Published : 29 Jun 2026, 01:46 AM
সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারে দানের জন্য রাখা ‘ডেগ’ সিলগালা করে প্রশাসনের আলাদা বাক্স স্থাপন এবং দানের টাকা প্রশাসনের খোলা ব্যাংক হিসাবে রাখার সমালোচনা করেছে মাজার কর্তৃপক্ষ।
তাদের ভাষ্য, এই উদ্যোগ সম্পর্কে তারা কিছু জানেন না। এটা ‘ঐতিহ্য, উত্তরাধিকার ও প্রথাবিরোধী’; পাশাপাশি আদালতের রায়েও ‘বরখেলাপ’।
ওয়াকফ প্রশাসনের সম্পত্তিভুক্ত মাজারের আয়-ব্যয়ের সচ্ছতা আনতেই এ ধরনের উদ্যোগের কথা বলা হচ্ছে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে।
মাজারের দানের অর্থের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কমিটিও গঠন করা হয়েছে। সেই কমিটির মাধ্যমেই দানের টাকা ব্যবস্থাপনা করা হবে। তবে, প্রশাসন গোটা বিষয়টি নিয়ে মাজার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ‘সমন্বয়ের’ কথাও বলেছে।
মাজারে দানের অর্থ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা নতুন নয়। এর আগেও এ নিয়ে কথা হয়েছে। প্রায় এক যুগ আগে বিষয়টি নিয়ে হাই কোর্টের একটি রায়ও রয়েছে।
`মুফতি আব্দুস সালাস ও অন্যান্য বনাম ওয়াকফ প্রশাসক ও অন্যান্য’ শিরোনামের এ মামলার মূল প্রশ্নই ছিল— হযরত শাহজালাল (রহ.) দরগাহ শরিফের খাদিমদের দীর্ঘদিনের খাদিমি বারিদারি অধিকার, বিশেষ করে নজর, নেয়াজ ও দান গ্রহণের অধিকার, ওয়াকফ প্রশাসনের প্রশাসনিক আদেশের মাধ্যমে বাতিল বা সীমিত করা যায় কি-না?

শত শত বছরের প্রথা ভেঙে মাজারের দানের টাকা ব্যবস্থাপনায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপের প্রেক্ষাপটে সেই রায়ের বিষয়টিও সামনে আনছেন কেউ কেউ। যেখানে ‘দরগাহের ওয়াকফ চরিত্র এবং খাদিমদের বারিদারি অধিকার পরস্পরবিরোধী নয়; বরং উভয়ই পাশাপাশি বিদ্যমান থাকতে পারে’ বলে রায়ের মূল ভাবে বলা হয়।
ফারসি শব্দ 'বারি' অর্থ 'পালা' বা 'পর্যায়' এবং 'দার' অর্থ 'ধারণকারী' বা 'রক্ষক' - এই দুইয়ের সমন্বয়ে 'বারিদারি' শব্দটি এসেছে, যার আক্ষরিক অর্থ হয় পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করা।
যদিও প্রশাসনের উদ্যোগে নিজেদের ‘বঞ্চিত’ মনে করছেন হযরত শাহজালাল (র.) মাজারের খাদেম মুফতি রায়হান উদ্দিন মুন্না।
তিনি বলছিলেন, “আমরা মিডিয়ার মাধ্যমে শুনেছি, শাহজালাল মাজারের নামে ব্যাংকে একটা অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। তবে এতে আমাদের কাউকে সম্পৃক্ত করা হয়নি। এমনকি আমাদের জানানোও হয়নি। সোমবার মাজারের দানবাক্সের টাকা গণনার বিষয়টিও আমাদের জানানো হয়নি।”
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন মাজার ভক্তদের সংগঠন আশেকানে আউলিয়া বাংলাদেশের চেয়ারম্যান জামান চৌধুরী।
তিনি বলেন, “শুনেছি, জেলা প্রশাসক ব্যাংকে একটি অ্যাকাউন্ট করেছেন। কিন্তু মাজার সংশ্লিষ্ট কাউকে এতে সম্পৃক্ত করা হয়নি। এই টাকা কীভাবে বা কারা ব্যয় করবে তাও আমরা জানি না।”

অন্যদিকে প্রশাসনিক উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সাঈদা পারভীন বলেন, “সোনালি ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। জেলা প্রশাসন ও ওয়াকফ কর্মকতা এই অ্যাকাউন্টের দায়িত্বে রয়েছেন। মাজার কর্তৃপক্ষ জেলা প্রশাসকের কাছে ব্যয় বিবরণ দিয়ে লিখিত আবেদন করে টাকা তুলতে পারবে। বা আগে খরচ হলে সেটাও নিতে পারবেন। তবে নতুন ডিসি স্যার আসার পর এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন।”
