১৬ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩

কী ঘটেছে তুরাগে? যা বলছে পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শীরা

পুলিশের দাবি, এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি। তারা শুধু ঘটনাস্থলে ‘নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের মিছিল থেকে’ সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছেন।

কী ঘটেছে তুরাগে? যা বলছে পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শীরা
মো. সুমন।

বিডিনিউজ২৪

প্রশান্ত মিত্র

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 29 Jun 2026, 02:12 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:31 PM

‘ধাওয়া খেয়ে’ তুরাগ নদে বেশ কয়েকজন লাফিয়ে পড়ে নিখোঁজ হওয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আলোচনাকে পুলিশ ‘ভিত্তিহীন’ দাবি করলেও প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন ভিন্ন কথা।

প্রত্যক্ষদর্শীরা নদীতে কতজন নিখোঁজ বা তলিয়ে গেছেন এমন তথ্য দিতে না পারলেও তারা বলছেন, ঘটনার দিন গত ২২ জুন ‘পুলিশের ধাওয়ায়’ আশুলিয়া বাজারের পাশে গরুর হাটের কাছে তুরাগ নদে বেশ কয়েকজনকে লাফিয়ে পড়তে দেখেছেন। নদী থেকে পুলিশ কয়েকজনকে আটকও করেছে। এর পরেও পুলিশের দল সেখানে খোঁজ খবর নিয়েছেন।   

তবে পুলিশের দাবি, এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি। তারা শুধু ঘটনাস্থলে ‘নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের মিছিল থেকে’ সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছেন।

এরমধ্যে গেল বুধ ও বৃহস্পতিবার তুরাগ থেকে তিনটি লাশ উদ্ধারের তথ্য দিয়ে পুলিশ দাবি করেছে, এদের সঙ্গে মিছিলের কোনো ‘সম্পৃক্ততা নেই’।

উদ্ধার হওয়া তিনটি লাশের মধ্যে একটি ১৮ বছর বয়সি মো. সুমন নামে তুরাগের রানাভোলা এলাকার এক বাসিন্দার।

তার লাশ উদ্ধারের পর আশুলিয়া থানা পুলিশ বলেছে, গত ২২ জুন ‘বন্ধুদের সঙ্গে পিকনিক করতে’ ট্রলারে করে নদীতে গিয়েছিলেন তিনি। ট্রলার থেকে নামার সময় ‘হুড়োহুড়িতে’ নদীতে পরে তলিয়ে গিয়েছিলেন।

এ বিষয়ে সুমনের খালু জুয়েল বাবু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, তারা সুমন নিখোঁজের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। পুলিশের সাক্ষাৎ পেলেও তাদেরকে ধাওয়ার বিষয়ে ‘কিছু বলা হয়নি’।

এমনকি বুধবার রাতে লাশ উদ্ধারের পরদিন তারা গিয়ে সুমনকে শনাক্ত করেছেন। কিন্তু সুমন পিকনিকে গিয়েছে বলে তারা পুলিশকে কিছু বলেননি। ময়নাতদন্ত শেষে লাশ হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় সুমনের বড়ভাই সালাউদ্দিন একটি কাগজে স্বাক্ষর করেছেন।

আশুলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আজগর হোসেন নদীতে পাওয়া যাওয়া সুমনের লাশের ঘটনায় অপমৃত্যু মামলা হওয়ার কথা বলেছেন।

তার ভাষ্য, অপমৃত্যু মামলার বাদীর দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী তারা (সুমনরা) পিকনিকে গিয়েছিলেন।

“এখন অ্যাজ পার বাদীর এফআইআর, আমরা সেটাই বলেছি। এর বাইরে কি আমার বলার সুযোগ আছে।“

বাদীকে শুধু একটি কাগজ দেওয়া হয়েছিল এমন দাবির প্রেক্ষিতে তিনি বলেন, “না না- এটা সত্য নয়। কারণ ওনারা তো দেখে শুনে পরে সিগনেচার করেছে।”

প্রত্যক্ষদর্শীর বরাতে ‘পুলিশি ধাওয়ার’ বিষয়ে জানতে চাইলে থানার এই পরিদর্শক বলেন, “এটা আমার জানা নাই। স্পটে আমাদের যে অফিসার ছিল অফিসারদের ভাষ্য অনুযায়ী এমন ঘটনা ঘটেনি।”

এর আগে গত ২২ জুন কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের মিছিলের পর থেকেই দলটির সাত নেতাকর্মী নিখোঁজ রয়েছেন বলে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে।

