Published : 11 Mar 2025, 05:17 PM
শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাব হলে প্রায়ই অপ্রতিরোধ্যভাবে চিনি খাওয়ার প্রতি আকর্ষণ বাড়ে।
ব্যস্ত সময়ে, অফিসের মিটিংয়ে, ক্ষুধায় ক্লান্ত হলে শরীরে চিনি বা মিষ্টি কিছু খাওয়ার তীব্র চাহিদা তৈরি হয়। যা সাধারণ অভ্যাস মনে হলেও আসলে এর পেছনে রয়েছে কিছু বৈজ্ঞানিক কারণ।
একই সঙ্গে চিনি চাহিদা কমানোর উপায়ও রয়েছে।
যে কারণে চিনির প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, চিনি শরীরের দ্রুত শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে। মিষ্টি খাবার খাওয়ার পর, শরীরের ইনসুলিন প্রক্রিয়া সক্রিয় হয় এবং তাত্ক্ষণিকভাবে গ্লুকোজ রক্তপ্রবাহে ছড়িয়ে পড়ে। এটি মস্তিষ্ককে দ্রুত উদ্দীপিত করে।
ফলে এক ধরনের তাত্ক্ষণিক ‘পুরস্কার’ অনুভব হয়।
নিউ ইয়র্ক সিটি’র ‘এম্পায়ার এলিট ট্র্যাক ক্লাব’য়ের পুষ্টিবিদ অ্যামি স্টিফেন রিয়েলসিম্পল ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ব্যাখ্যা করেন, “চিনি শরীরের জন্য এক ধরনের তাত্ক্ষণিক শক্তির উৎস; যা মস্তিষ্কে ডোপামিনের নিঃসরণ ঘটায় এবং ভালো অনুভূতির সৃষ্টি করে। এই কারণেই চিনি খাওয়ার পর আনন্দ বা তৃপ্তির অনুভূতি পাই।”
যখন শরীরের মিষ্টির প্রয়োজনীয়তা পূর্ণ হয় তখন মস্তিষ্ক আরও চিনি খেতে উৎসাহ দেয়। এটা এক ধরনের প্রাকৃতিক প্রতিক্রিয়া, যা শরীরকে দ্রুত শক্তি সরবরাহ করার জন্য কাজ করে।
শরীরের শক্তির প্রয়োজন
শরীর খুবই প্রাকৃতিকভাবে কাজ করে এবং সব সময়ই একটি নির্দিষ্ট সমতা বজায় রাখতে চায়। সমতা রাখতে খাদ্য, পানি, ঘুম এবং অন্য প্রয়োজনীয় উপাদানগুলো সঠিকভাবে সরবরাহ প্রয়োজন।
একই প্রতিবেদনে নিউ ইয়র্ক ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘টোভ নিউট্রিশন’য়ের পুষ্টিবিদ ব্রুক লোইওয়েনস্টেইন বলেন, “যখন শরীরে এই উপাদানগুলোর কোনো একটি কমে যায়, বিশেষ করে শক্তির অভাব হয়, তখনই শরীরে চিনি বা দ্রুত হজমযোগ্য মিষ্টি খাবারের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয়।”
এটি শরীরের এক ধরনের অদৃশ্য সতর্কতা ব্যবস্থা; যার মাধ্যমে শরীর দ্রুত শক্তি পাওয়ার জন্য মিষ্টি ধরনের খাবার খেতে উদ্বুদ্ধ করে।
ঘুমের অভাব এবং চিনি খাওয়ার প্রবণতা
ঘুমের অভাবও চিনি খাওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরের শক্তি কমে যায় ফলে মিষ্টি খাওয়ার চাহিদা তৈরি হয়।
স্টিফেন বলেন, “ঘুমের অভাবে মস্তিষ্কে হরমোনের ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়। ফলে আমাদের শরীরের চিনির চাহিদা বেড়ে যায়।”
ঘুমের অভাবে ক্ষুধার অনুভূতি নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনগুলোর ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করে, যা শরীরকে বেশি চিনি খাওয়ার জন্য উদ্দীপিত করে।
মানসিক চাপ এবং চিনি খাওয়ার সম্পর্ক
মানসিক চাপও চিনি খাওয়ার প্রবণতাকে বাড়িয়ে দেয়।
মানসিকভাবে চাপ অনুভব করলে শরীরের মধ্যে কর্টিসল (স্ট্রেস হরমোন) বাড়ে। এই হরমোন শরীরকে দ্রুত শক্তি পাওয়ার জন্য চিনি খাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করে।
‘স্ট্রেস’ বা চাপ মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণের মাধ্যমেও মিষ্টি বা অতিরিক্ত চিনি খাওয়ার প্রতি আকর্ষণ তৈরি করে।
ফলে চাপের সময়ে অনেকের মধ্যেই মিষ্টি বা চকলেট খেয়ে আত্মবিশ্বাস এবং ভালো অনুভূতি লাভ করতে চাওয়ার প্রবণতা বাড়ে।
