Published : 03 Jun 2026, 05:41 PM
মজবুত হাড়ের জন্য ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ‘ডি’-র পাশাপাশি প্রোটিন, ম্যাগনেসিয়াম, পটাসিয়াম এবং ভিটামিন ‘কে’ অপরিহার্য পুষ্টি উপাদান।
চিকিৎসাবিজ্ঞান সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’ এবং ‘হার্ভার্ড হেলথ পাবলিশিং’-এ প্রকাশিত একাধিক গবেষণায়, হাড়ের সুরক্ষায় পুষ্টির বহুমুখী ভূমিকার কথা তুলে ধরেছেন।
কেবল ক্যালসিয়াম নয়, বরং সামগ্রিক একটি সুষম খাদ্যাভ্যাস বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত ‘ফ্র্যাকচার’ বা হাড় ভাঙার ঝুঁকি থেকে মানুষকে রক্ষা করতে পারে।
মজবুত হাড়ের গোপন চাবিকাঠি
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের কাঠামো বা হাড় ক্ষয় হতে শুরু করে। সাধারণ ধারণা হচ্ছে, প্রচুর ক্যালসিয়াম খেলেই হাড় শক্ত থাকে।
তবে ‘দ্য ল্যানসেট ডায়াবেটিস অ্যান্ড এন্ডোক্রাইনোলজি’তে প্রকাশিত একটি সমন্বিত বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভিন্ন কথা।
তাদের মতে, হাড় চিরকাল মজবুত রাখতে ক্যালসিয়ামের সঙ্গে আরও বেশ কিছু মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট বা ক্ষুদ্র পুষ্টি উপাদানের গভীর সংযোগ রয়েছে।
ক্যালসিয়ামের 'ম্যানেজার' ভিটামিন ‘ডি’ এবং ‘কে’
হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল-এর গবেষক ডা. ক্লিফোর্ড জে. রোজেন, এক প্রতিবেদনে জানান, শরীরে পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম থাকলেও তা হাড়ের কাজে আসবে না। যদি না সেখানে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি থাকে।
ভিটামিন ডি অন্ত্র থেকে ক্যালসিয়াম শোষণ করতে সাহায্য করে।
একই সঙ্গে, দক্ষিণ আফ্রিকার ফার্মাসিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের বিজ্ঞান সাময়িকী এসএ ফার্মাসিস্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট-এ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ভিটামিন 'কে' (বিশেষ করে ভিটামিন কে-২) হাড়ের ম্যাট্রিক্সে ক্যালসিয়ামকে শক্তভাবে ধরে রাখতে সাহায্য করে।
এর অভাবে হাড়ের খনিজের ঘনত্ব বা ‘বোন মিনারেল ডেনসিটি’ মারাত্মকভাবে কমে যায়।
হাড়ের ৫০ শতাংশ গঠনই প্রোটিন
আয়তনের দিক থেকে হাড়ের প্রায় ৫০ শতাংশই তৈরি হয় প্রোটিন দিয়ে।
ডা. রোজেন সতর্ক করে বলেন, “যদি শরীরে প্রোটিনের ঘাটতি থাকে তবে পেশি, ত্বক বা হাড় কোনোটিই সঠিকভাবে পুনর্গঠন করতে পারবেন না।”
প্রোটিন হাড়কে স্থিতিস্থাপকতা দেয়। ফলে হঠাৎ আঘাতেও হাড় সহজে ভেঙে যায় না।
ম্যাগনেসিয়াম ও পটাসিয়ামের জাদু
আমেরিকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ (এনআইএইচ)-এর অধীনে সংরক্ষিত গবেষণাপত্র পাবমেড সেন্ট্রাল (পিএমসি)-এর একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ম্যাগনেসিয়াম এবং ফসফরাস হাড়ের বিপাক প্রক্রিয়ায় সরাসরি অংশ নেয়।
ম্যাগনেসিয়ামের অভাবে হাড় ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, পটাসিয়াম শরীরকে অতিরিক্ত অম্লীয় বা অ্যাসিডিক হওয়া থেকে রক্ষা করে। ফলে প্রস্রাবের মাধ্যমে হাড়ের ক্যালসিয়াম ধুয়ে বের হয়ে যেতে পারে না।
বিশেষজ্ঞরা যে ধরনের খাবার খেতে বলেন
ল্যানসেট এবং হার্ভার্ডের গবেষকরা কৃত্রিম সাপ্লিমেন্ট বা ওষুধের চেয়ে প্রাকৃতিক খাবারকে বেশি প্রাধান্য দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। হাড়ের সুরক্ষায় খাদ্য তালিকায় থাকতে হবে বিভিন্ন ধরনের খাবার।
দ্য মেডিটেরিয়ান ডায়েট: ফলমূল, শাকসবজি এবং ফারমেন্টেড বা গাঁজন করা দুগ্ধজাত খাবারম, যেমন- টকদই, হাড়ের জন্য উপকারী। দৈনিক অন্তত পাঁচ পরিবেশন (servings) ফল ও সবজি না খেলে ‘হিপ ফ্র্যাকচার’ বা নিতম্বের হাড় ভাঙার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