অ্যাকাউন্ট খোলার সময় কেন মাজার কর্তৃপক্ষকে জানানো বা রাখা হয়নি–এ বিষয়ে কিছু বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন সাঈদা পারভীন।
তিনি বলেন, “মাজারের নামে খোলা সোনালী ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে গণনায় পাওয়া অর্থের সঙ্গে জেলা প্রশাসনের দেওয়া পাঁচ লাখ টাকা যোগ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে হিসাবে ২২ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা জমা রয়েছে।’’
সরকারি কমিটির সঙ্গে মাজার কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ের বিষয়ে জানতে হযরত শাহজালাল (র.) দরগাহ মোতাওয়াল্লী ফতেহ উল্লাহ আল আমানের ব্যবহৃত মোবাইলে ফোন করা হলে তিনি ধরেননি।
তবে খাদেম পরিবারের এক সদস্য বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতি এড়াতে মাজার কর্তৃপক্ষ সরকারি কমিটির সঙ্গে কাজ করবে। কমিটির দায়িত্বশীলরা মাজারের আইনি বিষয়সহ যাবতীয় সবকিছু সর্ম্পকে আলোচনা করেছেন, খতিয়ে দেখছেন।”

মামলার প্রেক্ষাপট
দেশের প্রায় সব মাজার ও দরগাহ ওয়াকফ সম্পত্তির অধীন। দেশে ২২ হাজারের বেশি নিবন্ধিত ওয়াকফ সম্পত্তি রয়েছে। শাহজালাল (র.) মাজার তার একটি।
ওয়াকফ প্রশাসন ১৯৬৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর একটি আদেশ জারি করে দরগাহের নজর, নেয়াজ ও দান ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে নির্দেশনা দেয়। কিন্তু খাদেমরা এই আদেশকে তাদের বারিদারি অধিকারের পরিপন্থি দাবি করেন।
তাদের ভাষ্য, তারা বংশানুক্রমে বহু শতাব্দী ধরে দরগাহের খেদমত, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, জিয়ারতকারীদের সেবা এবং নজর, নেয়াজ গ্রহণ করে আসছেন। তাদের দাবি অনুযায়ী, এ অধিকার শুধু সামাজিক রীতি নয়, বরং পূর্ববর্তী বহু বিচারিক সিদ্ধান্তে স্বীকৃত একটি প্রথাগত ও বংশানুক্রমিক অধিকার।
এই প্রেক্ষাপটেই খাদেমরা মামলা করেন। নিম্ন আদালত মামলাটি খারিজ করে দিলে তারা হাই কোর্টের দারস্থ হন। হাই কোর্ট ২০১৪ সালের ২৭ মে এ বিষয়ে রায় দেন।
বিষয়টি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ওয়াকফ মামলার অভিজ্ঞ আইনজীবী ব্যারিস্টার রিয়াসাদ আজিম হক আদনান বলেন, ১৮৬০-এর দশক থেকে বেশ কয়েকবার বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। সর্বশেষ ১৯৭৬ সালের মুফতি আব্দুস সালাম বনাম ওয়াকফ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর মামলায় ২০১৪ সালের ২৭ মে হাই কোর্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় দেন।
“বর্তমান বিরোধ বোঝার জন্য এই রায়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি দলিল। এই রায়কে পাশ কাটিয়ে এই সমস্যার সমাধান খোঁজা যাবে না,” বলেন আদনান।
তার ভাষ্য, “আদালত স্বীকৃত অধিকার মুছে দেওয়ার চেষ্টা করলে সেটি সমাধান হবে না বরং নতুন সংঘাতের পথ সৃষ্টি করবে। সিলেটের এক বিশাল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে প্রশাসনের, এমনকি সরকারের দূরত্ব সৃষ্টি করবে। আর সেই ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে নামবে রাজনৈতিক অপতৎপরতাকারীরা।
