Published : 25 Jul 2026, 01:18 AM
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক ক্রান্তিলগ্নে নানামুখী চাপ আর গঞ্জনার মধ্যে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে তিন বছর তিন মাস কাটিয়ে মেয়াদপূর্তির আগেই বিদায় নিলেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
নব্বই পরবর্তী বাংলাদেশে তিনি দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি, যাকে মেয়াদ পূর্তির আগেই ইস্তফা দিতে হল। এই সময়ে আর কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে এত বিচিত্র অভিজ্ঞতা আর এতটা কঠিন সময় পার করতে হয়নি।
বঙ্গভবনবাসের এই ৩৯ মাসে সাহাবুদ্দিন দুটি জাতীয় নির্বাচন দেখেছেন। তিনজন সরকারপ্রধানকে শপথ পড়িয়েছেন। নজিরবিহীন এক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে একজন সরকারপ্রধানের দেশত্যাগের সাক্ষী হয়েছেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন।
দূতাবাস থেকে রাষ্ট্রপতির ছবি নামিয়ে ফেলার পর তাকে ক্ষোভ পুষে রাখতে হয়েছে বুকের মধ্যে। সাংবিধানিক নিয়ম রক্ষার খাতিরে নিজের রাজনৈতিক আদর্শের বিপরীত বয়ান উচ্চারণ করতে হয়েছে জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে। দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে সংবাদমাধ্যমকে বলতে হয়েছে, “আমার ভালো লাগে না।”
কিন্তু ২০২৪-২৫ সালের ঝঞ্ঝামুখর ওই সময়ে পদত্যাগ করার বাস্তবতাও তার ছিল না। গত সাড়ে তিন দশকে আর কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে এতটা অসহায় পরিস্থিতিতে দেখেনি বাংলাদেশ।
মো.সাহাবুদ্দিনের বিদায় বেলায় তার মূল্যায়ন করতে গিয়ে সংসদ বিষয়ক গবেষক অধ্যাপক নিজামউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির খুব বেশি ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ নেই। তবে চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সময় ‘ইতিবাচক ভূমিকা’ রাখতে পেরেছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন, তা না হলে জটিলতা আরো বাড়তে পারত।
আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মাহবুবুর রহমান বলছেন, রাষ্ট্রপতির মত মর্যাদাপূর্ণ পদে যাওয়ার জন্য যে ব্যক্তিত্ব, সততা, নিষ্ঠা থাকা দরকার, তার কতটুকু সাহাবুদ্দিনের মধ্যে ছিল, তা এখনও ‘প্রশ্নবিদ্ধ’।
২০২৪ সালের ১১ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছেই শপথ নেন টানা চারবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
‘আমিই তো ঝড় ওঠাচ্ছি’
টানা দুই বারের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ২০২৩ সালে অবসরে যাওয়ার সময় তার উত্তরসূরি হিসেবে আওয়ামী লীগ যখন মো. সাহাবুদ্দিনকে মনোনয়ন দিল, রাজনৈতিক অঙ্গনের অনেকের কাছেই সেটি ছিল বিস্ময়কর সিদ্ধান্ত।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য বা সরকারের প্রভাবশালী কোনো মন্ত্রী নন, জাতীয় রাজনীতিরও প্রথম সারির পরিচিত মুখ নন, এমন একজনকে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে মনোনয়ন দেওয়া হবে, তা খুব কম মানুষই অনুমান করেছিলেন।
রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার জন্য সরকারপ্রধানের ডাক পেয়ে মো. সাহাবুদ্দিন নিজেও সম্ভবত বিস্মিত হয়েছিলেন। নির্বাচন কমিশনে গিয়ে নিজের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, “সবই আল্লাহর ইচ্ছা।”
তবে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের কাছে তার কয়েকটি পরিচয় ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পাবনায় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর সামরিক শাসনের সময় রাজনৈতিক কারণে কারাবন্দিও হন।
পরে আইন পেশায় যোগ দেন। বিচার বিভাগে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেন। জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে অবসর নেওয়ার পর দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার ছিলেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগ তার রাজনৈতিক অতীত, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অবস্থান এবং প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাকে সামনে আনে।