তাদের মধ্যে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের তিনজনের লাশ তুরাগ নদী থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে গত শুক্রবার থেকে ফেইসবুকে ফের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে।

তবে পুলিশ সদরদপ্তর শনিবার এক বার্তায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তুরাগের ঘটনায় ‘সাতজনের মৃত্যুর’ খবরকে ভিত্তিহীন দাবি করে বলেছে, এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি।

সদরদপ্তরের বক্তব্যের পরদিন রোববার সংবাদ সম্মেলনে ঢাকার পুলিশ সুপার (এসপি) শামীমা পারভীন দাবি করেছেন, ঢাকার অদূরে সাভার ও আশুলিয়ায় তুরাগ নদ থেকে দুইজনের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট নেই।

তুরাগ নদের তীরে আশুলিয়া বাজারের পাশে গরুর হাটের কাছে পন্টুন।

তুরাগ নদের তীরে আশুলিয়া বাজারের পাশে গরুর হাটের কাছে পন্টুন।

এছাড়া সাতজনের মরদেহ উদ্ধারের যে ‘গুজব’ ছড়ানো হয়েছে, তাতে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন তিনি।

তুরাগ নদীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সাত নেতাকর্মীর লাশ ভাসছে বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কয়েকদিন ধরে আলোচনা চলার পর রোববার ঢাকার এসপি সংবাদ সম্মেলনে আসেন।

একইদিন বিকালে সংবাদ সম্মেলন করে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) ফারুক হোসেন বলেছেন, ডিএমপির উত্তরা বিভাগের আওতাধীন তুরাগ থানা এলাকায় এ ধরনের কোনো ধারাবাহিক মৃতদেহ উদ্ধার, হত্যাকাণ্ড কিংবা এ সংক্রান্ত অন্য কোনো ঘটনার সংবাদ পাওয়া যায়নি।

সেদিন যা ঘটেছিল

আশুলিয়া বাজারের পাশে তুরাগ নদ লাগোয়া গরুর হাট। উত্তর দিকে নদীর উপরে ফ্লাইওভারের কাজ চলমান থাকায় নদীর অনেকখানি অংশ ভরাট করা হয়েছে। এরমধ্যে বর্যার শুরুতে পানির চাপের কারণে মাঝখানে প্রচুর স্রোত। পানি বেড়ে যাওয়ার কারণে আশপাশের নিচু জমি প্লাবিত হয়ে নদীর আকার বড় হয়েছে।

গরুর হাটের পাশেই একটি পন্টুন রয়েছে, যেখানে বিভিন্ন ট্রলার ভেড়ে। গত ২২ জুন সেখানে কিছু হয়েছিল কি-না জানতে চাইলে রোববার এক বাঁশ বিক্রেতা পন্টুন দেখিয়ে বলেন, “ওইখানে একটি ট্রলার ভিড়তেছিল, তখন তাদেরকে দেখে বাজারের দিক থেকে পুলিশ দৌড়ে গিয়ে তাদের ধাওয়া দিলে কয়েকজন নদীতে পড়ে যায় বলে শুনেছি।”

পন্টুনের কাছে গিয়ে দেখা মিলল দুই প্রত্যক্ষদর্শীর। যারা ঘটনার দিনে পুলিশের ধাওয়া খেয়ে ট্রলারে থাকা বেশিরভাগকেই নদীতে পড়ে যেতে দেখেছেন, যাদের মধ্য থেকে ৬-৭ জনকে তারা নদী থেকে হাত দিয়ে টেনেও তুলেছেন। পরে পুলিশ আবার ধাওয়া দিলে তাদের সামনেই উদ্ধার হওয়া লোকগুলো আবার নদীতে ঝাঁপ দেয়।

জুয়েল নামে একজন বলেন, তারা এখানেই কাজ করেন। ঘটনার দিন আনুমানিক সোয়া ১১টার দিকে পুলিশ তাদের কাছে মোবাইলে একটি ছবি দেখিয়ে তাকে দেখেছে কি না জানতে চান।

পুলিশ অনেককেই ডেকে বলেন, “একটা ট্রলারে নারীসহ কয়েকজন আছে। এই ছেলে আছে, তাকে দেখেছে কি-না।”

পুলিশের সঙ্গে সাদা পোশাকে কিছু লোকজনও ছিল, যাদেরকে দেখে পুলিশ মনে হয়নি। রাজনৈতিক নেতাকর্মী বলে তার মনে হয়েছে।

