Published : 08 Mar 2026, 01:02 PM
দেশের বিভিন্ন এলাকায় গত কয়েকদিনে অদ্ভুত প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অনেকে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল কিনে গাড়ি বা মোটরসাইকেলের ট্যাঙ্ক ভরে রাখছেন। কোথাও কোথাও আবার দিনের মধ্যে একাধিকবার পেট্রোল পাম্পে গিয়ে তেল নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
দিন ও রাত জুড়ে পাম্পগুলোর সামনে গাড়ি ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন চোখে পড়ার মতোই।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানান গুজব, সম্ভাব্য সংকটের আশঙ্কা কিংবা দাম বাড়ার ভয়— এসব কারণে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে তেল মজুত করছেন।
শুধু ঢাকা নয় দেশের বিভিন্ন স্থানেও পেট্রোল পাম্পে এ ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলের চালকেরা ট্যাঙ্ক পুরো ভরে রাখার পাশাপাশি অতিরিক্ত তেলও জমিয়ে রাখছেন।
তবে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের মনোবিজ্ঞানী নাদিয়া নাসরিন বলছেন, “এই ধরনের আচরণকে বলা হয় ‘প্যানিক বাইং’ বা আতঙ্কজনিত কেনাকাটা। এতে সাময়িকভাবে মানুষের মনে নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি হলেও বাস্তবে এটি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।”
আতঙ্কিত কেনাকাটা আসলে কী?
‘প্যানিক বাইং’ বা আতঙ্কে অতিরিক্ত কেনাকাটা হল এমন একটি আচরণ, যখন ভবিষ্যতে কোনো পণ্যের ঘাটতি হবে বা দাম হঠাৎ বেড়ে যাবে— এমন আশঙ্কায় প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি পণ্য কিনে ফেলা হয়।
সাধারণত অনিশ্চয়তা, গুজব, সামাজিক চাপ বা সংকটের আশঙ্কা থেকে এই আচরণ তৈরি হয়।
বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সংকটের সময় এ ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। যেমন- মহামারি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা জ্বালানির বাজারে অস্থিরতার সময় হঠাৎ করে প্রয়োজনের অতিরিক্ত জিনিস কিনে জমিয়ে রাখার প্রবণতা দেখা দেয়।
এতে অনেক সময় কৃত্রিম সংকটও তৈরি হয়, কারণ বাজারে চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়।
তেল ও গ্যাসের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটছে বলে মত দেন, এই বিশেষজ্ঞ।
যে কারণে এই প্রবণতা তৈরি হয়
মনস্তত্ত্বের সঙ্গে এই আচরণের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যখন মানুষ অনিশ্চয়তা অনুভব করে, তখন তারা এমন কিছু করতে চায় যাতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আছে বলে মনে হয়।
অতিরিক্ত জ্বালানি কিনে রাখা অনেকের কাছে নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি করে।
আরেকটি বড় কারণ হল- গুজব ও তথ্যের ঘাটতি। অনেক সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অসম্পূর্ণ বা ভুল তথ্য মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করে। ফলে একজন যখন অতিরিক্ত তেল কেনেন, অন্যরাও একই কাজ করতে শুরু করেন।
এতে একটি সামাজিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
তবে বাস্তবে এই ধরনের আচরণ পরিস্থিতিকে আরও চাপের মধ্যে ফেলতে পারে। কারণ অল্প সময়ের মধ্যে চাহিদা বেড়ে গেলে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়।

অপ্রয়োজনীয় মজুতের ঝুঁকি
গাড়ি বা মোটরসাইকেলের জন্য অতিরিক্ত তেল জমিয়ে রাখা নিরাপদও নয়। অনেক সময় বোতল বা কন্টেইনারে তেল সংরক্ষণ করে রাখা হয়, যা অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়ায়।
“এছাড়া দীর্ঘদিন রেখে দিলে তেলের মানও নষ্ট হতে পারে”- বলেন, কল্যাণপুরের একটি পেট্রোল পাম্পের কর্মী মনির হাসান।
এছাড়া অতিরিক্ত তেল মজুত করার ফলে পাম্পে ভিড় বাড়ে। ফলে যাদের সত্যিই প্রয়োজন, তাদের জন্য জ্বালানি পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে।
যেভাবে যানবাহনে তেল সাশ্রয় হবে
জ্বালানি সাশ্রয়ের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হল- সচেতনভাবে গাড়ি চালানো। ছোট ছোট অভ্যাস পরিবর্তন করলেই তেলের ব্যবহার অনেকটাই কমে যায়, মত দেন ব্যক্তিগত গাড়ি চালক আহমেদ রেজা।
তিনি বলেন, “গাড়ি চালানোর সময় হঠাৎ দ্রুত গতি বাড়ানো বা বারবার ব্রেক করার অভ্যাস থাকলে তেল বেশি খরচ হতে পারে। ধীরে এবং স্থির গতিতে গাড়ি চালালে জ্বালানি কম লাগে। একইভাবে দীর্ঘ সময় ইঞ্জিন চালু রেখে দাঁড়িয়ে থাকাও তেলের অপচয় বাড়ায়।”
আবার ট্রাফিক সিগনালে বা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হলে, ইঞ্জিন বন্ধ করে রাখলে জ্বালানি সাশ্রয় করা সম্ভব।
নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের গুরুত্ব
“গাড়ির সঠিক রক্ষণাবেক্ষণও জ্বালানি সাশ্রয়ে বড় ভূমিকা রাখে। অনেক সময় ইঞ্জিন ঠিকমতো টিউন না করা, পুরানো স্পার্ক প্লাগ বা অপরিষ্কার এয়ার ফিল্টারের কারণে তেলের খরচ বেড়ে যায়” বলেন মোহাম্মদপুর এলাকার গাড়ি মেকানিক আসাদ আলী।
গাড়ির টায়ারের বাতাস ঠিক না থাকলেও জ্বালানি বেশি লাগে। তাই নিয়মিত টায়ারের চাপ পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
“টায়ার কম ফুলে থাকলে ইঞ্জিনকে বেশি শক্তি প্রয়োগ করতে হয়, ফলে তেল বেশি খরচ হয়”- বলেন তিনি।
অপ্রয়োজনীয় ওজন কমান
গাড়িতে অতিরিক্ত ভারী জিনিস বহন করলে জ্বালানির ব্যবহার বেড়ে যায়। অনেক সময় গাড়ির ‘বুটে’ অপ্রয়োজনীয় জিনিস দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকে। এসব সরিয়ে ফেললে গাড়ি হালকা থাকে এবং তেল কম খরচ হয়।
ছাদে লাগানো অতিরিক্ত ক্যারিয়ার বা ভারী জিনিসও জ্বালানির খরচ বাড়াতে পারে।

ভ্রমণ পরিকল্পনা
একই দিনে একাধিক ছোট ছোট যাত্রা করার বদলে পরিকল্পনা করে একবারে কয়েকটি কাজ সেরে ফেললে জ্বালানি কম লাগে। অনেক সময় কাছাকাছি জায়গায় হাঁটাও ভালো বিকল্প হতে পারে।
আবার শহরের ভেতরে যাতায়াতের ক্ষেত্রে গণপরিবহন ব্যবহার করলে জ্বালানির সামগ্রিক ব্যবহারও কমে।
আরও পড়ুন
দেশের ভেতরে ভ্রমণে সাশ্রয়ী হওয়ার কৌশল