দুই ধরনের খাবার মিলিয়ে খাওয়া: সার্ডিন মাছ, কাঁটাযুক্ত স্যামন মাছ এবং বিভিন্ন ধরনের শুঁটি (শিম বা মটরশুঁটি ধরনের খাবার) একই সঙ্গে ক্যালসিয়াম ও প্রোটিনের জোগান দেয়।
উদ্ভিজ্জ উৎস: যারা দুধ খেতে পারেন না, তারা ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ কমলালেবুর জুস, আমন্ড বা কাঠবাদাম এবং টফু খেতে পারেন।
বয়স ভিত্তিক হাড়ের পুষ্টি ও খাবারের নির্দেশিকা
আমেরিকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ (এনআইএইচ) এবং হার্ভার্ড টি.এইচ. চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথ-এর পুষ্টি নির্দেশিকা অনুযায়ী, বয়সভেদে প্রয়োজনীয় খাবার ও পুষ্টির বিন্যাস আলাদা হয়।
শৈশব ও কৈশোর (১ থেকে ১৮ বছর): হাড় গঠনের স্বর্ণযুগ
এই বয়সে 'পিক বোন ম্যাস' বা হাড়ের সর্বোচ্চ ঘনত্ব তৈরি হয়। তাই ক্যালসিয়াম ও প্রোটিনের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে।
পুষ্টির দৈনিক চাহিদা: ক্যালসিয়াম ১,০০০ থেকে ১,৩০০ মিলিগ্রাম, ভিটামিন ডি ৬০০ আইইউ।
উৎস
দুগ্ধজাত খাবার: দুধ, পনির, এবং ছানা বা টকদই (ক্যালসিয়াম ও প্রোটিনের সবচেয়ে বড় উৎস)।
সবুজ শাকসবজি: ব্রকলি, বাঁধাকপি ও ঢ্যাঁড়শ। এগুলো থেকে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ‘কে’ মিলবে।
বাদাম ও বীজ: কাঠবাদাম এবং চিয়া বীজ।
তরুণ ও মধ্যবয়স (১৯ থেকে ৫০ বছর): হাড়ের ক্ষয় রোধের সময়
এই বয়সে হাড়ের গঠন সম্পন্ন হয়ে যায়, তাই উদ্দেশ্য থাকে হাড়ের ক্ষয়ের গতি ধীর করা।
পুষ্টির দৈনিক চাহিদা: ক্যালসিয়াম ১,০০০ মিলিগ্রাম, ভিটামিন ডি ৬০০ আইইউ।
উৎস
সামুদ্রিক ও চর্বিযুক্ত মাছ: টুনা, স্যামন ও সার্ডিন মাছ (কাঁটাসহ)। এগুলো ভিটামিন ডি, ওমেগা-থ্রি এবং প্রোটিনের চমৎকার উৎস।
উদ্ভিদভিত্তিক প্রোটিন ও ক্যালসিয়াম: সয়াবিন, টফু এবং ডাল বা শিমধর্মী খাবার।
ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার: পালংশাক, কাজুবাদাম এবং পূর্ণশষ্য, যেমন- লাল চাল ও আটা।
প্রবীণ বয়স (৫১ বছর এবং তদূর্ধ্ব): হাড় ফাটল ও হাড় ভঙ্গুরতা প্রতিরোধের সময়
বয়স ৫০ পার হলে বিশেষ করে নারীদের মেনোপজের পর হাড়ের ঘনত্ব দ্রুত কমতে থাকে। এই বয়সে অন্ত্রের পুষ্টি শোষণ ক্ষমতা কমে যায়, তাই খাবারের দিকে বাড়তি নজর দিতে হয়।
পুষ্টির দৈনিক চাহিদা: ক্যালসিয়াম ১,২০০ মিলিগ্রাম, ভিটামিন ডি ৮০০ আইইউ।
উৎস
সহজে হজমযোগ্য ক্যালসিয়াম: ফোর্টিফাইড বা পুষ্টি-সমৃদ্ধ কমলার জুস, সয়া মিল্ক এবং ওটমিল।
ভিটামিন ‘কে’ এবং পটাসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার: রান্না করা ব্রকলি, ব্রাসেলস স্প্রাউট এবং কলা। হার্ভার্ড হেলথ পাবলিশিং-এর তথ্যানুসারে, এক কাপ কাঁচা পালংশাক বা এক বাটি ব্রকলি প্রবীণদের দৈনিক ভিটামিন ‘কে’-র চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট।
ডিম এবং কলিজা: ভিটামিন ডি-র সীমিত প্রাকৃতিক খাদ্য উৎসের মধ্যে ডিমের কুসুম এবং গরুর কলিজা অন্যতম।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
ইউ.এস. প্রিভেন্টিভ সার্ভিসেস টাস্ক ফোর্স এবং হার্ভার্ডের পুষ্টিবিজ্ঞানীরা জোর দিয়ে বলেছেন, কৃত্রিম ক্যালসিয়াম ট্যাবলেটের চেয়ে খাবার থেকে পাওয়া ক্যালসিয়াম শরীরের জন্য বেশি নিরাপদ এবং কার্যকর।
তাই সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
দ্য ল্যানসেট-এর গবেষকরা একটি চমকপ্রদ তথ্য সামনে এনেছেন। সেটা হল, আমাদের অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া বা 'গাট মাইক্রোবায়োটা' হাড়ের পুষ্টি শোষণে বড় ভূমিকা রাখে। একটি সুষম খাবার তালিকা অন্ত্রের পরিবেশ ভালো রাখে, যা পরোক্ষভাবে হাড়কে মজবুত করে।
পাশাপাশি, চিকিৎসকদের স্পষ্ট হুঁশিয়ারি হল- দিনে ৩ কাপের বেশি অ্যালকোহল গ্রহণ, অতিরিক্ত ধূমপান এবং অলস বসে থাকার অভ্যাস, হাড়ের পুষ্টি শোষণ করার ক্ষমতাকে ধ্বংস করে দেয়।
তাই মজবুত হাড়ের জন্য সঠিক পুষ্টির সঙ্গে প্রয়োজন নিয়মিত ব্যায়াম ও সক্রিয় জীবনযাপন।
আরও পড়ুন