরি করে আত্মরক্ষা
ডা. মোসুনিক মনে করেন, অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া যেমন প্রয়োজন, তেমনি নিজের মানসিক সুস্থতার জন্য সীমারেখা নির্ধারণ করাও জরুরি।
যদি কোনো সহকর্মী প্রতিদিন একই ধরনের অভিযোগ করেন এবং সেটা নিজের মানসিক শান্তি নষ্ট করে, তাহলে সব সময় সেই আলোচনায় যুক্ত না হওয়াই ভালো।
প্রয়োজন হলে সময় বা আলোচনার বিষয় পরিবর্তন করা যেতে পারে।
তবে সীমারেখা তৈরি করা মানে সম্পর্ক নষ্ট করা নয়। বরং এটি এমন একটি উপায়, যা সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী ও স্বাস্থ্যকর রাখে।
কারণ নিজের মানসিক শক্তি বজায় রাখতে না পারলে অন্যকেও সহায়তা করা সম্ভব হয় না।
সহমর্মিতা থাকুক, কিন্তু নেতিবাচকতা নয়
কোনো মানুষ কেন এমন আচরণ করছেন, তা বোঝার চেষ্টা করলে বিরক্তি অনেকটাই কমে যায়।
এই মনোবিদ বলেন, “অভিযোগের আড়ালে অনেক সময় গভীর কষ্ট, একাকিত্ব কিংবা ভয় লুকিয়ে থাকতে পারে। তাই সঙ্গে সঙ্গে বিচার না করে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করা প্রয়োজন।”
তবে সহমর্মিতা দেখানোর অর্থ এই নয় যে, অন্যের প্রতিটি নেতিবাচক অনুভূতি নিজের ওপর নিতে হবে।
অন্যের অনুভূতি বুঝতে হবে, তবে সেই অনুভূতির ভার নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া উচিত নয়। এই ভারসাম্য বজায় রাখাই মানসিক সুস্থতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রয়োজন হলে কিছুটা দূরত্ব রাখা
সব সম্পর্ক সমানভাবে ঘনিষ্ঠ হওয়ার প্রয়োজন নেই। যদি কারও সঙ্গে সময় কাটানোর পর বারবার ক্লান্তি, বিরক্তি বা মানসিক চাপ অনুভূত হয়, তাহলে দেখা করার সময় বা পরিমাণ কমানো যেতে পারে।
“এটি সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়, বরং নিজের সুস্থতার প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া”, মন্তব্য করেন ডা. মোসুনিক।
দীর্ঘ সময় বসে অভিযোগ শোনার পরিবর্তে একসঙ্গে কোনো কাজ করা যেতে পারে। যেমন- হাঁটাহাঁটি, কোনো অনুষ্ঠান দেখা কিংবা অন্য কোনো ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া। এতে কথোপকথনের চাপ কমে এবং সম্পর্কও বজায় থাকে।
নিজের মনকে স্থির রাখা
নেতিবাচক মানুষের সঙ্গে দেখা করার আগে নিজের মনকে প্রস্তুত করা উপকারী হতে পারে। কয়েক মিনিট ধীরে ধীরে শ্বাস নেওয়া, মনোযোগ ধরে রাখা কিংবা শান্তভাবে বসে থাকা মানসিক স্থিরতা বাড়ায়। এতে অন্যের হতাশা সহজে নিজের ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না।
এছাড়া এমন কারও সঙ্গে সময় কাটানোর পর নিজের জন্য কিছু সময় রাখা উচিত।
“হাঁটাহাঁটি করা, বই পড়া, ডায়েরি লেখা কিংবা শরীরচর্চা করলে জমে থাকা মানসিক চাপ কমে যায় এবং মন আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে”, পরামর্শ দেন এই চিকিৎসক।
অভিযোগ নয়, সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়া
কথোপকথনে যদি বারবার একই অভিযোগ ফিরে আসে, তাহলে ধীরে ধীরে আলোচনাকে সম্ভাব্য সমাধানের দিকে নেওয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে।
যেমন- কোনো বন্ধু যদি কর্মক্ষেত্র নিয়ে বারবার অসন্তোষ প্রকাশ করেন, তাহলে তাকে জিজ্ঞেস করা যেতে পারে, ‘পরিস্থিতি বদলাতে তিনি কী করতে পারেন?’
