Published : 22 Jun 2026, 05:31 PM
ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং ক্যালোরি পোড়ানোর জন্য অনেকেই তাদের ‘মেটাবলিজম’, অর্থাৎ বিপাক প্রক্রিয়া বা হজমশক্তি দ্রুত করতে চান।
তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভিডিওগুলোতে বিষয়টিকে যতটা সহজ দাবি করা হয়, বাস্তবে ততটা সহজ নয়।
এই বিষয়ে সেল্ফ ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে, মার্কিন চিকিৎসক ডায়ানা হুয়াং বলেন, “আসল সত্যিটা হল, মেটাবলিজম বাড়ানোর এই সব ‘হ্যাকস’ বা চটকদার উপায়ের পেছনে তেমন কোনো জোরালো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। আর যেগুলোর সামান্য প্রমাণ আছে, তাও ওজন কমাতে তেমন বড় কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না।”
মেটাবলিজম বা বিপাক প্রক্রিয়া উন্নত করার আসল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে দৈনন্দিন কিছু সাধারণ অভ্যাসের মধ্যে, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের জন্য দারুণ উপকারী।
মেটাবলিজম আসলে কী?
সহজ কথায় বলতে গেলে, বেঁচে থাকার এবং শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সচল রাখতে যে রাসায়নিক প্রক্রিয়াগুলো অনবরত কাজ করে, সেটাই হল মেটাবলিজম বা বিপাক প্রক্রিয়া।
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যামিলি মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং স্থূলতা রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জোনাথন গ্যাবিসন, একই প্রতিবেদনে বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করে বলেন, “মেটাবলিজম বা বিপাক প্রক্রিয়া হলো আমাদের শরীর ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে সচল রাখার জন্য অনবরত চলতে থাকা সমস্ত রাসায়নিক প্রক্রিয়ার সমষ্টি।"
এটি খাবারকে শক্তিতে রূপান্তর করে। এই শক্তি ব্যবহার করেই হৃদ্-পিণ্ড ও ফুসফুস সচল থাকে এবং হরমোন নিয়ন্ত্রিত হয়।
যেমন, বিপাক প্রক্রিয়া থেকে তৈরি শক্তির প্রায় ২০ শতাংশ খরচ হয় মস্তিষ্কের কার্যকারিতা সচল রাখতে। যার মেটাবলিজম যত দ্রুত, তার শরীর তত দ্রুত ক্যালোরি পোড়াতে পারে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়।
মেটাবলিজম কি সত্যিই বাড়ানো যায়?
সংক্ষেপে উত্তর হল— হ্যাঁ, অবশ্যই যায়। মেটাবলিজম বংশগত কারণ, বয়স বা ওজনের ওপর নির্ভর করলেও, এটি স্থায়ী বা নির্দিষ্ট কোনো বিষয় নয়।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ ও আচরণগত বিজ্ঞান বিভাগের ক্লিনিকাল সহযোগী অধ্যাপক এবং বিশ্বের প্রথম ‘অ্যাকাডেমিক মেটাবলিক সাইকিয়াট্রি ক্লিনিকাল প্রোগ্রাম’-এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ডা. শেবানি শেঠি বলেন, “মানুষের মেটাবলিজম বা হজমশক্তি মোটেও স্থায়ী বা নির্দিষ্ট কোনো বিষয় নয়। এটি অত্যন্ত পরিবর্তনশীল এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করার মাধ্যমে একে ইতিবাচকভাবে বদলে ফেলা সম্ভব।”
তবে এজন্য কোনো ‘ম্যাজিক সাপ্লিমেন্ট’ বা অ্যাপল সাইডার ভিনেগার কাজ করবে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী কিছু নিয়মতান্ত্রিক অভ্যাস।
বিজ্ঞানীদের মতে মেটাবলিজম বা বিপাপ উন্নত করার ৫টি পরীক্ষিত উপায় হল-
শারীরিক সক্রিয়তা বা হাঁটাচলা বাড়ানো
যখনই শরীর নাড়াচাড়া করানো হয়, তখনই ক্যালোরি পোড়ে এবং মেটাবলিজম বাড়ে। দৈনিক শক্তির দুই-তৃতীয়াংশ খরচ হয়, শুধু বেঁচে থাকার মৌলিক কাজগুলোতে। বাকি অংশ খরচ হয় খাবার হজম করতে ও হাঁটাচলাতে।