পুষ্টি বিশেষজ্ঞ ব্রুক লোইওয়েনস্টেইন বলেন, “মানসিক চাপ বা উদ্বেগের সময় শরীর অতিরিক্ত চিনির চাহিদা অনুভব করে, কারণ মিষ্টি খাবার তাত্ক্ষণিকভাবে ভালো অনুভূতি দেয় এবং চাপের প্রভাব থেকে সাময়িক মুক্তিও দেয়।”
পানিশূন্যতা ও চিনির চাহিদা
অনিয়মিতভাবে বা পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান না করা থেকেও একই ধরনের ইচ্ছার সৃষ্টি হয়।
পানি হল শরীরের বিশেষ করে মাংসপেশির শক্তির উৎস। শরীর পানির অভাবে ভুগলে শক্তি তীব্রভাবে কমে যায়। পানিশূন্যতা অনেক সময় ক্ষুধার মতো অনুভূত হতে পারে, যা চিনির প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি করে।
চিনি খাওয়া কমানোর উপায়
কার্বস সীমিত না করা: শরীরে কার্বোহাইড্রেইটস’য়ের সরবরাহ কমানো যাবে না। বিশেষ করে ব্যায়াম করলে কার্বস সীমিত করা যাবে না।
শরীরে শক্তির জন্য কার্বস প্রয়োজন। তখন এমন কিছু কার্বস বেছে নেওয়া দরকার যা অতিরিক্ত পুষ্টি সরবরাহ করে। যেমন- আঁশ, ভিটামিন এ এবং প্রোটিন।
মিষ্টি আলু, সাদা আলু, ওটমিল, বাদামি চাল অথবা তাজা ফলের মধ্যে স্বাস্থ্যকর কার্বস থাকে।
সুষম খাবার: মিশ্র খাবার খাওয়ার চেষ্টা করতে হবে; যাতে কার্বস, প্রোটিন এবং কিছু ফ্যাট বা চর্বি আছে।
যারা প্রতিদিন এক ঘণ্টা ব্যায়াম করেন, তাদের জন্য এই তিনটি ‘ম্যাক্রোনিউট্রিয়েন্টেস’য়ের তিনভাগের একভাগ পরিমাণে সমন্বয় করা গুরুত্বপূর্ণ, যাতে ক্ষুধা কমে এবং চিনি খাওয়ার প্রবণতা হ্রাস পায়।
কঠিন ব্যায়ামের পরে এক ঘণ্টার মধ্যে খাবার খাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যাতে শক্তি পুনরুদ্ধার শুরু হয় এবং রক্তে চিনির স্তর স্বাভাবিক থাকে।
গুণগত মানের ঘুম: ক্লান্ত থাকলে চিনি খাওয়ার ইচ্ছা বাড়ে। বাজে ঘুম স্ট্রেস বাড়ায় এবং ঘ্রেলিন বা ক্ষুধার হরমোনের স্তর বৃদ্ধি করে।
অপর্যাপ্ত ঘুমে কারণে ‘লেপ্টিন’ বা সন্তুষ্ট হওয়ার হরমোনের মাত্রাও কমিয়ে দেয়। ফল পূর্ণতার অনুভূতি কাজ করে না ঠিক মতো। যে কারণে মিষ্টি খাবারের চাহিদা বাড়ে।
তাই প্রতি রাতে সাত থেকে নয় ঘণ্টা গুণগত মানের ঘুম প্রয়োজন।
ঘুমের জন্য একটি নির্দিষ্ট রুটিন তৈরি করা দরকার। যেমন- ঘুমানোর আগে ডিজিটাল পর্দার ব্যবহার এড়িয়ে চলা, একটি নিদিষ্ট রুটিন মানা এবং বিকালে ক্যাফিন কম গ্রহণ করতে হবে।
আর্দ্র থাকা: প্রতিদিন শরীরের ওজনের অর্ধেক (পাউন্ডে) আউন্স হিসেবে পানি পান করার চেষ্টা করতে হবে। খাবারের আগে পানি পান ভালো। এতে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে থাকে। সারাদিনই পরিমাণ মতো পানি গ্রহণ করলে চিনির প্রতি আকর্ষণ কমাতেও সহায়ক।
ব্যায়াম: ব্যায়ামে পেশি শক্তিশালী হয়। সুগঠিত পেশি চিনির ক্ষুধা কমাতে সাহায্য করে।
‘স্ট্রেন্থ ট্রেনিং’ ইনসুলিনের প্রতি সংবেদনশীলতা উন্নত করে। মানে হল- শরীর কার্বোহাইড্রেইটস’য়ের প্রতি আরও ভালোভাবে প্রক্রিয়া করতে পারে। আর চিনি খাওয়ার ইচ্ছা কমিয়ে দেয়।
সপ্তাহে দুই থেকে চার বার ‘স্ট্রেন্থ ট্রেনিং’ করা ভালো এবং খাবারের পরে হাঁটাহাঁটি করলেও রক্তে চিনির স্তর নিয়ন্ত্রণে থাকে।
নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খাবার খাওয়া
যতটা সম্ভব নিয়মিত সময় অনুসারে খেতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়ার অভ্যাস শরীরকে গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি ঠিক সময়ে শোষণ করতে সাহায্য করে।
এছাড়া ত্বকের মেরামত, নখের বৃদ্ধি, এবং বিপাক ঠিক রাখতেও এ অভ্যাস বেশ সহায়ক।
আরও পড়ুন