Published : 24 Jun 2026, 04:04 AM
আয়ারল্যান্ডের মোনাগান কাউন্টির ছোট্ট এক গ্রাম ‘ইনিসকিন’। সেখানে আজও কেউ যখন আড্ডা জমান, তখন একজন গোলকিপারের গল্প ওঠে। তবে সেই গল্প কোনো অসাধারণ সেভ বা বীরত্বের নয়, বরং হাস্যরস, খামখেয়ালিপনা ও কবিত্বের।
১৯৩১ সালের এক ফুটবল ফাইনাল ম্যাচ। খেলা চলছে, মাঠের মাঝখানে গণ্ডগোল শুরু হয়েছে। ঠিক সেই সুযোগে নিজের গোলপোস্ট অরক্ষিত রেখে মাঠ থেকে চম্পট দিলেন গোলকিপার। মিনিট দশেক পর যখন ফিরে এলেন, দেখা গেল তার হাতে এক কাপ আইসক্রিম! আর ততক্ষণে প্রতিপক্ষ দল ফাঁকা পোস্টে গোল দিয়ে ট্রফি জিতে নিয়েছে।
সেই ‘অভাগা’ গোলকিপার আর কেউ নন, তিনি বিংশ শতাব্দীর আয়ারল্যান্ডের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি প্যাট্রিক ক্যাভানা। ফুটবল মাঠের সেই খামখেয়ালি তরুণই যে একদিন আইরিশ সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কণ্ঠ হয়ে উঠবেন, তা সেদিন কেউ ভাবেনি। ক্যাভানার ফুটবল মাঠ থেকে সাহিত্যের চূড়ায় ওঠার এই গল্প যেমন মজার, তেমনই অনুপ্রেরণার।
১৯০৪ সালে আয়ারল্যান্ডের এক গরিব পরিবারে জন্ম ক্যাভানার। পড়াশোনায় মন ছিল না, ১৩ বছর বয়সেই স্কুল ছেড়ে বাবার মুচির দোকানে কাজ শুরু করেন। তবে তার আসল নেশা ছিল দুটি- ফুটবল আর কবিতা। লম্বা চওড়া শরীর ছিল বলে স্থানীয় ক্লাব ‘ইনিসকিন রোভার্স’-এর গোলকিপার হিসেবে তার বেশ নামডাক হয়েছিল।
তবে খেলোয়াড় হিসেবে তিনি ছিলেন বেশ অদ্ভুত স্বভাবের। মাঠের মধ্যে গোলপোস্টে দাঁড়িয়েই তিনি ‘প্লেয়ার্স’ ব্র্যান্ডের কড়া সিগারেট টানতেন। মাঝেমধ্যে খেলা বাদ দিয়ে গোলপোস্টের পেছনে থাকা দর্শকদের সঙ্গে গল্প জুড়ে দিতেন।
১৯৩১ সালের অগাস্ট মাস। মোনাগান কাউন্টি ফাইনালের সেই ঐতিহাসিক দিন। প্রতিপক্ষ ছিল ‘ল্যাটন ক্লাব’। খেলার মাঝপথে দর্শকদের হট্টগোলের কারণে রেফারি খেলা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখেন। সবাই যখন মাঠের গোলমাল মেটাতে ব্যস্ত, ক্যাভানা তখন ভাবলেন এই ফাঁকে একটু জিরিয়ে নেওয়া যাক। তিনি সোজা মাঠ থেকে বেরিয়ে গেলেন।
কিছুক্ষণ পর রেফারি যখন খেলা শুরুর বাঁশি বাজালেন, দেখা গেল ইনিসকিনের গোলপোস্ট একদম ফাঁকা! ল্যাটনের খেলোয়াড়রা এই সুযোগ হাতছাড়া করেনি। তারা একটা গোল দিয়ে ম্যাচ জিতে নিল।
পরে যখন ক্যাভানাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল তিনি কোথায় গিয়েছিলেন, তিনি নাকি আয়েশ করে বলেছিলেন, “আইসক্রিম কিনতে!” যদিও পরে ইতিহাসবিদরা বলেছেন, সেই গ্রামে ওই সময়ে আইসক্রিম পাওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। সম্ভবত তিনি বিরক্ত হয়ে জল খেতে বা স্রেফ হাওয়া খেতে মাঠ ছেড়েছিলেন। কিন্তু ‘আইসক্রিম’-এর সেই মিথ বা গল্পটি আয়ারল্যান্ডের মানুষের মনে এমনভাবে গেঁথে গেছে যে, আজও লোকে তাকে নিয়ে হাসাহাসি করে।
ফুটবল মাঠে ক্যাভানার কীর্তি শুধু ওটুকুই নয়। ১৯৩২ সালে তিনি যখন ক্লাবের সেক্রেটারি আর কোষাধ্যক্ষ, তখন তার বিরুদ্ধে ক্লাবের টাকা চুরির অভিযোগ ওঠে। টিকিট বিক্রির টাকা তিনি ব্যাংকে না রেখে নিজের বিছানার নিচে সুটকেসে জমিয়ে রাখতেন আর সেখান থেকে মাঝেমধ্যে নিজের সিগারেটের খরচ চালাতেন। ধরা পড়ার পর তাকে ক্লাব থেকে বের করে দেওয়া হয়।
এই ঘটনাই যেন তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল। গ্রাম্য রাজনীতির নোংরামি আর দারিদ্র্য থেকে বাঁচতে ১৯৩৯ সালে তিনি প্রায় ৮০ মাইল পথ পায়ে হেঁটে আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিনে চলে এলেন। সঙ্গে ছিল শুধু একটা লাঠি আর মনে এক বুক কবিতা।
