Published : 23 Jul 2026, 07:14 PM
যেকোনো দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কের ক্ষেত্রে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শুরুর দিকের সেই তীব্র আবেগ বা ‘প্রজাপতি ওড়ার অনুভূতি’ কিছুটা কমে আসা স্বাভাবিক।
তীব্র ভালোলাগার জায়গাটিতে তখন স্থান করে নেয় এক ধরনের নির্ভরতা, স্বস্তি এবং প্রতিদিনের চেনা রুটিন।
তবে অনেক সময় সঙ্গী বা জীবনসঙ্গীর সঙ্গে এই চেনা ছন্দই এক সময় রূপ নেয় চরম একঘেয়েমিতে। তখন ভালোবাসার মানুষটিকে জীবনসঙ্গীর চেয়ে একজন ‘রুমমেট’ বা একই ছাদের নিচে থাকা সহকর্মী মনে হতে শুরু করে।
মনস্তত্ত্ব এবং সম্পর্ক গবেষকদের ভাষায় এই নিঃশব্দ দূরত্বকে বলা হচ্ছে ‘প্যারালাল লাইফ সিন্ড্রোম’ বা ‘সমান্তরাল জীবনধারার লক্ষণ’।
নিউইয়র্ক-ভিত্তিক ডেইটিং প্রশিক্ষক এবং ‘এ লিটল নাজ’ প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা এরিকা এটিন সেল্ফ ডটকমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেন, “নামটির মতোই এই সিন্ড্রোম বা উপসর্গে আক্রান্ত দম্পতি আসলে একসঙ্গে জীবন পার করেন না, বরং একে অপরের পাশাপাশি দুটি সমান্তরাল লাইনে বেঁচে থাকেন, যেখানে কোনো মিলন বা ‘ইন্টারসেকশন’ থাকে না। ঘরের বাইরে তাদের রুটিন পুরোপুরি আলাদা থাকে। এমনকি ঘরে ফিরে একই বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে থাকলেও তারা সময় পার করেন নিজেদের ফোনের স্ক্রিনে। যার ফলে শারীরিকভাবে কাছাকাছি থাকলেও মানসিকভাবে তারা দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতের বাসিন্দা হয়ে যান।”
লস অ্যাঞ্জেলেস-ভিত্তিক ‘কাপল থেরাপিস্ট’ ডা. প্যাট্রিস লে গয় এবং অন্যান্য সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ‘সমান্তরাল জীবনধারা’ চেনার প্রধান ৩টি লক্ষণ রয়েছে।
প্যারালাল লাইফ সিন্ড্রোমের ৩টি প্রধান লক্ষণ
যেকোনো সিদ্ধান্ত একাকী নেওয়া এবং পরে সঙ্গীকে জানানো
সুস্থ সম্পর্কের মূল শর্ত হল যেকোনো ছোট-বড় বিষয়ে সঙ্গীকে নিজের ভাবনার অংশীদার বা ‘সাউন্ডিং বোর্ড’ বানানো।
তবে ডা. প্যাট্রিস লে গয় বলেন, “এই সমস্যার প্রথম লক্ষণ হল, নিজের ক্যারিয়ার বা জীবনের বড় কোনো ভালো খবর বা স্বাস্থ্যের কোনো উদ্বেগের কথা জীবনসঙ্গীকে প্রথমে না জানিয়ে অন্য কাউকে টেক্সট করার অভ্যাস তৈরি হওয়া।”
কোনো ভ্রমণের জন্য বুকিং করা, দামি জিনিস কেনা বা বড় কোনো পরিকল্পনা একাই চূড়ান্ত করে ফেলা এবং সঙ্গীকে কেবল ‘জানানোর জন্য জানানো’— সম্পর্ক সমান্তরাল রাস্তায় চলার বড় প্রমাণ।
সূক্ষ্ম আন্তরিক মুহূর্তগুলো হারিয়ে যাওয়া
এখানে বড় কোনো শারীরিক মিলনের কথা বলা হচ্ছে না, বরং প্রতিদিনের জীবনের ছোটখাটো স্পর্শ বা ‘মাইক্রো-কানেকশন’ নিয়ে কথা বলা হচ্ছে।