তিনি বলেন, “এর পরে পুলিশ বাজারে গিয়া অপেক্ষা করে। দুপুরের দিকে একটি ট্রলার পন্টুনের পাশে ভিড়তে গেলেই বাজারের দিক থেইকা ১০-১২ জন পুলিশ দৌড়ায়া এদিক আসে। ট্রলারে কমছে কম ৩০ থেকে ৪০ জনতো আছিলই, বেশিরভাগই কম বয়সি।”

পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ৪ জন পোশাকে ও ৬-৭ জন ছিলেন পুলিশের কটি পরা। তবে পুলিশ মনে হয়নি এমন ছিলেন আরো আরো ১০-১২ জন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, “পুলিশ ধাওয়া দিলে তারা তাড়াহুড়ো করে পাড় থেকে ট্রলারের নোঙর তুলতে যায়। কিন্তু পারে নাই। ৮-১০ জন ট্রালার থেকে লাফায়ে পরে নদীর পাড় ধইরা উল্টা দিকে দৌড় দেয়। বাকিরা পানিতে ঝাঁপ দেয়, শুধু একজন ট্রলারে আছিল।”

তবে ট্রলারে থাকা কাউকে রাজনৈতিক কোনো স্লোগান দিতে শোনেননি তারা। তার ভাষ্য, তারা ট্রলার থেকে নামার আগেই পুলিশ ও বাকি লোকজন একসঙ্গে ধাওয়া দেয়।

“লাফ দেওয়া কয়েকজন ভেসে যাওয়ার সময় দক্ষিণ দিকে থাকা একটি ড্রেজার পন্টুনে আইসা ঠেকে। এসময় কয়জন কইতাছিল, ভাই মইরা যামু। আমাগোরে বাঁচান। ওই সময় আমরা ৬-৭ জনরে হাত দিয়া টাইনা তুলছি। পরে পুলিশ তাগো ট্রলারেই ওইঠা পড়ে। ট্রলারের মাঝিও লাফ দিয়া নাইমা পড়ায় তারা স্ট্রার্ট দিতে পারতাছিল না। এ সময় রাগে এক পুলিশ সদস্য ড্রেজারে থাকা একজনরে ডাইকা তুইলা ট্রলার চালেইতে বলে। পরে একজন লাফ দিয়া ট্রলারে ওইঠা ট্রলারের ইঞ্জিন স্ট্রার্ট কইরা দেয়। এরপর পুলিশ ঘুইরা ঘুইরা পানি থেইকা কয়েকজনরে ধরছে। আর কেউ ওইপারে গিয়া উঠছে।”

ঘটনার বর্ণনায় তিনি কয়েকজন ডুবে গিয়েও থাকতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন। বলেন, “কারণ তারা সাঁতার দিতে পারতাছিল না।”

পুলিশ এরপরেও সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘটনাস্থলে অপেক্ষা করছিল। পরের দিনও নদীর পারে পুলিশ গিয়ে বসে ছিল, যোগ করেন তিনি।

এরপর দুই দিনে তিনজন নিখোঁজ থাকা ব্যক্তির সন্ধানে তাদের পরিবারের সদস্যদের নিজেদের ট্রলারে করে নিয়ে গিয়ে ঘুরিয়েছেন বলেও তুলে ধরেন তিনি। তবে তাদের নাম-ঠিকানা বিস্তারিত জানা নেই।

ওই ব্যক্তি বলেন, “তিনটা পরিবারের লোক আইসা সন্তানের খোঁজ করছে। তারা নদীতে ঘুইরা ঘুইরা খুঁজছে, হয়তো কিছু বকশিস দিছে।”

তবে ফায়ার সার্ভিসের কোনো সদস্যকে বা পুলিশকে নদীতে এসে খুঁজতে দেখেননি।

এরপর দুই দিনে ৩ লাশ উদ্ধার

ঢাকার তুরাগ থানার রানাভোলা এলাকার বাসিন্দা মো. সুমন ২২ জুন বাসা থেকে বের হওয়ার পর থেকে নিখোঁজ ছিলেন। শুক্রবার তুরাগ নদ থেকে তার অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে আশুলিয়া থানা পুলিশ।

সুমনের বাবার নাম মো. শাহ আলম রানাভোলা এলাকায় অটো চালান। প্রয়াত সুমন কামারপাড়া কাঁচামালের আড়তে কাজ করতেন।

বৃহস্পতিবার রাতে তুরাগ নদের আশুলিয়া বাজারের গরুর হাটসংলগ্ন এলাকায় জেলেরা একটি লাশ ভাসতে দেখে পুলিশকে খবর দেয় বলে জানান আশুলিয়া থানার ওসি তরিকুল ইসলাম।