সংসদে আওয়ামী লীগের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে অন্য কোনো প্রার্থী না থাকায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন মো. সাহাবুদ্দিন। ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন তিনি।
দায়িত্ব নেওয়ার পর নিজ জেলা পাবনায় নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দেওয়া একটি তাৎক্ষণিক মন্তব্যের কারণে মো. সাহাবুদ্দিন ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসেন।
২০২৩ সালের ১৬ মে পাবনায় গিয়ে এক নাগরিক সংবর্ধনায় যোগ দেন সাহাবুদ্দিন। অনুষ্ঠান শেষে তিনি যখন বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন হঠাৎ শুরু হয় কালবৈশাখী। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা রাষ্ট্রপতির সহকারী একান্ত সচিব সেদিকে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
২০২৪ সালের ৮ অগাস্ট মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
এ সময় বক্তব্য দিতে দিতেই রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বলে ওঠেন, “কিসের ঝড়, ঝড় উঠুক, আমিই তো এখানে ঝড় ওঠাচ্ছি।”
রাষ্ট্রপতির মুখে এমন মন্তব্যে উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে হাসির সৃষ্টি হয়। তখনো কেউ কল্পনা করেননি, কেমন ঝড়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে বঙ্গভবনে মো. সাহাবুদ্দিনের প্রথম বছর ছিল গতানুগতিক, দেশের পরিবেশ ছিল শান্ত। ওই বছরের শেষ দিকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়তে শুরু করে।
বিরোধী দলগুলোর নির্বাচন বর্জন, আন্দোলন, সহিংসতা এবং আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা মূলত সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ তার দায়িত্ব পালনের বাস্তবতাই বদলে দেয়। পরবর্তী দুই বছরে তিনি এমন সব ঘটনার মুখোমুখি হন, যার নজির বাংলাদেশে খুব কমই আছে।
দুই নির্বাচন, তিন সরকারপ্রধানের শপথ, এক অভ্যুত্থান
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন মো. সাহাবুদ্দিনের মেয়াদকালের প্রথম বড় রাজনৈতিক ঘটনা। বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মধ্যে ওই নির্বাচনে জিতে আওয়ামী লীগ টানা চতুর্থবার সরকার গঠন করে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরা রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে শপথ নেন।
কিন্তু কয়েক মাসের ব্যবধানে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা আমূল বদলে যায়। জুলাই-অগাস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলন, সহিংসতা, প্রাণহানি এবং শেষ পর্যন্ত ৫ অগাস্ট শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি—স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব অধ্যায়ের সাক্ষী হন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে শপথ নেয় তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার।
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হেলিকপ্টারে চড়ে ভারতে চলে গেলে তার বাসভবন, তার কার্যালয় এমনকি জাতীয় সংসদেরও দখল নেয় জনতা। বিশৃঙ্খলা আর সহিংসতার মধ্যে শেখ হাসিনা সরকারের বেশিরভাগ মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের বেশিরভাগ জ্যেষ্ঠ নেতা আত্মগোপনে চলে যান।
হাসিনা আমলের কোনো কিছু অবশিষ্ট না থাকলেও অনিবার্য পরিণতির মত বঙ্গভবনে থেকে যান মো. সাহাবুদ্দিন। সেই সংকটময় সময়ে বঙ্গভবনের ওপর গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্ব বর্তায়।
সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পর রাষ্ট্রপতিকে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের উদ্যোগ নিতে হয়। তাকেই সংসদ বিলুপ্ত করার আদেশ দিতে হয়।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত চাওয়ার পর তার ভিত্তিতে ২০২৪ সালের ৮ অগাস্ট মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি।
সেই অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক অবস্থান অপরিবর্তিত থাকলেও রাজনৈতিক বাস্তবতা পুরোপুরি বদলে যায়।
