Published : 28 Jun 2026, 09:12 AM
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতেই তৃণমূল কংগ্রেসের ভেতর অতর্কিত ভাঙন রাজনীতির সমীকরণ বদলে দিয়েছে। নির্বাচনে পরাজয়ের বাইরেও দলটি এমন এক বিদ্রোহের মধ্যে পড়েছে, যাতে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই দুরূহ। বহু পৌর কাউন্সিলর, অধিকাংশ বিধায়ক এবং লোকসভার ২০ জন সাংসদ তৃণমূল ছেড়ে ক্ষমতাসীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোটে (এনডিএ) যোগ দিয়েছেন। একইভাবে, উদ্ধব ঠাকরের নেতৃত্বাধীন শিবসেনার দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদ একনাথ শিন্ডের ডেরায় চলে গিয়েছেন। গুঞ্জন রয়েছে, অন্য দলগুলোরও একই হাল হতে পারে।
বর্তমানের এসব দৃশ্য তাই সবারই পরিচিত। সাধারণ মানুষের ধারণার সারকথা হলো, দল ভাঙনের পেছনে বিজেপিই নাটের গুরু। তবে এই লেখার উদ্দেশ্য দল ভাঙনের ময়নাতদন্ত কিংবা দলত্যাগ বিরোধী আইনকে কীভাবে পাশ কাটানো হচ্ছে, সেসব নিয়ে শোক করা নয়। বরং, গত প্রায় এক দশক ধরে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক দল থেকে যেভাবে পাইকারি হারে দলত্যাগের মাধ্যমে সরকারি দলে যোগ দেওয়ার হিড়িক চলছে—তারই ধারাবাহিকতায় তৃণমূল ও শিবসেনার এই নাটকীয় ভাঙন আমাদের একটু থামতে বাধ্য করে এবং একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়: শেষ বিচারে, রাজনীতির প্রকৃত উদ্দেশ্যটা কী?
সত্যিকার অর্থে রাজনীতি সেই কাঠামো, যার মাধ্যমে মানুষ আরও উন্নত, ন্যায্য ও শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্যে সংঘবদ্ধ হয়। এর মূল উদ্দেশ্য সকলের জন্য কল্যাণকামী সভ্যতা নির্মাণ করা। তাই রাজনীতি কথাটার নিহিতার্থ হলো একটি নির্দিষ্ট রূপরেখা থাকা; এই পরিস্থিতিতে রাজনীতির প্রধান প্রশ্ন দাঁড়ায়, কী করলে একটি দেশ মহান হবে?
তবে কারও কাছে এই রূপরেখার অর্থ কল্যাণমুখী অর্থনীতি, ধর্মনিরপেক্ষতা ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। আবার কারও কাছে বাজার উদারীকরণ, জাতীয় নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ। এই মতপার্থক্য ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দলের জন্ম দেয়।
রাজনৈতিক দল মূলত চিন্তা ও আদর্শের সূতিকাগার। প্রতিটি দল নির্দিষ্ট নীতি, কর্মপদ্ধতি ও রাজনৈতিক ঐতিহ্যের ভিত্তিতে মানুষ জড়ো করে, যাতে তারা সাংবিধানিক পথে লক্ষ্য পূরণ করতে পারে। কেউ একজন কোনো একটি দলে যোগ দেয়, কারণ সে বিশ্বাস করে দলটি তার চিন্তা ও আদর্শের প্রতিনিধিত্ব করে। সংসদীয় গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দল তাই শুধু ক্ষমতায় বসা নয়; মানুষের রাজনৈতিক রূপরেখা বাস্তবায়নের হাতিয়ার।
মন্ত্রিত্বের লোভে দল ও আদর্শ বদল এখন আর বিরল নয়। গত এক দশকের রাজনীতি দেখায়, নীতি-আদর্শের অবক্ষয় কতটা গভীর। দলবদলের আগে নেতাদের আদর্শিক অবস্থানে মৌলিক পরিবর্তনের নজির নেই। জনকল্যাণমূলক নীতির চেয়ে দক্ষিণপন্থা বেশি গ্রহণযোগ্য ভেবে কেউ দল ছাড়ছেন—এমনও দেখা যাচ্ছে না। আবার যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো নিয়ে কারও সমালোচনা নেই।
এর পরিবর্তে, নেতাদের আদর্শ রাতারাতি বদলাচ্ছে; সারা জীবনের রাজনীতি ছুঁড়ে ফেলতে যেন এক মুহূর্তও লাগছে না। বছরের পর বছর যে অবস্থান ধরে রেখে রাজনীতি করছিলেন, ক্ষমতার লোভে তা থেকে সটকে পড়া যেন দুধভাত। লোক দেখানো আদর্শের সামান্য রাখঢাকও নেই। ফলে ভারতের রাজনীতির চালিকাশক্তি আদর্শ নয়, ব্যক্তিগত ক্ষমতার মোহ।
যখন কোনো রাজনীতিবিদ পরাজিত দল ছেড়ে ক্ষমতাসীন দলে যোগ দেন, সেটি তখন আদর্শ নয়, লাভ-লোকসানের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তৃণমূল কংগ্রেসের বিদ্রোহী নেতারাও স্বীকার করেন, বিরোধী দলে থাকলে জনরোষ, স্থানীয়ভাবে দুর্বল হওয়া অথবা কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার নজরদারির ঝুঁকি থাকে। আর ক্ষমতাসীন শিবিরে যোগ দিলে তাৎক্ষণিক সুরক্ষা মেলে। রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে, দলবদলের বিনিময়ে মোটা অঙ্কের অর্থ পাওয়া যায়।