“আমরা সিলেটিরা দরগাহে যাই বা না যাই, দান করি বা না করি- এই জায়গাটা আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য আর পরিচয়ের সঙ্গে জড়িত। তাই এই জায়গা নিয়ে সংঘাত হলে আমরা ব্যথিত হই, চিন্তিত হই। কারণ এটা শুধু দানবাক্সের বিষয় না, এটা এই এলাকার মানুষের ঐতিহ্যের বিষয়, আত্মসম্মানের বিষয়।”

আইন কী বলছে
নজর, নেয়াজ কি আসলেই খাদেমদের বংশানুক্রমিক অধিকার? এই বিষয়ে রায়ের বরাতে আইনজীবী রিয়াসাদ আজিম হক আদনান বলেন, রায়ের ১৩, ১৪ ও ১৫ নম্বর পৃষ্ঠায় আদালত আগের বহু মামলার আলোচনা করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, খাদেমরা কোনো সাধারণ কর্মচারী নন। মূল খাদেমের উত্তরসূরি হিসেবে তারা প্রজন্মের পর প্রজন্মে দরগাহে খেদমত করেছেন, জিয়ারতকারীদের সেবা দিয়েছেন, রীতিনীতি পালন করেছেন। এই দীর্ঘদিনের খেদমত আর প্রথা থেকেই তৈরি হয়েছে তাদের বারিদারি অধিকার। এই বারিদারি অধিকার মুঘল আমল থেকে তারা ভোগ করে আসছেন।
রায়ের ২১ নম্বর পৃষ্ঠায় আদালত বলেছে, মূল খাদেমদের উত্তরসূরি হিসেবে তারা নজর, নেয়াজ সংগ্রহের ক্ষেত্রে একটি ‘কাস্টমারি রাইট’ তথা ‘প্রথাগত অধিকার’ অর্জন করেছেন। আগের বিচারিক আলোচনায় এই অধিকার বংশানুক্রমিক, এমনকি হস্তান্তরযোগ্য চরিত্রের অধিকার হিসেবেও বলা হয়েছে। তাই এই দানের টাকার ভোগে খাদেমদের কোনো অধিকার নেই–এই কথাটা আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে, হাই কোর্টের রায়ের দৃষ্টিকোণ থেকে পুরোপুরি সঠিক নয় বলে আদনানের ভাষ্য।
আবার দরগাহে দানের সব টাকা খাদেমদের–সে কথাও আদালত বলেনি।
ব্যারিস্টার আদনান বলেন, রায়ের ১১ ও ১২ নম্বর পৃষ্ঠায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য এসেছে। যে নজর, নেয়াজ খাদেমদের ব্যক্তিগতভাবে দেওয়া হয়, তাদের হাতে দেওয়া হয় অথবা তাদের খেদমত, দোয়া, সেবা বা প্রচলিত রীতির অংশ হিসেবে দেওয়া হয়, সেটাই তাদের বারিদারি অধিকারের অংশ হতে পারে।
“কিন্তু যে দান দরগাহের উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়–মাজারের রক্ষণাবেক্ষণ, উন্নয়ন, আলো-বাতি, মসজিদ-মাদ্রাসার কাজের জন্য, সেটা সম্পূর্ণ আলাদা। সেটাকে খাদেমদের ব্যক্তিগত টাকা বলা যাবে না, তারা সেটা ভোগও করতে পারবেন না, ব্যবস্থাপনাও করতে পারবেন না।”
আদনান জানান, রায়ের ২৬ নম্বর পৃষ্ঠায় আদালত দানের বিষয়টিকে ‘ক্যাটাগরিভিত্তিক’ দেখার কথা বলেছে।
“সহজ ভাষায় বললে, সব দান এক রকম না। টাকাটা কাকে দেওয়া হয়েছে? কোন উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে? দরগাহ প্রতিষ্ঠানের নামে, নাকি খাদেমের সেবার স্বীকৃতিস্বরূপ? এই পার্থক্য না বুঝলে বিচারও ভুল হবে, সমাধানও ভুল হবে।”
সাধারণভাবে ওয়াকফ প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে প্রশাসনের তদারকির ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু শাহজালাল দরগাহের ক্ষেত্রে ২০১৪ সালের এই রায় সেই ক্ষমতার একটা সীমা টেনে দিয়েছে বলে মনে করেন এই আইনজীবী।