তিনি বলেন, “পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে। লাশের সঙ্গে একটি মোবাইল ফোন পাওয়া যায়। ফোনটি পানিতে নষ্ট হয়ে গেলেও সিমকার্ডের তথ্যের ভিত্তিতে পরিবারের লোকজনকে খবর দিলে তারা এসে লাশ শনাক্ত করে।”

তুরাগ নদের তীরে আশুলিয়া বাজারের পাশে গরুর হাটের কাছে পন্টুন।

তুরাগ নদের তীরে আশুলিয়া বাজারের পাশে গরুর হাটের কাছে পন্টুন।

তার দাবি, এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই সালাউদ্দিন বাদী হয়ে আশুলিয়া থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করেছেন। লাশের ময়নাতদন্তের পর পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

সুমনের লাশ উদ্ধারের পর থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ফেইসবুক পেইজ বা আইডি থেকে প্রচার করা হয়- তুরাগ থানা এলাকায় আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মিছিলে বিএনপি নেতাকর্মী ও পুলিশের হামলার পর থেকে ৭ জন নেতাকর্মী নিখোঁজ এবং ৩-৪ জনের লাশ তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। 

তবে এর সবকিছুই ‘ভিত্তিহীন ও গুজব’ বলে দাবি ওসি তরিকুলের।

রোববার দুপুরে রানাভোলা এলাকায় সুমনের ভাড়া বাসায় গিয়ে দেখা যায়, দুই কক্ষের বাসার একটি কক্ষে সুমনের ছোটবোন সুবর্না বসে আছেন। ছেলের মৃত্যুতে বাবা-মা ভেঙে পড়ায় তাদেরকে গাজীপুরে গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন বলে ভাষ্য তার।

সুবর্না বলেন, “ভাইয়া ২২ তারিখ বাসা থেইকা সকালে বাইর হইয়া গেছে। কাউরে কিছু কইয়া যায় নাই। তারপর আর ফিরা আসে নাই।”

শুক্রবার লাশ এনে পার্শ্ববর্তী কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে বেশি বিস্তারিত জানতে তার খালু জুয়েল বাবুর সঙ্গে কথা বলতে অনুরোধ করেন সুবর্না।

তার কথামত কিছুটা দূরে তার খালু জুয়েল বাবুর বাসায় গিয়ে জানতে চাইলে তিনি নিখোঁজ থেকে লাশ পাওয়া পর্যন্ত ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দেন।

জুলেল বলছিলেন, সুমন ২২ তারিখ সকালে বাসা থেকে বের হলেও তার বোন সুবর্ণা রাত ১২টার দিকে তাকে ফোন করে সুমনের গ্রেপ্তারের খবর দেয়।

“আমাকে বলে তার ভাই ছাত্রলীগের মিছিলে গেছিল। অনেকরেই পুলিশ ধরেছে, যেহেতু সুমনকে পাওয়া যাচ্ছে না। সেহেতু তাকে সম্ভবতো গ্রেপ্তার করেছে। সুমনের সাথে থাকা পোলাপাইন না কি এলাকায় খোঁজ নিছে, এলাকায় বলাবলি হইতেছিল।”

পরদিন ২৩ জুন সুমনের বাসায় গিয়ে সবাইকে কান্নাকাটি করতে দেখেন তিনি। এরমধ্যে সুমনের মা আর মামা থানায় গেছেন। কিন্তু থানা পুলিশ তাদেরকে জানায়, সুমন নামে কাউকে তারা গ্রেপ্তার করেনি।

“নদীতে পড়ে গেছে, না কি হয়েছে সেটাও পুলিশ বলে নাই। একপর্যায়ে আমরাই খোঁজ নিতে নিতে গরুর হাটের ঘাটে যাই। সেখানে গিয়াও পুলিশ দেখছি। আমরা সুমনের খোঁজ করতেছি, কিন্তু পুলিশ আমাদেরকে কিচ্ছু বলে নাই।”

জুয়েল বলেন, “আমরাই একটা ট্রলার নিয়া খুঁজতে বাইর হইলাম। অনেকদূর যাইয়া একটা লাশ ভাইসা থাকতে দেখছি। আমরা লাশটার চারপাশে ভালো কইরা ঘুইরা ঘুইরা দেখছি, কিন্তু সুমন মনে হয় নাই। পরে আমরা ফোন কইরা আশুলিয়া থানারে জানাইলে তারা বলে তুরাগ থানা, তুরাগ থানায় ফোন করলে বলে ওইটা সাভার থানা এলাকার। পরে আমরা চইলা আসছি।”