এই প্রবণতা জনগণের গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেটকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। মানুষ শুধু একজন প্রার্থীকে নয়, তার রাজনৈতিক কর্মসূচি, প্রতিশ্রুতি এবং বিকল্প শক্তিকে ভোট দেয়। তাই একজন নির্বাচিত প্রতিনিধির দলবদল হাজারো ভোটারের রায় অস্বীকার করার শামিল। এতে জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেট ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত হয়, যার মাধ্যমে মন্ত্রীত্ব বা অন্য সুবিধা নেওয়া যায়। যদি জবাবদিহিতা ছাড়াই রাজনৈতিক আনুগত্য কেনাবেচা হয়, তবে ব্যালট বাক্সও প্রতারণার শিকার হয়। ফলে রাজনীতি আজ জনস্বার্থ নয়, সুবিধাবাদী অভিজাতদের স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার।
তাই সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি সামনে আনা দরকার; রাজনীতি যদি শুধু ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের পথ হয়, তাহলে রাজনৈতিক দল ও সংসদীয় ব্যবস্থার মতো ব্যয়বহুল কাঠামোর প্রয়োজন কী? একটি শক্তিশালী সরকারি দলের যেমন প্রয়োজন রয়েছে, তেমনি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বিরোধী দল থাকাও জরুরি। রাজনৈতিক দলের কাজ ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিরোধ নয়, নীতিগত বিতর্ক সামনে আনা।
কিন্তু রাজনৈতিক দল যদি নেতাদের শুধুই নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়ার সিঁড়ি হয়, আর দলের দুর্দিনে নেতাদের দল বদলানো শুরু হয়, তাহলে রাজনৈতিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন সংসদ আর গঠনমূলক বিতর্কের কেন্দ্র থাকে না; হয় সুবিধাবাদিতার মঞ্চ।
দলত্যাগ বিরোধী আইন ষাটের দশকের কুখ্যাত ‘আয়া রাম, গয়া রাম’ রাজনৈতিক সংস্কৃতি ঠেকাতে করা হয়। কিন্তু এখন সেই আইন সহজেই পাশ কাটানো যাচ্ছে। রাজনীতিবিদরা একা দল বদলান না, দলের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য নিয়ে নতুন শিবিরে চলে যান। এতে তাদের আসনও নিশ্চিত থাকে, নতুন রাজনৈতিক আশ্রয়ও পোক্ত হয়। এই কৌশলের সঙ্গে রাজনৈতিক আদর্শের কোনো সম্পর্ক নেই।
কিছুদিন আগে ক্ষমতাসীন জোটের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করতে দিল্লিতে তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদদের সমবেত হওয়া শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়; বরং রাজনীতির গভীর কাঠামোগত অবক্ষয়ের এক নিদর্শন। এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি যেকোনো মূল্যে জয় পাওয়াকে পুরস্কৃত করে, আর নৈতিকতাকে দুর্বলদের বোঝা ভাবা হয়।
তাই ১৯৮৫ সালের দলত্যাগ বিরোধী আইনের প্রত্যাশা পূরণ করতে চাইলে রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য আবার রাজনীতিবিদদের স্মরণ করতে হবে। রাজনীতি শুধু ক্ষমতার ভাগ-বাটোয়ারার ময়দান হতে পারে না। এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে দলত্যাগ সামাজিক ও নির্বাচনি—উভয় ক্ষেত্রেই বদনামের বিষয় হিসেবে গণ্য হবে। এছাড়া গভীর ও সুস্পষ্ট মতপার্থক্য ব্যতীত দলত্যাগ জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা আকারে চিহ্নিত করতে হবে।
রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে আদর্শ ও জনসেবা না ফেরানো পর্যন্ত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নৈতিক ভিত্তি ধারাবাহিকভাবে দুর্বল হতেই থাকবে। কিন্তু এই ধারা বদলাবে যদি ভোটাররা প্রার্থীদের প্রমাণ দিতে বাধ্য করেন যে, নেতাদের রাজনীতির লক্ষ্য শুধু ক্ষমতা নয়, দেশের উন্নয়নও।
এই লেখাটি ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ থেকে অনূদিত; এর লেখক শশী থারুর একজন রাজনৈতিক নেতা ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সদস্য। তিনি বর্তমানে কেরালার তিরুবনন্তপুরম আসনের লোকসভার সংসদ সদস্য। শশী থারুর অতীতে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও মানবসম্পদ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়াও তিনি একজন প্রাক্তন কূটনীতিক এবং ২৯ বছর জাতিসংঘে কাজ করেছেন। শশী থারুর ভারতের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও রাজনীতির ওপর ১৫টির বেশি বই লিখেছেন।