“রায়ের ১৭ নম্বর পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ওয়াকফ প্রশাসক এমন কোনো আদেশ দিতে পারবেন না যা খাদেমদের বারিদারি অধিকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। রায়ের ২৭ নম্বর পৃষ্ঠায়, দরগাহকে ওয়াকফ প্রশাসনের অধীনে নিয়ে প্রচলিত ব্যবস্থাপনার বাইরে নিয়ে সরকারি তদারকিতে বদলানো যাবে কিনা, এই প্রশ্নে আদালতের উত্তর ছিল, ‘নো’।
“আর ২৮ নম্বর পৃষ্ঠায় আদালত বলেছে, ওয়াকফ প্রশাসকের উচিত এই দরগাহ থেকে ‘হ্যান্ডস অফ’ রাখা, অর্থাৎ যথাসম্ভব দূরে থাকা। এক কথায়, দরগাহ মাজার এবং মাজার সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনার পুরো বিষয়টি আদালত খাদেমদের দ্বারাই পরিচালিত হতে হবে বলেছে। মাজার ব্যবস্থাপনায় ওয়াকফ প্রশাসনের ভূমিকা থাকতে পারে, কিন্তু খাদেমদের আদালত স্বীকৃত বারিদারি অধিকার মুছে দিয়ে পুরো ব্যবস্থাপনা নিজের হাতে নিয়ে নেওয়া- এই রায়ের আলোকে সেটি খুব কঠিনভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হবে।”
আইনজীবীর ভাষ্য, “রায়ের আলোকে দানবাক্স সিলগালা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা, বিশেষ বাহিনী বসানো এবং এর ফলে দরগাহ পরিচালনার প্রচলিত ও আদালত স্বীকৃত ব্যবস্থার একতরফা হস্তক্ষেপ ঘটে, তাহলে সেটি রায়ের ১৭, ২৭ ও ২৮ নম্বর পৃষ্ঠায় বর্ণিত সিদ্ধান্তের বরখেলাপ হয়। আর তাই যদি হয়, তবে ডিসি সাহেবের সেই পদক্ষেপের আইনিভিত্তি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠবেই।”
“সুতরাং ডিসি সাহেব (সাবেক ডিসি সারওয়ার আলম) স্বচ্ছতার উদ্যোগ নিতেই পারেন। কিন্তু সেই উদ্যোগ হতে হবে রায় মেনে, প্রথা বুঝে আর সব পক্ষকে সঙ্গে নিয়ে। আর শাহজালাল দরগাহর মত স্পর্শকাতর জায়গায় জনপ্রিয় সিদ্ধান্তের চেয়ে আইনসম্মত সিদ্ধান্তই বেশি জরুরি।”

আগে দানের টাকা কী হত
প্রকাশ্যে গণনায় মাত্র চার দিনে সাড়ে ১৭ লাখ টাকা পাওয়ার পর মাজারের দানবাক্সে মাসে কী পরিমাণ টাকা জমা হয় তা নিয়ে আলোচনা চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, এই টাকা কীভাবে ব্যয় হত এবং কোথায় যেত টাকা?
এ বিষয়ে মাজারের অন্যতম খাদেম মুফতি রায়হান উদ্দিন মুন্না বলেন, হযরত শাহজালাল (র.) বিয়ে করেননি। তবে তার ভাগনে বিয়ে করেছিলেন। শাহজালাল (র.) জীবিত থাকতেই তার মাজারের উত্তোলিত টাকার কিছু অংশ তার ভাগনের সংসারের খরচের জন্য দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।
সেই ধারাবাহিকতা এখনও রয়েছে। এখন সেই ভাগনের উত্তরসূরী প্রায় ৩০০ পরিবার আছে সিলেটে, যারা সরওকুম, মুফতি ও সৈয়দ পরিবার নামে পরিচিত।
খাদেম বলেন, এই ৩০০ পরিবার থেকে প্রতিদিন একেকজন মাজারের তদারকি ও ব্যবস্থাপার দায়িত্ব পালন করেন। যা ‘বাড়ি প্রথা’ নামে পরিচিত। যিনি যেদিন দায়িত্ব পলন করেন তিনি মাজারের রক্ষণাবেক্ষন খরচ, কর্মীদের বেতন, লঙ্গরখানার থাকা-খাওয়ার খরচ ব্যয় করে যা অবশিষ্ট থাকে তা নিয়ে যান। মাজারের ব্যস্থাপনার দায়িত্ব পালনের হাদিয়া হিসেবেই তিনি এই টাকা নেন। আবার সদকা হিসেবে কেউ কিছু দান করলে তা উপযুক্ত ব্যক্তির মধ্যে বিতরণ করা হয়।
রায়হান উদ্দিন মুন্না বলেন, “আমরা কখনোই মাজারে দান করার জন্য প্রচার চালাই না। কাউকে বলিও না। এমনকি মাজারের ওরসেরও কোনো প্রচার চালানো হয় না। লোকজন নিজের ভক্তি ও ভালোবাসা থেকেই এখানে আসেন, দান করেন।”