যে রাষ্ট্রপতি আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নির্বাচিত হয়েছিলেন, তাকেই নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যেতে হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোকে অধ্যাদেশে পরিণত করতে তাকেই সই দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা সারতে হয়।
কিন্তু আওয়ামী লীগের রেখে যাওয়া রাষ্ট্রপতি কেন অভ্যুত্থানের পর বঙ্গভবনে থেকে যাবেন, সেই প্রশ্ন তোলেন কেউ কেউ। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও আন্দোলনের নেতারা প্রকাশ্যে তার পদত্যাগ বা অপসারণের দাবি জানান।
২০২৪ সালের অক্টোবরে একটি সাক্ষাৎকারে মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, তিনি শুনেছেন শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন, কিন্তু তার কাছে সেই পদত্যাগের কোনো দালিলিক প্রমাণ বা নথি নেই।
একই সঙ্গে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি পরে সুপ্রিম কোর্টের মতামত নিয়েছিলেন এবং সেই মতামতের ভিত্তিতেই পরবর্তী সাংবিধানিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
ওই বক্তব্য প্রকাশের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের সমালোচনা করেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটিসহ বিভিন্ন সংগঠন তার পদত্যাগ দাবি করে। বঙ্গভবনের সামনে বিক্ষোভও হয়।
তখন বিএনপি সাংবিধানিক সংকট তৈরির আশঙ্কা তুলে রাষ্ট্রপতিকে সরানোর বিরোধিতা করেছিল। শেষ পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকার আর সে পথে যায়নি।
তবে সব মিলিয়ে দুর্বিষহ পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটছিল রাষ্ট্রপ্রধানের চেয়ারে থাকা সাহাবুদ্দিনের। নির্বাচনের আগে ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের পর সরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
২০২৬ সালের ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। বিটিভির ভিডিও থেকে নেওয়া ছবি
রাষ্ট্রপতি বলেছিলেন, “আমি বিদায় নিতে আগ্রহী। আমি এখান থেকে চলে যেতে চাই।”
সেদিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের পক্ষ থেকে সরাসরি যোগাযোগ করে কখন পদত্যাগ করতে চান জানতে চাইলে রাষ্ট্রপতি বলেছিলেন, “নতুন সরকার আসলে… নতুন সরকার বললে, অনুরোধ করলে।”
কেন পদত্যাগের কথা ভাবছেন, সেই প্রশ্নে তার উত্তর ছিল, “আমার ভালো লাগে না।”
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তাকে কোণঠাসা করে রাখা, বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলো থেকে তার ছবি সরিয়ে ফেলা এবং বঙ্গভবনের প্রেস উইং সংকুচিত করায় ‘অপমানবোধ’ করার কথাও পরে বলেছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করলেও রাষ্ট্রপতি তখন পদত্যাগ করেননি। ১৭ ফেব্রুয়ারি তার কাছেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং নতুন সরকারের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা শপথ নেন।
এর পরের পরিস্থিতি মো. সাহাবুদ্দিনের জন্য অনেকটা সহনীয় হয়ে আসে।
২০২৬ সালের ২৮ মে কোরবানির ঈদের দিন এক ভিডিও বার্তায় সবাইকে শুভেচ্ছা জানান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
বিস্ফোরক সাক্ষাৎকার
নির্বাচনের পর ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে কালের কণ্ঠকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মো. সাহাবুদ্দিন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেন।
মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে নানা ‘চক্রান্ত’ হয় দাবি করে তিনি বলেন, দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা ‘চিরতরে ধ্বংস করার এবং সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি করার অনেক পাঁয়তারা’ হয় সে সময়।
“আমি দৃঢ়চিত্তে আমার সিদ্ধান্তে অবিচল ছিলাম। যে কারণে কোনো ষড়যন্ত্রই সফল হয়নি। বিশেষ করে অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রপতিকে উপড়ে ফেলার অসংখ্য ছক ব্যর্থ হয়েছে,” বলেছিলেন সাহাবুদ্দিন।
তার সেই দুঃসময়ে বিএনপির কাছ থেকে ‘শতভাগ সমর্থন’ পাওয়ার কথাও বলেছিলেন তখনকার রাষ্ট্রপ্রধান।