এই বিশেষজ্ঞের মতে, “সমাধান নিয়ে ভাবার সুযোগ তৈরি হলে ধীরে ধীরে নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন হওয়া যায়। এতে অসহায়ত্বের অনুভূতি কমে এবং ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়।”
মন দিয়ে শোনা, কিন্তু নিজের অবস্থানও ধরে রাখা
ভালো শ্রোতা হওয়া সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ। কেউ নিজের কষ্টের কথা বললে, মাঝপথে বাধা না দিয়ে মনোযোগ দিয়ে শোনা উচিত।
চোখে চোখ রেখে কথা বলা, মাথা নেড়ে বোঝানো বা শান্তভাবে বলা— ‘আমি বুঝতে পারছি, বিষয়টি আপনার জন্য কঠিন’—এ ধরনের প্রতিক্রিয়া মানুষকে স্বস্তি দেয়।
তবে মন দিয়ে শোনার অর্থ এই নয় যে, প্রতিটি অভিযোগের সঙ্গে একমত হতে হবে। নিজের দৃষ্টিভঙ্গি শান্তভাবে ধরে রেখেও অন্যকে সম্মান দেওয়া সম্ভব।
বিচার না করে পরিস্থিতিকে বোঝার চেষ্টা
কাউকে সহজেই ‘নেতিবাচক মানুষ’ বলে চিহ্নিত করলে সম্পর্ক আরও কঠিন হয়ে যেতে পারে।
আচরণের পেছনের কারণ বোঝার চেষ্টা করলে বিরোধ কমে এবং সহানুভূতি বাড়ে। অনেক সময় মানুষ নিজেও বুঝতে পারেন না যে তার আচরণ আশপাশের মানুষের ওপর কী প্রভাব ফেলছে।
তাই ব্যক্তিকে নয়, তার পরিস্থিতিকে বোঝার চেষ্টা করলে সম্পর্ক আরও মানবিক হয় এবং নিজের মনও অযথা ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।
নিজের ভেতরে ইতিবাচক মনোভাব
অন্যের নেতিবাচকতা থেকে নিজেকে রক্ষা করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হল, নিজের ইতিবাচক মানসিক শক্তি গড়ে তোলা।
প্রতিদিন নিজের ভালো দিকগুলো মনে করিয়ে দেওয়া, কৃতজ্ঞতার চর্চা করা এবং ছোট ছোট আনন্দের মুহূর্তকে গুরুত্ব দেওয়া এতে সহায়তা করে।
ডা. মোসুনিক বলেন, “প্রতিদিন অন্তত তিনটি বিষয় লিখে রাখা যেতে পারে, যার জন্য ‘আপনি কৃতজ্ঞ’। এটি হতে পারে পরিবারের সমর্থন, সুস্বাস্থ্য কিংবা সুন্দর একটি সকাল। এই অভ্যাস ধীরে ধীরে মস্তিষ্ককে ইতিবাচক বিষয়গুলোর দিকে বেশি মনোযোগ দিতে শেখায়।”
নিজের যত্ন নেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ
পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং বিশ্রাম এসব শুধু শরীর নয়, মনকেও শক্তিশালী রাখে।
পাশাপাশি বই পড়া, বাগান করা, ধ্যান করা কিংবা নিজের পছন্দের কোনো কাজের জন্য সময় বের করলে মানসিক চাপ কমে।
আরও পড়ুন
জেনে নিন কখন কাজ না করা শরীরের জন্য ভালো