Published : 29 Jun 2026, 10:37 PM
দুই মেয়েকেই চিকিৎসক হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন অবসরপ্রাপ্ত কলেজশিক্ষক আব্দুর রশিদ।
মেয়েদের প্রতিষ্ঠিত জীবনই যেখানে তার বার্ধক্যের সবচেয়ে বড় স্বস্তি হওয়ার কথা সেখানে বড় মেয়ে ৩২ বছর বয়সি ফারা ফেরদৌসের রহস্যজনক মৃত্যু তাকে হতবিহ্বল করে দিয়েছে।
রাজধানীর শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেট ভবনে একটি ফ্ল্যাট থেকে শুক্রবার উদ্ধার করা হয় এই চিকিৎসকের পচনধরা মরদেহ।
ফারা ফেরদৌস ৩৯তম বিসিএসের মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়-বিএমইউতে ‘কার্ডিওভাসকুলার’ বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন তিনি। তার গ্রামের বাড়ি খুলনার ফুলতলা উপজেলায়।
এই চিকিৎসকের মরদেহ উদ্ধারের পর শোকে স্তব্ধ হয়ে আছেন তার মা ও বাবা। সব দায়িত্ব এখন একাই সামলাচ্ছেন ছোট মেয়ে নঝুলা ফেরদৌস।
নঝুলাও ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করে বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর পড়াশোনার পাশাপাশি চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন।
রোববার ও সোমবার একাধিকবার নঝুলা এবং তার বাবা আব্দুর রশিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। প্রতিবারই ফোন ধরেন নঝুলা। তিনি বলেন, “আমরা এখন কেউই কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। বাবার অবস্থাও ভালো না। কেউ কথা বলতে পারবেন না।”
ফারার মৃত্যু নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা ও জল্পনা তৈরি হলেও পুলিশ বলছে, প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে হত্যাকাণ্ড বলে মনে করার মতো কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরে আজিজ সুপার মার্কেটের ওই ফ্ল্যাটে একাই বসবাস করে আসছিলেন ফারা। মরদেহ উদ্ধারের আগে কয়েকদিন ধরে পরিবারের সদস্যরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিলেন না। ফোন, বার্তা—কোনো কিছুরই সাড়া দিচ্ছেলেন না তিনি।
উদ্বিগ্ন হয়ে শুক্রবার সেখানে যান ছোট বোন নঝুলা। গিয়ে দেখেন, কক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। বাইরে তীব্র দুর্গন্ধও পাওয়া যাচ্ছিল। পরে আশপাশের লোকজনের সহায়তায় পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে মরদেহ উদ্ধার করে।
তখন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন শাহবাগ থানার এসআই একরামুল হক।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “খাটের ওপর বসা অবস্থায় টেবিলের ওপর মাথা রাখা ছিল ফারা ফেরদৌসের। দীর্ঘ সময় ধরে মরদেহ পড়ে থাকায় সেটি অর্ধগলিত হয়ে যায়।”
এসআই একরাম বলেন, শরীর ফুলে ও পচে যাওয়ায় বাহ্যিকভাবে কোনো আঘাতের চিহ্ন শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
পুলিশ বলছে, কক্ষের ভেতরে শতাধিক বই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। খাটে একটি মানিব্যাগ ও চিপসের বক্স এবং টেবিলে একটি লাইটার ও সিগারেট পাওয়া যায়। ইনজেকশনের একটি ভাঙা ভায়ালও পাওয়া গেছে। তার পরনে ছিল একটি ম্যাক্সি এবং মাথায় গামছা জড়ানো ছিল।
পুলিশ দাবি করেছে, ভায়ালটি ব্যাথানাশক ইনজেকশনের।

এসআই একরামুল বলেন, “প্রাথমিকভাবে স্ট্রোক বা অন্য কোনো স্বাভাবিক শারীরিক জটিলতার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন প্রয়োজন।”
ঘটনার দিন থেকেই পরিবারটির পাশে আছেন নঝুলার সহকর্মী ফকর উদ্দীন।
সোমবার সকালে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই নঝুলার বাবা-মা গভীর শোকে আছেন। কথা বলার অবস্থায় নেই। পরিবারের সব দায়িত্ব এখন নঝুলাই সামলাচ্ছে। পরিবারে বাবা-মা আর দুই বোন—এতটুকুই ছিল। এমন একটি মৃত্যু তাদের পুরো পরিবারকে ভেঙে দিয়েছে।”
ফারার ব্যক্তিগত জীবন বা মানসিক অবস্থা নিয়ে পরিবারের কোনো সন্দেহ ছিল কি না—এমন প্রশ্নে ফকর উদ্দীন বলেন, “নঝুলার কাছ থেকে যতটুকু জেনেছি, পরিবারের সঙ্গে ফারার সম্পর্ক খুবই ভালো ছিল। চিকিৎসক হওয়ায় অনেক সময় অপারেশন বা ব্যস্ততার কারণে ফোন ধরতে পারতেন না। তবে পরে সুযোগ হলেই পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। ব্যক্তিগত কোনো হতাশা বা অস্বাভাবিক আচরণের কথা পরিবার কখনও বলেনি।”
অন্যদিকে এসআই একরামুল হক বলেন, “আমরাও পরিবারের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, তার কোনো মানসিক চাপ, হতাশা বা অন্য কোনো সমস্যা ছিল কি না। তবে এ বিষয়ে পরিবার বিস্তারিত কিছু বলতে চায়নি।”
সুরতহাল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মরদেহে দৃশ্যমান বড় ধরনের কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। দীর্ঘ সময় পড়ে থাকায় মুখমণ্ডলসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে পচন ধরে এবং কয়েকটি স্থানে চামড়া উঠে যায়।
ফারার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় শাহবাগ থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে।
মামলাটি তদন্ত করছেন উপপরিদর্শক মারুফা আক্তার। তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রাথমিক তদন্তে মৃত্যুর কারণ হিসেবে আমরা সন্দেহজনক কিছু পাইনি।
“ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্য, স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে কথা বলে তার ব্যাপারে কোনো ধরনের নেগেটিভ কিছুও পাইনি। এখন পুরো বিষয়টাই নির্ভর করছে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের ওপর৷ তখন যদি সেরকম কিছু পাওয়া যায় তাহলে নিয়মিত মামলায় রূপান্তরিত হবে।”