তাই শুধু জিমে বা ব্যায়ামাগারে গিয়ে ব্যায়াম করাই শেষ কথা নয়, লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করা, পোষা প্রাণীকে নিয়ে হাঁটা, বাগানের কাজ বা ঘরের টুকটাক কাজ করলেও মেটাবলিজম বাড়ে।
স্ট্রেন্থ ট্রেইনিং বা পেশি গঠন
ভারোত্তোলন বা পেশি গঠনের ব্যায়াম করলে শরীরের চর্বি কমে এবং মাংসপেশীর ভর বাড়ে। মাংসপেশি চর্বির চেয়ে বেশি ‘মেটাবলিক্যালি’ সক্রিয়।
অর্থাৎ, শরীরে পেশির পরিমাণ বেশি থাকলে, বিশ্রামের সময়ও বেশি ক্যালোরি পোড়াতে সাহায্য করে। এছাড়া এটি রক্তে শর্করার মাত্রা বা ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণ করতেও সাহায্য করে।
বিশেষজ্ঞরা সপ্তাহে অন্তত দুই দিন স্ট্রেন্থ ট্রেনিং করার পরামর্শ দেন।
এই বিষয়ে ডা. জোনাথন গ্যাবিসন আরও সতর্ক করে বলেন, "স্ট্রেন্থ ট্রেনিং বা পেশি গঠনের ব্যায়ামের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। তাই এমন সব ব্যায়াম বা ওয়ার্কআউট বেছে নেওয়া উচিত যা নিয়মিত করতে পারবেন এবং শুরুতেই শরীরকে অতিরিক্ত চাপ দিয়ে আঘাতের ঝুঁকিতে ফেলা যাবে না।"

পর্যাপ্ত প্রোটিন খাওয়া
খাবারের পুষ্টি উপাদানগুলোর মধ্যে প্রোটিন হজম করতে শরীরের সবচেয়ে বেশি শক্তি বা ক্যালোরি খরচ হয়। একে বলা হয় ‘থার্মিক ইফেক্ট’।
এছাড়া প্রোটিন খেলে দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা থাকে, যা বারবার খাওয়ার অকাল ক্ষুধা বা ক্রেভিং কমায়।
তবে প্রোটিন খাওয়ার ক্ষেত্রেও ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং হরমোন বিশেষজ্ঞ (এন্ডোক্রিনোলজিস্ট) ডা. সান কিম বলেন, "বেশিরভাগ মানুষই স্বাভাবিক খাওয়া-দাওয়ার মাধ্যমে প্রতিদিন শরীরবৃত্তীয় কাজের জন্য পর্যাপ্ত প্রোটিন পেয়ে যান। অতিরিক্ত প্রোটিন খেলেই যে জাদুর মতো মেটাবলিজম বেড়ে যাবে— এমনটা ভাবা ভুল। উল্টো অতিরিক্ত প্রোটিন কিছু ক্ষেত্রে ইনসুলিনের কার্যকারিতা বা সংবেদনশীলতা কমিয়ে দিতে পারে।"
একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতি কেজি ওজনের জন্য দৈনিক ০.৮ গ্রাম প্রোটিন গ্রহণ করাই যথেষ্ট।
মানসম্মত ঘুম
মেটাবলিজম ঠিক রাখার জন্য ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও, অনেকেই একে অবহেলা করেন।
ঘুমের অভাব মেটাবলিজমকে এলোমেলো করে দেয়। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে এবং পরের দিন তীব্র ক্ষুধা লাগে।
নিয়মিত পর্যাপ্ত না ঘুমালে স্থূলতা, টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বহুলাংশে বেড়ে যায়।
চিকিৎসকদের মতে, সুস্থ থাকতে প্রতি রাতে ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা মানসম্মত ঘুম প্রয়োজন।
মানসিক চাপ বা স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণ
দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ শরীরে ‘কর্টিসল’ বা স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এই কর্টিসল হরমোন শরীরের মাংসপেশি ভেঙে ফেলে এবং মেটাবলিজম ধীর করে দেয়।
মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য নিয়মিত ইয়োগা বা যোগব্যায়াম, ধ্যান, ডায়েরি লেখা কিংবা প্রকৃতির মাঝে কিছুটা সময় কাটানো উচিত।
মোদ্দা কথা হল
মেটাবলিজম বা বিপাক প্রক্রিয়া উন্নত করার মানে শুধু চর্বি বা ক্যালোরি পোড়ানো এবং ওজন কমানো নয়। এটি আসলে সামগ্রিক ‘মেটাবলিক স্বাস্থ্য’কে ভালো রাখে। এর মধ্যে রক্তচাপ, কোলেস্টেরল এবং ইনসুলিন সংবেদনশীলতাও অন্তর্ভুক্ত।
তাই কোনো জাদুকরী বা চটকদার কৌশলের পেছনে না ছুটে, প্রতিদিনের জীবনধারায় ছোট ছোট ইতিবাচক পরিবর্তন আনাই সুস্থ থাকার আসল উপায়।
আরও পড়ুন
মোবাইল ব্যবহার না ছেড়েও জীবনে পরিবর্তন সম্ভব