সেই সময়ে আয়ারল্যান্ডের সাহিত্য মানেই ছিল রূপকথা, আধ্যাত্মিকতা বা গ্রামীণ জীবনের খুব সুন্দর এক কাল্পনিক ছবি। বড় বড় কবিরা লিখতেন যে আয়ারল্যান্ডের গ্রামের মানুষ খুব সুখে আছে। কিন্তু ক্যাভানা জানতেন আসল চিত্রটা আলাদা। তিনি কলম ধরলেন বাস্তবের কথা লিখতে।
১৯৪২ সালে প্রকাশিত হলো তার দীর্ঘ কবিতা ‘দ্য গ্রেট হাঙ্গার’। এটি ছিল আইরিশ সাহিত্যের বড় এক ধাক্কা। তিনি দেখালেন, গ্রামের কৃষকদের জীবন শুধু লাঙল আর মাটির নয়; সেখানে আছে চরম একঘেয়েমি, একাকিত্ব আর দারিদ্র্যের জ্বালা। তার কবিতায় উঠে এল এমন এক আয়ারল্যান্ড, যা আগে কেউ দেখানোর সাহস করেনি। সমালোচকরা তার লেখাকে ‘অশোধিত’ বা ‘বড্ড কর্কশ’ বলতেন, কিন্তু সাধারণ মানুষ তাতে নিজেদের জীবনের প্রতিফলন দেখতে পেল।
এরপর ১৯৪৮ সালে বের হলো তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘টারি ফ্লিন’। এটি ছিল অনেকটা তার নিজের জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। গ্রামের এক তরুণ যে কবি হতে চায়, কিন্তু তার মা আর সমাজের চাপে সে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। এই উপন্যাসটি প্রথমে আয়ারল্যান্ডে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, কিন্তু পরে এটিই ক্লাসিকের মর্যাদা পায়।
ক্যাভানার একটা অদ্ভুত দর্শন ছিল। তিনি মনে করতেন, বিশ্ববিখ্যাত হওয়ার জন্য খুব বড় বড় বিষয় নিয়ে লেখার দরকার নেই। নিজের পাড়া বা গ্রাম নিয়ে লিখলেই তা মহাকাব্য হয়ে উঠতে পারে। তার ‘এপিক’ কবিতায় তিনি লিখেছিলেন গ্রামের দুই কৃষকের সামান্য এক টুকরো জমি নিয়ে ঝগড়ার কথা। সেই ঝগড়া দেখে তার মনে হয়েছিল এটি খুবই তুচ্ছ।
কিন্তু তিনি কল্পনা করলেন, প্রাচীন গ্রিসের মহাকবি হোমার তার কানে এসে বলছেন, “আমি যে ‘ইলিয়াড’ লিখেছিলাম, সেটার শুরুও হয়েছিল এমন ছোট ছোট গ্রাম্য ঝগড়া থেকেই।” এই দর্শনটি আমাদের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও খুব প্রাসঙ্গিক। আমাদের গ্রাম্য বিবাদ বা সাধারণ মানুষের জীবনও যে সাহিত্যের বড় উপাদান হতে পারে, ক্যাভানা তা বহু আগেই প্রমাণ করে গেছেন।
প্যাট্রিক ক্যাভানার নাম শুনলে আয়ারল্যান্ডে যে কবিতাটির কথা সবার আগে মনে আসে, তা হলো ‘অন রাঘলান রোড’। ক্যাথরিন ব্যারি মলোনি নামে এক বিদুষী নারীর প্রেমে পড়েছিলেন তিনি। কিন্তু বয়সের পার্থক্য আর ক্যাভানার অগোছালো জীবনের কারণে সেই প্রেম টেকেনি। সেই বিরহ থেকেই জন্ম নিয়েছিল এই কালজয়ী কবিতা। আজ এটি আয়ারল্যান্ডের অন্যতম জনপ্রিয় একটি গান। আয়ারল্যান্ডের পাবগুলোতে আজও মানুষ গলা ছেড়ে এই গানটি গায়।
ক্যাভানার ব্যক্তিগত জীবন ছিল সংগ্রামের। ডাবলিনের অভিজাত লেখক সমাজ তাকে সারাজীবন ‘চাষি কবি’ বলে অবজ্ঞা করেছে। টাকার অভাবে তাকে অনেক সময় না খেয়ে থাকতে হয়েছে। ১৯৫৪ সালে ক্যান্সারে তার একটি ফুসফুস বাদ যায়। সুস্থ হওয়ার পর তিনি ডাবলিনের গ্র্যান্ড ক্যানালের পাড়ে বসে জীবনের সবচেয়ে শান্ত আর সুন্দর কবিতাগুলো লিখেছিলেন।
১৯৬৭ সালে এই খামখেয়ালি জাদুকর যখন মারা যান, তখন তিনি আয়ারল্যান্ডের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে স্বীকৃত। ডাবলিনের ক্যানাল পাড়ে আজ তার একটি ব্রোঞ্জমূর্তি বসানো হয়েছে। সেখানে তিনি একা এক বেঞ্চে বসে আছেন, যেন একান্তে কোনো কবিতার লাইন ভাবছেন। ফ্লোরিডার ডিজনিল্যান্ডেও তার একটি ভাস্কর্য আছে।
সূত্র: দ্য আইরিশ নিউজ, প্যাট্রিক ক্যাভানা সেন্টার।