Published : 24 May 2026, 05:31 PM
প্রথম প্রথম সবকিছু অন্যরকম লাগে। সকালে উঠে ফোনে একটা 'গুড মর্নিং' মেসেজ দেখলে সারাদিনটা ভালো কাটে। তার পাঠানো ভয়েস নোট বারবার শুনতে ইচ্ছে করে।
রাস্তার পাশের চায়ের দোকানটাও মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জায়গা, কারণ সে পাশে আছে।
কিছুদিন পর সেই একই মানুষ, তবে মাঝেমাঝেই বিরক্তি চলে আসে। একসময় যে অভ্যাস মিষ্টি লাগত, সেটাই এখন ভালোলাগে না।
মনে প্রশ্ন আসে, ‘সম্পর্কটা কি আগের মতো নেই? নাকি এটাই স্বাভাবিক?’
উত্তরটা হল, এটাই স্বাভাবিক। তবে এই স্বাভাবিকতাটা বুঝতে না পারলেই সমস্যা।
মস্তিষ্ক যে খেলা খেলে
প্রেমে পড়লে শরীরে আসলে একটা রাসায়নিক ঝড় বয়ে যায়। মস্তিষ্কে অক্সিটোসিনসহ বিভিন্ন হরমোন নিঃসৃত হয়, যেগুলো মানুষকে আবেগপ্রবণ ও আনন্দিত করে তোলে। এই কারণেই প্রেমের শুরুতে সবকিছু এত রঙিন লাগে।
সঙ্গীর ছোট ছোট কাজও অসাধারণ লাগে। তার প্রতিটি কথা গভীর মনে হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে মানুষের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘দ্য গটম্যান ইন্সটিটিউট’য়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে মার্কিন নৃবিজ্ঞানী ডা. হেলেন ফিশার বলেন, “ব্রেন-ইমেইজিং’ বা এমআরই করে দেখা গেছে, হানিমুন ফেইজে মানুষের মস্তিষ্কের 'রিওয়ার্ড সার্কিট' বা পুরস্কার কেন্দ্রটি সেভাবেই সক্রিয় থাকে, যেভাবে একজন কোকেন আসক্ত ব্যক্তির মস্তিষ্ক কাজ করে।”
তিনি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, “শুরুর দিকে মস্তিষ্ক অতিরিক্ত ডোপামিন নিঃসরণ করে, যা সঙ্গীর সব ত্রুটি ঢেকে রাখে। তবে ৬ মাস থেকে ২ বছরের মধ্যে মস্তিষ্ক যখন এই তীব্র রাসায়নিক হরমোনের প্রভাব থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে, তখনই মানুষের হরমোনজনিত অন্ধত্ব কেটে যায় এবং ‘ইক’ (ick) বা বিরক্তির অনুভূতি তীব্র হয়।“
'টকিং স্টেজ' — সবচেয়ে জটিল সময়
সম্পর্কের একেবারে শুরু পর্যায় এটা। যখন দুজনের মধ্যে কথা হচ্ছে, তবে সম্পর্কের কোনো নির্দিষ্ট নাম নেই তখন এই সময়টাকে বলা হয় ‘টকিং স্টেইজ’। এই পরিস্থিতি অনেকের জন্যই মানসিকভাবে ক্লান্তিকর।
একটা মেসেজ পাঠিয়ে ভাবতে হয়, ‘সে কি রিপ্লাই দেবে?’, ‘দিলে কখন দেবে?’, ‘না দিলে কি রাগ করেছে?’, এই অতিরিক্ত বিশ্লেষণের অভ্যাস অনেককেই ভোগায়।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ডা. ফারজানা রহমান দিনা বলেন, “এই পর্যায়ে সবচেয়ে বড় বিপদ হল নিজেকে হারিয়ে ফেলা। অনেকে অন্য মানুষকে বোঝার চেষ্টায় এতটাই মগ্ন হয়ে পড়েন যে নিজের পরিচয় ও মানসিক স্থিতি বজায় রাখতে ভুলে যান। আবার কেউ কেউ ওই মানুষটিকে নয়, বরং তার দেওয়া মনোযোগকে ভালোবেসে ফেলেন। মনোযোগ কমলেই মনে হয় সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।”
‘হানিমুন ফেইজ’-এর রং একদিন ফিকে হয়
সম্পর্ক একটু এগোলে আসে ‘হানিমুন ফেইজ’। সময়টা যেন ঘোরের মতো। সঙ্গীর প্রতিটি কাজ ভালোলাগে, কোনো দোষ চোখে পড়ে না। একসঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত স্মরণীয় মনে হয়।
মিডিয়াম ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের মনোবিজ্ঞানী ডা. চিভোনা চাইল্ডস বলেন, “সম্পর্কের শুরুতে ডোপামিন বা আনন্দের হরমোন এবং অক্সিটোসিনে বা প্রেমের হরমোনে ভেসে যায় মস্তিষ্ক। ফলে সঙ্গীর সবকিছু নিখুঁত মনে হয় এবং মানুষ একধরনের ঘোর বা 'মোহগ্রস্ত' অবস্থায় থাকে।”
তবে মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, “এই অবস্থাকে স্থায়ী সত্য মনে করা ভুল।”