বাড়ি ফেরার পর সঙ্গীকে জড়িয়ে ধরা, কপালে একটু চুমু খাওয়া, কিংবা রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় আলতো করে হাত ধরা— এই ছোট বিষয়গুলো অবচেতনভাবেই মস্তিষ্কে অক্সিটোসিনের মতো ‘সুখী হরমোন’ নিঃসরণ করে রসায়ন টিকিয়ে রাখে।
এরিকা এটিনের মতে, “যখন এই অভ্যাসগুলো ঐচ্ছিক মনে হতে শুরু করে বা কষ্টের কাজ বলে মনে হয়, তখনই সম্পর্কটি সচল বিনিয়োগ থেকে এক ধরনের নিষ্ক্রিয় বা ‘প্যাসিভ’ সহাবস্থানে রূপ নেয়।
সবকিছু ‘ঠিক আছে’ ভেবে রোমান্সকে অবহেলা করা
যেহেতু সম্পর্কে কোনো বড় ঝগড়া নেই, কোনো পরকীয়া নেই, তাই অনেক যুগলই ভাবেন সব তো ঠিকই আছে, রোমান্স বা ‘ডেট নাইট ‘পরে’ করলেও চলবে। তবে এই ‘পরে করার ফাঁদই’ সম্পর্কের মূল দেওয়াল হয়ে দাঁড়ায়।
মানুষ তখন নিজের মানসিক ও সামাজিক চাহিদা পূরণের জন্য সঙ্গীর ওপর নির্ভর না করে এককভাবে বা বন্ধুদের আড্ডাকেই প্রাধান্য দিতে শুরু করে, ফলে সঙ্গী কেবলই একটি ‘বিকল্প পছন্দ’ বা ‘আফটারথট’ হিসেবে রয়ে যান।
এই চক্র থেকে মুক্তির ৩টি বৈজ্ঞানিক উপায়
যেহেতু এতে কোনো প্রকাশ্য বিবাদ থাকে না, তাই অনেকে খুব দেরিতে এই দূরত্ব টের পান। তবে সদিচ্ছা থাকলে এই সমান্তরাল রেখাকে আবারও এক বিন্দুতে মেলানো সম্ভব।
ছোট ছোট সংযোগের পুনরুজ্জীবন: রাতারাতি বড় কোনো পরিবর্তন না করে ছোট অভ্যাস দিয়ে শুরু করা উপকারী। অফিস থেকে ফেরার পথে সঙ্গীর প্রিয় কোনো স্ন্যাকস বা খাবার কিনে আনা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো মজার মিম শেয়ার করা বা রাতে খাওয়ার পর ফোন দূরে রেখে, তার দিনটি কেমন কাটলো সেটা মনোযোগ দিয়ে শোনা সম্পর্কের মরিচা দূর করতে সাহায্য করে।
সুবিধার চেয়ে সম্পর্ককে প্রাধান্য দেওয়া: ক্লান্তির অজুহাতে সোফায় পাশাপাশি বসে ফোন দেখার অভ্যাস দূর করা উচিত।
ডা. প্যাট্রিস লে গয় বলেন, “দুজন মিলে সপ্তাহে অন্তত একটি নির্দিষ্ট সময় বের করা উচিত যেখানে কোনো গ্যাজেট বা স্ক্রিন থাকবে না।”
যেমন: সকালের এক কাপ চা ফোন ছাড়া বারান্দায় বসে খাওয়া বা একসঙ্গে ১৫ মিনিট হাঁটাহাঁটি করা কার্যকর।
নিজের জন্য সময় বের করা: শুনতে কৃত্রিম মনে হলেও ব্যস্ত জীবনের মাঝে ক্যালেন্ডারে ‘ডেইট নাইট’ বা ‘একান্তে সময় কাটানোর’ দিন আগে থেকে ঠিক করে রাখা যেতে পারে।
বৃহস্পতিবার রাতে একসঙ্গে কোনো সিনেমা দেখা বা মাসে অন্তত একবার বাইরে খেতে যাওয়াকে অফিসের মিটিংয়ের মতোই গুরুত্ব দেওয়া উপকারী।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ
একটি দীর্ঘমেয়াদী সফল সম্পর্ক আর একটি শূন্য বা খালি সম্পর্কের মাঝের মূল পার্থক্যটি কোনো বড় উপহার বা জাদুতে লুকিয়ে নেই, এটি লুকিয়ে আছে প্রতিদিনের সচেতন প্রচেষ্টা বা ‘ইনটেনশন’-এর মধ্যে।
বাগানকে যেমন নিয়মিত পানি না দিলে তা শুকিয়ে যায়, বৈবাহিক জীবনকেও প্রতিদিন ঠিক সেভাবেই যত্ন নিতে হয়।
আরও পড়ুন
বিয়েতে সম্মতি দেওয়ার আগে যে বিষয়গুলো আলোচনা করা প্রয়োজন