১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

নারীদের যে কারণে পুরুষের চেয়ে দ্বিগুণ আয়রনের প্রয়োজন

নারীদের আয়রনের চাহিদা পুরুষের চেয়ে বেশি হওয়া একটি জৈবিক বাস্তবতা।

লাইফস্টাইল ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 18 Feb 2026, 02:50 PM

Updated : 26 Aug 2026, 02:58 PM

দৈনন্দিন জীবনে পুষ্টির ভারসাম্য রক্ষা করা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যাবশ্যক। বিশেষ করে আয়রন বা লৌহের মতো খনিজ উপাদান, যা রক্তে অক্সিজেন পরিবহনের জন্য হিমোগ্লোবিন গঠনে সহায়তা করে।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক চিকিৎসক ডা. আফসানা হক নয়নের মতে, প্রজনন-ক্ষম বয়সি নারীদের পুরুষের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ আয়রনের প্রয়োজন হয়।

১৯ থেকে ৫০ বছর বয়সি নারীর দৈনিক প্রায় ১৮ মিলিগ্রাম আয়রন দরকার, যেখানে একই বয়সের পুরুষদের মাত্র ৮ থেকে ১০ মিলিগ্রাম।

এই পার্থক্যের পেছনে রয়েছে নারীদের শারীরিক গঠন, মাসিক চক্র এবং গর্ভধারণের মতো জৈবিক প্রক্রিয়া।

নারীদের আয়রনের চাহিদা বেশি হওয়ার প্রধান কারণ

নারীদের শরীরে আয়রনের চাহিদা বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে মাসিক চক্র। প্রতি মাসে মাসিকের সময় রক্তক্ষয়ের মাধ্যমে শরীর থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আয়রন বেরিয়ে যায়। রক্তে প্রায় ৭০ শতাংশ আয়রন সঞ্চিত থাকে, এবং মাসিকের রক্তপাতের ফলে প্রতিদিন গড়ে অতিরিক্ত এক মিলিগ্রামের মতো আয়রন হারানো হয়।

এই ক্ষয়পূরণের জন্য নারীদের পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি আয়রন গ্রহণ করতে হয়। যদি মাসিক অতিরিক্ত ভারী হয়, তাহলে এই ঘাটতি আরও তীব্র হয়ে ওঠে, যা রক্তস্বল্পতা বা ‘অ্যানিমিয়া’র ঝুঁকি বাড়ায়।

দ্বিতীয়ত, গর্ভাবস্থা নারীদের আয়রনের চাহিদাকে চরম পর্যায়ে নিয়ে যায়। গর্ভকালীন অবস্থায় শিশুর বৃদ্ধি, প্লাসেন্টা গঠন এবং মায়ের রক্তের পরিমাণ বৃদ্ধির জন্য অতিরিক্ত আয়রন প্রয়োজন।

গর্ভাবস্থায় মোট প্রায় ১০০০ মিলিগ্রাম আয়রনের প্রয়োজন হয়, যার মধ্যে শিশু ও প্লাসেন্টায় যায় প্রায় ৩৫০ মিলিগ্রাম, প্রসবকালীন রক্তক্ষয়ে ২৫০ মিলিগ্রাম এবং মায়ের বেসাল ক্ষয়ে আরও ২৪০ মিলিগ্রাম।

ফলে গর্ভবতী নারীর দৈনিক আয়রনের চাহিদা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৭ মিলিগ্রাম। প্রসবের পরও মায়ের শরীর পূর্বের শক্তি ফিরে পেতে, রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ করতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখতে আয়রনের প্রয়োজন অব্যাহত থাকে, যদিও বুকের দুধে আয়রনের পরিমাণ কম।

তৃতীয় কারণ- হল হরমোনজনিত পরিবর্তন। নারীদের শরীরে ইস্ট্রোজেন ও অন্যান্য হরমোনের ওঠানামা আয়রনের শোষণ ও ব্যবহারকে প্রভাবিত করে।

এছাড়া, নারীর শারীরিক গঠন ও রক্তের পরিমাণের সঙ্গে যুক্ত জৈবিক প্রক্রিয়াগুলো আয়রনের চাহিদা বাড়িয়ে তোলে।

বিভিন্ন বয়স ও অবস্থায় দৈনিক আয়রনের প্রয়োজনীয়তা

আয়রনের দৈনিক প্রয়োজনীয়তা বয়স, লিঙ্গ ও শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের (১৯ বছর বা তার ঊর্ধ্বে) জন্য সাধারণত ৮ মিলিগ্রাম দৈনিক আয়রন যথেষ্ট।

একই বয়সের প্রজননক্ষম নারীদের জন্য এটি ১৮ মিলিগ্রাম, যা পুরুষের প্রায় দ্বিগুণ।

গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে চাহিদা বেড়ে ২৭ মিলিগ্রাম হয়।

মেনোপজের পর নারীদের মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়াতে আয়রনের প্রয়োজন পুরুষদের সমান হয়ে যায়, যা প্রায় ৮ মিলিগ্রাম।

এই সংখ্যাগুলো আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে ব্যক্তিগত খাদ্যাভ্যাস, মাসিকের তীব্রতা, গর্ভধারণের ইতিহাস এবং স্বাস্থ্যগত অবস্থা অনুসারে এই চাহিদা কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে।

অতিরিক্ত আয়রনের ঝুঁকি ও সতর্কতা

আয়রনের ঘাটতি যেমন ক্ষতিকর, তেমনি অতিরিক্ত গ্রহণও বিপজ্জনক।

অতিরিক্ত আয়রন থেকে যকৃত বা লিভারের ক্ষতি, হৃদযন্ত্রের সমস্যা বা অন্যান্য জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।

“তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো আয়রন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত নয়। সাপ্লিমেন্টের প্রয়োজন হলেও প্রথমে প্রাকৃতিক উৎস থেকে আয়রন গ্রহণের চেষ্টা করতে হবে”- মন্তব্য করেন ডা. নয়ন।

লাল মাংস, মাছ, ডিম, ডাল, শাকসবজি (যেমন- পালংশাক, লালশাক), বাদাম, শুকনা ফল এবং আয়রন-ফর্টিফায়েড খাবার ভালো উৎস।

ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ খাবার (লেবু, আমলকি, টমেটো) আয়রনের শোষণ বাড়ায়, যেখানে চা-কফি বা ক্যালসিয়াম-সমৃদ্ধ খাবার শোষণ কমায়।

সচেতনতায় সুস্থতা নিশ্চিত করা

নারীদের আয়রনের চাহিদা পুরুষের চেয়ে বেশি হওয়া একটি জৈবিক বাস্তবতা, যা মাসিক, গর্ভধারণ ও হরমোনের সঙ্গে যুক্ত।

ডা. নয়নের পরামর্শ অনুসারে, নিয়মিত খাদ্যাভ্যাসে আয়রন-সমৃদ্ধ খাবার অন্তর্ভুক্ত করা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা জরুরি।

এতে রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ করা যায়, শারীরিক শক্তি বজায় থাকে এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য উন্নত হয়। সচেতনতা ও সঠিক পুষ্টি নারীদের জীবনকে আরও সুস্থ ও কর্মক্ষম করে তুলতে পারে।

আরও পড়ুন

দেহে লৌহের অভাব বোঝার উপায়

মাংসের চেয়েও লৌহ বেশি যেসব খাবারে

লৌহের উৎস হিসেবে ফল ও সবজি