তিনি বলেছিলেন, “আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি, ওই কঠিন সময়েও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব আমার পাশে ছিলেন। তারা তখনো সংবিধানের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়টি আমার কাছে স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেছেন।
“বিশেষ করে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ঘিরে আমার মনের মধ্যে অনেক কৌতূহল জমা ছিল। কিন্তু আমি পর্যায়ক্রমে বুঝতে পারলাম, তিনি খুবই আন্তরিকতাপূর্ণ মানুষ। হি ওয়াজ সো কর্ডিয়াল! আমার দুঃসময়ে বিএনপির সহযোগিতা শতভাগ ছিল।”
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ২৬ মার্চ বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে গত ১২ মার্চ রাষ্ট্রপতির ভাষণ শুরুর পর জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ বিরোধী দলের সদস্যরা ওয়াকআউট করেন।
রাষ্ট্রপতির ভূমিকা, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় তার অবস্থান এবং শেখ হাসিনার পদত্যাগ নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের প্রতিবাদে তারা এ কর্মসূচি নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।
তখনও বিএনপির মন্ত্রী-এমপিরা সংবিধানের বিধানের কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পক্ষে কথা বলেন।
হঠাৎ পদত্যাগ
স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য গত মে মাসে লন্ডনে ঘুরে আসেন রাষ্ট্রপতি। পরিবারের সদস্য, চিকিৎসক, স্টাফ নার্স ও বঙ্গভবনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও তার সঙ্গে ছিলেন।
১২ মে কেমব্রিজের রয়াল প্যাপওয়ার্থ হাসপাতালে রাষ্ট্রপতির এনজিওগ্রাম করা হয়। সে সময় হৃদযন্ত্রের একটি ধমনিতে গুরুতর ব্লক শনাক্ত হলে তাৎক্ষণিকভাবে এনজিওপ্লাস্টি করে একটি স্টেন্ট বসানো হয়।
নয় দিন পর দেশে ফেরেন রাষ্ট্রপতি। তখন বঙ্গভবনের প্রেস বিভাগ ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের বরাতে তার শারীরিক অবস্থা ‘স্থিতিশীল ও সন্তোষজনক’ বলে জানিয়েছিল।
গত দেড় মাসে রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে খুব বেশি আলোচনা দেশের রাজনীতির অঙ্গনে ছিল না। গত ২২ জুলাই প্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের এক ফেইসবুক পোস্ট ঘিরে হঠাৎ করেই আবার রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের গুঞ্জন শুরু হয়।
সায়ের ফেইসবুকে লেখেন, “আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। এর চাইতেও বিস্ময়কর খবর হলো নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপির কোনো শীর্ষ নেতার পরিবর্তে পছন্দের তালিকায় রয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি।”
রাষ্ট্রপতির দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা এবং তার ঘনিষ্ঠ একজন বৃহস্পতিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। তবে স্পিকার দেশে না থাকায় পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার বিষয়টি বিলম্বিত হচ্ছে।
চিকিৎসার জন্য গত ১৯ জুলাই ব্যাংককে গিয়েছিলেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ। আগামী ২৬ জুলাই তার ফেরার কথা ছিল। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সফর সংক্ষিপ্ত করে তাকে শুক্রবার দুপুরে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।
এরপর বিকাল সোয়া ৪টার দিকে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলে নিজেই পদত্যাগের কথা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন মো. সাহাবুদ্দিন।
পদত্যাগের বিষয়ে প্রশ্ন করলে রাষ্ট্রপতি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এটা তো সর্বজনবিদিত, আমার মুখ থেকে শুনে কী লাভ? আই অ্যাম সিক, সো ইট ইজ ডান।”
পদত্যাগপত্রে তিনি দাবি করেন, চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর তার ‘সুদৃঢ় ও ইতিবাচক’ ভূমিকার কারণেই সাংবিধানিক বিপর্যয় এড়াতে পেরেছিল বাংলাদেশ।
আর পদত্যাগের কারণ হিসেবে বলেন, তিনি নানা রোগে আক্রান্ত। ‘শারীরিক ও মানসিক অসমর্থ্যতার’ কারণে রাষ্ট্রপতির মত গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদের দায়িত্ব পালন করা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।
ইতিহাস কীভাবে মনে রাখবে?
