Published : 25 Feb 2026, 02:54 PM
ইফতারের টেবিলে গরম গরম জিলাপি দেখলে মনটা আনচান করে ওঠে। সোনালি রংয়ের জিলাপি, চিনির সিরায় ভেজানো, কামড় দিলেই মুখে ছড়িয়ে পড়ে মধুর মিষ্টতা।
সারাদিন রোজা রাখার পর এই মিষ্টির লোভ সামলানো অনেকের পক্ষেই কঠিন হয়ে পড়ে। দুয়েক টুকরা থেকে শুরু করে প্লেট ভরে খেয়ে ফেলা— এমন ঘটনা নতুন কিছু নয়।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক চিকিৎসক ডা. আফসানা হক নয়ন সতর্ক করে বলেন, “খালি পেটে অতিরিক্ত মিষ্টি ও ভাজাপোড়া খেলে শরীর চুপ করে থাকে না। জিলাপির মতো উচ্চ চিনি ও তেলযুক্ত খাবারের লোভে পড়লে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়, যা রোজার পরের দিনগুলোকে কঠিন করে তুলতে পারে।”
রক্তের শর্করার হঠাৎ ওঠানামা
জিলাপিতে থাকে পরিশোধিত ময়দা আর প্রচুর চিনি। খালি পেটে এগুলো খেলে রক্তে গ্লুকোজ দ্রুত বেড়ে যায়। এই হঠাৎ বৃদ্ধি শরীরে ইনসুলিনের ঝড় তুলে দেয়। ফলে কিছুক্ষণ পরেই রক্তে শর্করা দ্রুত নেমে আসে।
এই ওঠানামার ফলে দেখা দেয় দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, হাত-পা কাঁপা বা অতিরিক্ত ক্ষুধার অনুভূতি।
ডা. নয়ন বলেন, “যাঁদের ডায়াবেটিস বা প্রি-ডায়াবেটিস আছে, তাঁদের জন্য এই ওঠানামা আরও ঝুঁকিপূর্ণ। রক্তে শর্করার এই অস্থিরতা রোজার বাকি দিনগুলোতে ক্লান্তি ও অস্বস্তি বাড়িয়ে দেয়।”
ওজন বৃদ্ধির আশঙ্কা
জিলাপি ডুবো তেলে ভাজা এবং চিনির সিরায় ভেজানো খাবার। একটি মাঝারি জিলাপিতে ১৫০ থেকে ২০০ ক্যালরি থাকতে পারে। লোভে পড়ে চার-পাঁচটি খেয়ে ফেললে সহজেই ৮০০ খেকে ১০০০ ক্যালরি গ্রহণ করা হয়।
রোজার দিনে সারাদিন ক্যালরি কম খাওয়ার পর ইফতারে এত ক্যালরি একসঙ্গে শরীরে ঢুকলে অতিরিক্ত চর্বি হিসেবে জমতে শুরু করে। দীর্ঘমেয়াদে এটি স্থূলতা, পেটের চর্বি বৃদ্ধি, ফ্যাটি লিভার বা উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি তৈরি করে।
ডা. নয়ন বলেন, “রমজানে অনেকে ওজন কমানোর আশা করেন। কিন্তু ভাজাপোড়া ও মিষ্টির লোভে পড়লে উল্টোটা হয়।”
হজমের সমস্যা ও অ্যাসিডিটি
সারাদিন না খেয়ে থাকার পর হঠাৎ বেশি তেল-চিনি খেলে পেটে গ্যাস, অম্বল, পেট ফাঁপা বা অস্বস্তি তৈরি হয়।
জিলাপির মতো খাবারে থাকা পরিশোধিত চিনি ও ট্রান্স ফ্যাট হজমশক্তিকে ব্যাহত করে। যাদের আগে থেকেই গ্যাস্ট্রিক বা অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সমস্যা আছে, তাদের ক্ষেত্রে উপসর্গ আরও বেড়ে যায়।
রোজার পরের দিনগুলোতে পেটের অস্বস্তি, বুকজ্বালা বা বদহজমের কারণে রোজা রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
হৃদস্বাস্থ্যের ঝুঁকি
অতিরিক্ত চিনি ও ট্রান্স ফ্যাট দীর্ঘমেয়াদে কোলেস্টেরল বাড়াতে পারে। বিভিন্ন পুষ্টি গবেষণায় দেখা গেছে— নিয়মিত অতিরিক্ত মিষ্টি খাওয়া হৃদরোগের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।
রোজার মাসে যদি প্রতিদিনই জিলাপি বা অন্য মিষ্টি বেশি খাওয়া হয়, তাহলে রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল (এলডিএল) বেড়ে যেতে পারে এবং হৃদযন্ত্রের ওপর চাপ পড়ে।
তবে সমাধানও আছে
ইফতারে জিলাপি পুরোপুরি বাদ দিতে না চাইলে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করুন। একটি ছোট টুকরাই যথেষ্ট।
এর আগে ফল, খেজুর বা পানি দিয়ে ইফতার শুরু করলে রক্তে শর্করার হঠাৎ বৃদ্ধি কিছুটা কমানো যায়।
“বাড়িতে কম তেলে বানানো বা বিকল্প স্বাস্থ্যকর মিষ্টি বেছে নেওয়াও ভালো কৌশল। বাদাম, খেজুর বা ফলের তৈরি মিষ্টি খেলে মিষ্টির লোভও মেটে এবং ক্যালরি নিয়ন্ত্রণে থাকে”- পরামর্শ দেন এই চিকিৎসক।
জিলাপি উৎসব-আনন্দের খাবার, প্রতিদিনের নয়। রমজানে লোভ সামলানোই সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্যকৌশল।
আরও পড়ুন