পরদিনে ২৪ জুন সকালে আবার একইভাবে ট্রলার নিয়ে আমিনবাজার ঘাট পর্যন্ত যাওয়ার তথ্য দেন তিনি। সেদিন আমিনবাজার ঘাটের কাছাকাছি এলাকায় একটি লাশ উদ্ধার করে পুলিশকে পারে রাখতে দেখেছেন। তবে সেই লাশটিও সুমনের না হওয়ায় অনেক খোঁজাখোঁজির পর ফেরত যান।

তুরাগের রানাভোলা এলাকার সুমনের ভাড়া বাসা।

তুরাগের রানাভোলা এলাকার সুমনের ভাড়া বাসা।

২৫ জুন খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে তারা ভাবতে থাকেন, হয়তো সুমন ভয়ে আত্মগোপনে গেছেন।

জুয়েল বাবু বলেন, “রাত সাড়ে ১২টার দিকে পুলিশ সুমনের ভাই সালাউদ্দিনকে ফোন করে বলে একটা লাশ পাইছে। পরে আমরা গিয়া সুমনরে চিনতে পারছি। পুলিশ লাশ থানায় নিয়া গেল, আমরাও গেলাম। পরে পুলিশ কইলো ময়নাতদন্ত ছাড়া লাশ হস্তান্তর করবে না। পরে আমরা রাজি হইছি। পরে দুপুরের পর সুমনের ভাই সালাউদ্দিনরে কইলো একটা কাগজে সাইন করতে, করে আমরা সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে চলে যাই।”

ময়নাতদন্ত শেষে দুপুরের পর লাশ হাসপাতাল থেকে তাদেরকে বুঝিয়ে দিলে তারা নিয়ে এলাকায় চলে আসেন। গোসল করানো-কাফনের কাপড় বাবদ তারা ১০ হাজার টাকা নিয়েছেন বলেও দাবি তার।

সুমনের পিকনিকে যাওয়ার যে কথা পুলিশ বলছে, তারা এমন কিছু পুলিশকে বলেছেন কি না জানতে চাইলে জুয়েল বাবু বলেন, “না, আমরা পুলিশরে এমন কিছু বলি নাই। তবে তার ভাই সালাউদ্দিন ভয় পাইয়া প্রথম কয়েকজনরে বলছে পিকনিকের কথা। ভাবছে মিছিলের কথা কইলে যদি আবার কোনো ঝামেলা হয়।”

সুমনের লাশ উদ্ধারের আগের দিন ২৪ জুন রাতে আমিনবাজারের তুরাগ নদী থেকে একটি লাশ উদ্ধারের তথ্য দিয়েছে পুলিশ।

সাভার মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নূর মোহাম্মদ বলেন, লাশটি ঢাকার মনিপুর মোল্লাপাড়ার বাসিন্দা রনি মোল্লার (৩৫)। তার বাবা কফিল উদ্দিন মোল্লা। উত্তরার দিয়াবাড়ি এলাকায় একটি হোটেলে কাজ করতেন রনি।

“২৪ জুন রনির মৃত্যুর খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে জানতে পারি গোসল করার সময় তিনি তলিয়ে গিয়ে মারা গেছেন। এই ঘটনায় রাতেই নিহতের বাবা কফিল উদ্দিন মোল্লা বাদী হয়ে সাভার মডেল থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেছেন।”

একইদিন নৌ পুলিশ আরিফ হাসান রাকিব নামের একজনের লাশ উদ্ধার করে। আরিফ তুরাগ থানার রানাভোলা এলাকার বাসিন্দা।

এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হওয়ার তথ্য দিয়েছেন দারুস সালাম থানার ওসি মো. নাজমুল হাসান খান। তবে এর বেশি আর কোনো তথ্য দিতে চাননি তিনি।

আরিফের চাচা মো. আরশাদুল ইসলাম বলেন, “ছেলের জন্য আমার ভাই চলে যায় কি না, আল্লাহ জানে। বার বার সেন্সলেস হয়া যাইতেছে।”

ঘটনার বিষয়ে তিনি বলেন, “গত ২২ তারিখ সে বাসা থেকে বের হইয়া গেছে। বিকাল ৪ টার পর থেকে তার ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। আমরা খোঁজাখুঁজি করে পাই নাই। পরে পুলিশ তার ফোনের সিম খুইলা আমাদেরকে ফোন দিয়ে জানাইছে একটা ডেড বডি পাওয়া গেছে।

“আমরা ওখানে গেলে আমরা চিনতে পারছি। তারা ময়নাতদন্তের পরে আমাদেরকে লাশ হস্তান্তর করছে। আমার ভাই একটা অপমৃত্যুর মামলা করছে। এখন সে পানিতে ডুইবা মারা গেছে। আমরাতো এইটা দেখি নাই। কার বিরুদ্ধে মামলা করমু?”