সাধারণত ৬ মাস থেকে ২ বছর পর এই হরমোনের তীব্রতা কমতে শুরু করে। পাশাপাশি যুক্ত হয় ‘স্ট্রেস’ বা চাপের হরমোন ‘কটিসল’।
যখন এই রাসায়নিকগুলোর ভারসাম্য স্বাভাবিক হয়, তখন মস্তিষ্কের ‘কগনিটিভ বায়াস’ বা অন্ধত্ব কেটে যায় এবং সঙ্গীর সাধারণ খুঁতগুলো চোখে লাগতে শুরু করে, যাকে পপ-সাইকোলজিতে 'ইক' বলা হয়।
‘ইক ফেইজ’, যখন সব বিরক্ত লাগতে শুরু করে
‘ইক’ হল, এমন একটি অনুভূতি যেখানে সঙ্গীর কোনো নির্দিষ্ট আচরণ, যেমন- শব্দ করে খাবার খাওয়া, অদ্ভুত পোশাক পরা বা কোনো বিশেষ অঙ্গভঙ্গি ইত্যাদি হঠাৎ করেই তার প্রতি অনীহা তৈরি করায়।
দ্য গটম্যান ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে, এর পেছনে ৩টি কারণ উল্লেখ করা হয়।
বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া: হরমোনের (ডোপামিন ও অক্সিটোসিন) প্রভাব কমে আসায় মানুষটিকে কল্পনার বাইরে গিয়ে বাস্তব রূপ হিসেবে দেখা শুরু হয়।
অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা: শুরুতে মানুষ একে অপরের ভালো দিকগুলো দেখায়। সম্পর্ক যত গভীর হয়, মানুষ তত নিজের আসল অভ্যাসে ফিরে আসে।
আকর্ষণের ভারসাম্য পরিবর্তন: অন্ধ মোহ কেটে যাওয়ার পর মস্তিষ্ক , সঙ্গীর ত্রুটিগুলো বিশ্লেষণ করা শুরু করে।
‘ডিফাইনিং স্টেজ’, সম্পর্কের নাম ঠিক করার সময়
একটা সময় আসে যখন মনে প্রশ্ন জাগে, ‘আমরা আসলে কী?’ এই প্রশ্নটা অস্বস্তিকর হলেও জরুরি।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, “এই পর্যায়ে দুজনের মধ্যে খোলামেলা কথা হওয়া দরকার। ‘কমিটমেন্ট’, প্রত্যাশা, ভবিষ্যৎ- এই বিষয়গুলো নিয়ে স্পষ্টতা না থাকলে পরে ভুল বোঝাবুঝি বাড়ে। এই স্পষ্টতাটা সম্পর্ককে একটা শক্ত ভিত্তি দেয়।”
‘ইক’-এর বিভিন্ন পর্যায়
‘ডিপলিয়াঅনলাইন ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে মার্কিন মনোবিজ্ঞানী ডা. জুলিয়ান ফ্রেজিয়ার মন্তব্য করেন, “সব 'ইক' বা বিরক্তি এক নয়। এটি সামলানোর আগে এর গভীরতা বোঝা জরুরি।”
‘সার্ফেস ইক’ বা প্রাথমিক বিরক্তি: খাবার চিবানোর শব্দ, অদ্ভুত হাসির ধরণ বা ফ্যাশন সম্পর্কে ধারণা- সঙ্গীর এসব বিষয়ের ওপর বিরক্তি কাজ করা 'ক্ষতিকর নয়'। আর এসব মানিয়ে নেওয়া সম্ভব।
‘রেড ফ্ল্যাগ ইক’ বা চরম পর্যায়: অন্যের প্রতি অসম্মান, মিথ্যা বলা, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি বজায় না রাখা বা অহংকার- এই ধরনের বিষয়গুলো মানুষের মূল ব্যক্তিত্বের অংশ। আর এগুলোকে 'রেড ফ্ল্যাগ' বা সতর্কবার্তা হিসেবে গণ্য করা হয়।
সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে বিশেষজ্ঞরা দিয়েছেন ৫টি পরামর্শ
সম্পর্ক-বিষয়ক থেরাপিস্টদের মতে, এই রূপান্তরকালীন সময়ে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে পার করতে পারলে সম্পর্ক আরও মজবুত হয়।
আকর্ষণ বনাম সামঞ্জস্যতা যাচাই: গটম্যান ইন্সটিটিউটের গবেষকদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী সুখের জন্য তীব্র আবেগের চেয়ে একে অপরের সঙ্গে বোঝাপড়া এবং বন্ধুত্ব বেশি জরুরি। সঙ্গীর সঙ্গে নিজের মৌলিক জীবনবোধ মেলে কিনা তা দেখতে হবে।
সীমানা নির্ধারণ: সম্পর্কের এই পর্যায়ে খোলামেলা কথা বলে নিজেদের পছন্দ-অপছন্দ এবং ব্যক্তিগত সীমানা পরিষ্কার করে নেওয়া উচিত।
নতুনের সন্ধান: ডোপামিনের অভাব পূরণ করতে সম্পর্কে নতুনত্ব আনা উচিত। একসঙ্গে নতুন কোনো জায়গায় ঘুরতে যাওয়া বা নতুন কোনো শখ বা কাজ একসঙ্গে শুরু করা কার্যকর হতে পারে।
সরাসরি বলা: কোনও বিষয়ে বিরক্ত হলে, সেটা চেপে না রেখে শান্তভাবে সঙ্গীকে জানাতে হবে। আর তাকে পরিবর্তন করার জন্য জোর না করে, বিষয়টি আপনার কেমন লাগছে তা বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
আরও পড়ুন