রাজনীতিবিদ, বিশ্লেষক, বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. মুশতাক হোসেন মনে করেন, ইতিহাস একটি কারণেই রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে মনে রাখতে পারে।
“বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাতো খুবই সীমিত, আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। তো উনি সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করেছেন, এটা মোটাদাগে বলা যায়।”
সংসদ বিষয়ক গবেষক নিজামউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির খুব বেশি ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ না থাকলেও চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের সময় তার ভূমিকা রাখার বড় সুযোগ ছিল।
“উনি সেই মুহূর্তে সুপ্রিম কোর্টের মতামত না চাইলে, রেফারেন্স না চাইলেতো এক ধরনের স্টেলমেট লেগে যেতে পারত সেখানে।”
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের এই সাবেক অধ্যাপকের মতে, ২০২৪ সালের অগাস্ট মাসের অস্থির ওই সময়টায় মো. সাহাবুদ্দিনের ভূমিকা ইতিবাচকই ছিল।
“আমি মনে করি জনমতের পক্ষে তার অবস্থানটা ছিল। যদিও আওয়ামী লীগের কারণে উনি ওখানে। উনি চাইলে হয়তো বেঁকেও বসতে পারতেন, এখানে বেঁকে বসার সুযোগ ছিল। তো সেখানে উনি জনমত, আন্দোলনকারীদের উপর প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই দেখা যাচ্ছিল যে, সংকট সমাধানের ক্ষেত্রে তার একটা ভূমিকা ছিল। আমি মনে করি, যেটা একটা পজিটিভ দিক রয়ে গেছে তার।”
সংসদ ভেঙে দেওয়ার মত মৌলিক সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়া রাষ্ট্রপতির দেওয়ার সুযোগ না থাকলেও সাহাবুদ্দিনকে বাস্তবতার খাতিরে তা ‘করতে হয়েছে’ বলে মন্তব্য করেন নিজামউদ্দিন আহমদ।
চব্বিশের ৫ অগাস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করার কথা বললেও পরে মানবজমিন সম্পাদককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ওই পদত্যাগপত্র না পাওয়ার কথা বলেছিলেন সাহাবুদ্দিন; বিষয়টিকে তার ‘বিতর্কিত মতামত’ বলতে চান নিজামউদ্দিন।
আবার মতাদর্শের দিক দিয়ে ভিন্ন মেরুর বাসিন্দা হলেও গত পাঁচ মাসে বিএনপি সরকারের কথা মতই চলেছেন সাহাবুদ্দিন। সে প্রসঙ্গ ধরে নিজামউদ্দিন বলেন, “পতিত সরকারের মনোনীত প্রেসিডেন্ট হয়েও এরা যা চেয়েছেন, যা করতে বলছেন, ঠিক সেভাবে উনি করে গেছেন।”
তবে আওয়ামী লীগ আমলে রাষ্ট্রপতি পদে সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি করার বিষয়টি নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মাহবুবুর রহমান।
তিনি বলেন, “দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়িত্বসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাকে নিয়ে বিতর্ক ছিল। বাংলাদেশে অনেক যোগ্য লোক থাকার পরও আওয়ামী লীগ একজন বিতর্কিত লোককে নির্বাচিত করেছিল। আওয়ামী লীগের স্বৈরাচারী আচরণের কারণে এ ধরনের একজন লোককে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানুষ বাধা দিতে পারে নাই।
“ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্রপতির মত একটা সম্মানজনক পদে এ ধরনের একজন ব্যক্তিকে গ্রহণ করে নিতে হয়েছিল।”
মাহবুবুর রহমান মনে করেন, চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার প্রশ্ন আসে। নতুন করে আরো সংকট যাতে না হয়, সেজন্য সাহাবুদ্দিনকে বাদ দেওয়ার চিন্তা থেকে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো সরে এসেছিল। তাতে তার পদ রক্ষা পায়।
“কিন্তু ওই সময়ে ১৫-২০ দিন যে মহাসংকট গিয়েছিল, ওই সময়ে উনার মহা ভূমিকা থাকতে পারত। উনার তো কোনো ভূমিকা নাই। ৫ অগাস্টের পরে শান্তি-শৃঙ্খলায় উনার কোনো ভূমিকা নাই। সেটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো, সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিল।”
[প্রতিবেদনটি তৈরি করতে সহযোগিতা করেছেন জেসমিন মলি, কাজী মোবারক হোসেন ও সালমান তারেক শাকিল]
আরও পড়ুন:
রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করলে কী হবে?
শুধু পদত্যাগ করলেই হবে না, রাষ্ট্রপতিকে গ্রেপ্তারও করতে হবে: নাহিদ
রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করছেন শুক্রবার: রয়টার্স
থাইল্যান্ড সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরছেন স্পিকার
রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করছেন কি না, তাকেই জিজ্ঞেস করুন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
এক ফেইসবুক পোস্ট ধরে গুঞ্জন: রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করছেন?
'অপমানবোধ' করছেন, ভোটের পরে পদত্যাগ করতে চান রাষ্ট্রপতি