স্থানীয় এমপি যা বলেছেন

সুমনের লাশ উদ্ধারের পর থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ফেইসবুক পেইজ বা আইডি থেকে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হামলার যে অভিযোগ ওঠেছে, সে বিষয়ে শনিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন। 

ঢাকা-১৮ আসনের ক্ষমতাসীন বিএনপির এই এমপি বলেছেন, ‘ডেইলি আজকের কণ্ঠ’ নামে একটি ফেইসবুক পেইজসহ কয়েকটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে তাকে জড়িয়ে ‘তুরাগ ট্র্যাজেডি’ শিরোনামে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার’ চালানো হচ্ছে।

এর নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেছেন, “কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে মিছিলের উদ্দেশ্যে নৌকারোহী কয়েকজন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী আশুলিয়া বাজার ঘাটের কাছে পৌঁছালে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে অভিযান পরিচালনা করেন। 

“এ সময় নৌকায় থাকা কয়েকজন দ্রুত পালানোর চেষ্টা করেন। তাড়াহুড়ার মধ্যে কয়েকজন আতঙ্কিত হয়ে তুরাগ নদীতে ঝাঁপ দেন এবং ঘটনাস্থল থেকে সাতজনকে আটক করা হয় বলে বিভিন্ন সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে।”

জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, “পরবর্তীতে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে নিখোঁজ হওয়া দুজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় আশুলিয়া থানায় অপমৃত্যুর মামলাও দায়ের করেছে নিহতের পরিবারের সদস্যরা।”

ঘটনাস্থল, মিছিলের স্থান, মরদেহ উদ্ধারের স্থান, একটিও তার নির্বাচনি এলাকায় নয় দাবি করে তিনি বলেন,  “ওই ঘটনায় আমার বা আমাদের কোনো নেতাকর্মীদের ন্যূনতম সংশ্লিষ্টতা নেই। তারপরও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আমাকে জড়িয়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।”

অপপ্রচারে জড়িতদের বিরুদ্ধে পুলিশের ব্যবস্থা গ্রহণের বার্তার বিষয়টি তুলে ধরে জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, “আমিও ব্যক্তিগতভাবে ইতোমধ্যে এই অপপ্রচার, মানহানি এবং মিথ্যা তথ্য প্রচারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছি এবং বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে এনেছি।” 

নৌকার মাঝি ‘ভয়ে’ পলাতক

সুমনের লাশ উদ্ধারের পর ঘটনা নিয়ে নানান আলোচনার মধ্যে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করে একটি গোয়েন্দা সংস্থা। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লাশ উদ্ধার হওয়া সুমন ও আরিফ ঘটনার দিন ট্রলারে ছিলেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২২ জুন দুপুর আড়াইটা থেকে ৩টার মধ্যে তুরাগ থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শফিকুল ইসলাম শফিকের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ২৫-৩০ জন নেতাকর্মী নৌকাযোগে আশুলিয়ার রুস্তমপুর ঘাট থেকে আশুলিয়া বাজার ঘাটে মিছিল করার উদ্দেশে যায়। 

ট্রলার মালিকের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

ট্রলার মালিকের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

পরে ট্রলারে থাকা নেতাকর্মীরা ট্রলার ভিড়িয়ে নামার চেষ্টা করলে পুলিশ সদস্যরা তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে ধাওয়া করে। এ সময় তারা পালানোর চেষ্টা করে, তবে তাড়াহুড়োর কারণে নৌকার নোঙর তুলতে ব্যর্থ হলে পুলিশ ধরে ফেলে। এ সময় ট্রলারে থাকা নেতাকর্মীরা আতঙ্কিত হয়ে নদীতে ঝাঁপ দেয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। এতে ট্রলারের মাঝি হিসেবে অজয় নামে একজনের কথা বলা হয়।

এ প্রতিবেদনের সূত্র ধরে রুস্তমপুর ঘাটে খোঁজ নিতে গেলে সেখানে খেয়া পারাপারে ব্যবহৃত ট্রলারটি বিজয় নামে একজন চালাচ্ছিলেন বলে সেখানকার দোকানি দেখিয়ে দেন। বিজয়ের ভাইয়ের নামই অজয়।