শাহজালাল (র.) মাজারে দিনে কত টাকা ওঠে এই বিষয়ে মাজার ভক্তদের সংগঠন আশেকানে আউলিয়া বাংলাদেশের চেয়ারম্যান জামান চৌধুরী বলেন, “মাজারে কত টাকা ওঠে তার নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। কোনো কোনো দিন ২০-২৫ হাজার, কোনোদিন ৫০ হাজার; আবার বৃহস্পতিবার বা এরকম যেসব দিনে ভক্ত সমাগম বেশি হয়, সেসব দিনে এক থেকে দেড় লাখ টাকাও আসে।”
মাজার যেভাবে চলছে
মাজারের খাদেম, ভক্ত ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রশাসনিক পদক্ষেপের পর মাজারের সব কার্যক্রম ও সেবা যথারীতি আগের মতই চলছে। নিয়ম অনুযায়ী, নির্ধারিত খাদেম পরিবার প্রতিদিন দায়িত্ব পালন করছেন। শুধু দানের টাকা তারা তুলতে পারছেন না।
তারা বলেন, মাজার কর্তৃপক্ষ সবার সহযোগিতা নিয়ে ও সবার সঙ্গে সমন্বয় করেই কাজ করছেন। যখন টাকার প্রয়োজন পড়ছে, নিজেরাই দিচ্ছেন।

বর্তমান পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে মাজারের অন্যতম খাদেম জামান চৌধুরী বলেন, “বর্তমানে ব্যক্তিগতভাবে ব্যয় মিটানো হচ্ছে। দরগার পানির মোটর নষ্ট হয়েছিল, এই মোটরের পানি দরগাহে আসা লোকজন পান করেন। মোটরটি দুদিন নষ্ট থাকার পর একজন ব্যক্তি ঠিক করার খরচ দিলে ঠিক করা হয়।
“দরগাহে অনেকে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছেন। বর্তমানে দৈনিক ভিত্তিক শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বন্ধ রয়েছে। এভাবে কতদিন চলবে বুঝতে পারছি না?”
‘দুই ঘরানা মুখোমুখি’
সিলেটের নাগরিক সংগঠক আব্দুল করিম চৌধুরী কীম বলেন, মাজারে আগে মানুষ গাছের ফল বা সবজি, গৃহপালিত পশু বা প্রাণি এসব নিয়ে আসতেন। ১০০ বছর আগে সিলেটে এখনকার মত হোটেল ছিল না। তখন যারা মাজারে আসতেন তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা মাজারের দায়িত্বে থাকা পরিবারগুলো করতেন।
“আগে দানের তিনটি ডেগে লাকড়ির চুলায় রান্না করা হত। ডেগে টাকা দেওয়ার ইতিহাস ২০০ বা ৩০০ বছরের পুরনো। তাই যারা ডেগে টাকা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা কথা তুলছেন, তাদের জেনে কথা বলা উচিত।”
তিনি বলেন, “পর্যটক বা ভক্ত যারাই আসতেন তাদের সবার থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা মাজার কর্তৃপক্ষকেই করতে হত। পর্যটক ইবনে বতুতা, পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের মাজার কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনাতেই থেকেছে।”
তার মতে, জেলা প্রশাসনের সাম্প্রতিক উদ্যোগ মাজার অনুসারী ও কওমি ঘরানার মধ্যে বিভেদ তৈরি করেছে। এই দুই পক্ষের অনুসারীকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
পুরনো খবর
শাহজালাল মাজারের দানের অর্থ ব্যবস্থাপনায় ১২ সদস্যের কমিটি
শাহজালালের মাজারের আর্থিক হিসাবে স্বচ্ছতার উদ্যোগে তাড়াহুড়ো হয়েছে: প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী
শাহজালাল মাজারের দানবাক্সে চার দিনে মিলল সাড়ে ১৭ লাখ টাকা
প্রথা ভেঙে শাহজালাল মাজারে দানের টাকা গণনা, উপস্থিত ছিলেন সারওয়ার আলম
ডিসি সরওয়ারের বহাল চেয়ে মানববন্ধন, মাজারের দানবাক্স সিলগালা প্রত্যাহার দাবিতে বিবৃতি