ওই ট্রলারে উঠে বিজয়কে তার ভাইয়ের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতেই তিনি বলেন, তারা দুই ভাই- বড় ভাই জয় আর তার নিজের নাম বিজয়। অজয় নামে তার কোনো ভাই নেই।

পার হওয়ার পর বিজয়ের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে সেখানকার ঘাটে কর্মরত একজন আবারও বলেন, বিজয়ের ছোট ভাইয়ের নাম অজয়।

কিছুক্ষণ পর ট্রলারে যাত্রী পারাপার বন্ধ রাখার বিরতিতে বিজয় রাজবংশী নামে ওই মাঝিকে আবারো জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, “ঘটনার পর থেইকা অনেকেই কম বেশি জিজ্ঞাসা করে। সবার কাছে সব কথা কওয়া যায় না। বাসায় কালও (শনিবার) আছিল। আমার ভাইকে সেভমতো রাখছি। আমরা বলছি যে, কোনো জায়গা থেকে বেড়ায়ে আয়।”

শনিবারও তার খোঁজে পুলিশ গিয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, “যে ট্রলার নিয়ে সেদিন নিয়া গেছিল তার মালিক আম্বর আলী। আমার ভাইরে বলছে একটু চালাইয়া দিতে, হেয় সরল মনে গেছে। হেয়তো এতকিছু জানে না। পুলিশ দেইখা হেয়ও ফাল দিয়া সাঁতরাইয়া আইয়া পরছে।

“কাইলকা পুলিশ আইছিল। পুলিশ দেইখা আম্বরআলী ট্রলার থেকেইকা ফাল মাইরা গেছেগা। আমার ভাই ঘাটে বহা আছিল। কিন্তু আম্বরআলীরে না পাইয়া তার ট্রলারের এক সহকারীকে নিয়া যায়। হেয়তো কিছুই যানে না, পরে ফেরত দিয়া গেছে। তারা আমার ভাইরেও আর চিনতে পারে নাই। পরে আমরা তারে পাঠাইয়া দিছি।”

ঘটনার দিনের বর্ণনায় ছোটভাই অজয় তাকে যা বলেছে তার ভিত্তিতে তিনি আরও বলেন, “ট্রলার ভিড়ার পরেই পুলিশ আইসা ধাওয়া দিছে। তখন আমার ভাইসহ অনেকেই লাফ দিছে। পরে পুলিশ কয়েকজনরে ধরছে শুনছি।”

আম্বর আলীর ‘তানভীর ওয়ার্কশপের’ দেওয়া ব্যানার থেকে তার নম্বরে যোগাযোগ করলে দুটি নম্বরই বন্ধ পাওয়া গেছে।

নদীতে তল্লাশি করেনি কেউ

ঘটনার দিন অনেকে নদীতে ঝাঁপ দিলেও কেউ নিখোঁজ আছে কি না কিংবা তাদের কেউ তলিয়ে গেছে কি না সে বিষয়ে তৎপর হয়নি পুলিশ। তারা বরং ট্রলারে ঘুরে ঘুরে আরো কয়েকজনকে পানি থেকে তুলে নিয়ে যায়।

ঘটনাস্থল ও আশেপাশের এলাকাটি টঙ্গী ফায়ার স্টেশনের আওতাধীন। ঘটনার দিন তাদেরকে নদীতে নিখোঁজের বিষয়ে পুলিশের তরফে বা কারো তরফে অবগত করা হয়েছিল কি না জানতে চাইলে সেখানকার ডিউটি অফিসার সবুজ ২২ জুনের রেজিস্ট্রার দেখে বলেছেন, নদীতে পড়ছে এমন কোনো রিপোর্ট তাদের কাছে হয়নি।

আশুলিয়া বাজারেই পুলিশ ফাঁড়ি অবস্থিত, ঘটনার দিন ধাওয়া করা পুলিশ দলের সঙ্গে এএসআই আশরাফ, সোহেলসহ ওই ফাঁড়ির অনেকেই ছিল বলে জানিয়েছেন সেখানকার ইনচার্জ এসআই মাহবুব উল্লা সরকার।

ঘটনার বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে মাঠের সদস্যরা ইনচার্জকেই রিপোর্ট করার কথা। কিন্তু এসআই মাহবুব বলেন, “তারা মিছিল করতেছিল, মিছিল করার সময় ৭ জনকে ধরে আনছে। এটাই আমাকে জানাইছে। আমাকে যেটা জানাইছে সেটাই আমি বলব।”

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় ধাওয়ার পর ট্রলার থেকে ঝাঁপিয়ে নদীতে পড়ার পর এ ড্রেজারে উঠেছিলেন কয়েকজন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় ধাওয়ার পর ট্রলার থেকে ঝাঁপিয়ে নদীতে পড়ার পর এ ড্রেজারে উঠেছিলেন কয়েকজন।

সেখানে কোনো মিছিল হতে প্রত্যক্ষদর্শীরা দেখেননি জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ওই মিছিলের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।”

তবে ট্রলার দেখে পুলিশ সদস্যদের ধাওয়ার বিষয়ে তার কোনো ‘ধারণা নেই’ বলে দাবি করেন তিনি।

তার ভাষ্য, “এমনকি কেউ নিখোঁজ রয়েছে কি না সেই অভিযোগ নিয়ে তার কাছে কেউ যায়নি, শুধু ২৫ জুন রাতে সুমনের লাশ উদ্ধার হয়েছে।”

সেখানে পুলিশের কতজন সদস্য ছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমার সঠিক জানা নাই, থানার লোকও ছিল।”

পুলিশের বাইরে অন্যান্য লোকের উপস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলেও ‘জানা নেই’ বলে এড়িয়ে যান তিনি।

তার সুরেই সুর মিলিয়ে ঢাকা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “পুলিশের ধাওয়া খেয়ে নদীতে পড়ে গেছে- এটা আমার জানা নেই।”

প্রত্যক্ষদর্শীর কথা তুলতেই তিনি বলেন, “আমিতো প্রত্যক্ষদর্শী ছিলাম না। সুতরাং আমি এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারব না। আমার অফিসার থেকে আমি যেটা তথ্য পাই, সেটাই জানি। এর চেয়ে বেশি কিছু জানার কথা না।”

বিএনপি বা সেখানকার অঙ্গ সংগঠনের কোনো লোক সেখানে উপস্থিত ছিল কি না জানতে চাইলে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা এবং আশুলিয়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যান নির্বাচনে ইচ্ছুক নূরু সরকার বলেন, “খবরটা আজকে আমি ফেইসবুকে পাইলাম। আমাদের এমন কোনো দলীয় নির্দেশনা ছিল না।”

আইনজীবীর চোখে পুলিশের ‘ধাওয়া’

এ ঘটনার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, তারা (ট্রলারে থাকা ব্যক্তিরা) ঘাটে ওঠার আগেই যদি পুলিশ ধাওয়া দেয়, তাহলে তাদের পরিচয়ের বিষয়েতো পুলিশ নিশ্চিত হওয়ার কথা না। আইনশৃঙ্খলার ব্যত্যয় ঘটলে পুলিশের ব্যবস্থা নেওয়ার আইন আছে, কিন্তু কোন তথ্যের ভিত্তিতে তারা ব্যবস্থা নিল বিষয়টি তাদেরকেই ‘জাস্টিফাই করতে হবে’।

“নৌকাতে সাধারণ নাগরিক ছিল, না কে ছিল? কি ছিল সেটা তো তারা কিছু না জেনেই তো আসলে ব্যবস্থা নিল। সাধারণ নাগরিককে ধাওয়া দেওয়ার পরে পানিতে পড়ে গেল না কি হইলো? তাদের নিরাপত্তার কি হইল? সে বিষয়ে আসলে খোঁজখবর করা থেকে শুরু করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব তো পুলিশের।”

ধাওয়া দেওয়ার অভিযোগ এবং এরপরে নিখোঁজের বিষয়ে পুলিশের কোনো তৎপরতা না থাকার এমনকি স্বীকার না করার বিষয়ে তিনি বলেন, “এগুলো ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইনভেস্টিগেশন হওয়া দরকার। আমি মনে করি যে এগুলার একটা জুডিশিয়াল ইনকোয়ারি হওয়া দরকার। এদের কার কি দায়িত্ব? আদৌ কে কে মিসিং। কেউ এখন মিসিং হলে হয়তো কমপ্লেন করার সাহসও করবে না। কিন্তু যদি ইনকয়ারি হলে তারা বলতে পারবে।”

আরও পড়ুন

তুরাগে দুজনের লাশ: রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ‘দেখছেন না’ ঢাকার এসপি

তুরাগে ৭ লাশ ভাসার খবর 'ভিত্তিহীন', পুলিশ সদর দপ্তরের দাবি

'তুরাগের ঘটনা' ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ জয়ের

তুরাগে ‘পিকনিকে গিয়ে ট্রলার থেকে পড়ে নিখোঁজ’ তরুণের লাশ উদ্ধার