Published : 23 Jun 2026, 06:09 PM
ফ্রান্সসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশ সরকারি ডিজিটাল অবকাঠামোয় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রযুক্তি কোম্পানির ওপর নির্ভরতা কমানোর দিকে এগোচ্ছে। এই পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে যে প্রশ্নটি ইউরোপীয় নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে সেটি হচ্ছে ‘ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব’ বা প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কোনো হঠাৎ সিদ্ধান্ত নয়, বরং দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা, আইনি কাঠামো এবং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সমন্বিত ফল।
পরিকল্পনা: ধাপে ধাপে পরিবর্তন
ফ্রান্স সরকার সরকারি ব্যবস্থায় উইন্ডোজসহ মার্কিন সফটওয়্যারের ওপর নির্ভরতা কমানোর একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে লিনাক্স ও ওপেন সোর্স সফটওয়্যার ব্যবহারের দিকে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে সে দেশের সরকার।
টেক ক্রাঞ্চের প্রতিবেদন বলছে, ফরাসি সরকার জুম এবং মাইক্রোসফট টিমসকে প্রতিস্থাপন করবে তাদের নিজস্ব দেশীয়ভাবে তৈরি ভিডিও কনফারেন্সিং সফটওয়্যার ভিসিও। এ নিয়ে ঘোষণা দিয়েছেন ফরাসি সিভিল সার্ভিস ও স্টেট রিফর্ম মন্ত্রী ডেভিড অ্যামিয়েল।
একই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বেলজিয়ামের সাইবার নিরাপত্তা প্রধান মিগুয়েল ডি ব্রুইকার সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন যে, ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে 'ইন্টারনেট হারিয়েছে'।
উইন্ডোজ থেকে লিনাক্সে
ফ্রান্স সরকারি পর্যায়ে উইন্ডোজ থেকে লিনাক্সভিত্তিক সিস্টেমে স্থানান্তরের পরিকল্পনা শুরু করেছে।
টেকক্রাঞ্চের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্রান্সের ডিজিটাল প্রশাসন ডিনাম (ডিআইএনইউএম) সরকারি দপ্তরগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে, “সব মন্ত্রণালয়কে ২০২৬ সালের শরতের মধ্যে মাইগ্রেশন পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।”
একই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এই পরিবর্তন শুধু অপারেটিং সিস্টেম নয়, বরং “ক্লাউড, ডেটাবেইজ, সহযোগিতা সফটওয়্যার এবং অন্যান্য অবকাঠামোকেও অন্তর্ভুক্ত করছে।”
কেন ইউরোপের এই উদ্বেগ?
নেচারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপে ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব নিয়ে আলোচনার পেছনে বড় কারণ হলো রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও প্রযুক্তি নির্ভরতা।
প্রতিবেদনটি বলছে, “রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলালে গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল সেবা বন্ধ হয়ে যেতে পারে”- এমন ঝুঁকিই ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকদের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে।
এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাউড অ্যাক্ট নিয়েও দীর্ঘদিনের উদ্বেগ রয়েছে। এই আইনের আওতায় মার্কিন কোম্পানিগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের নির্দেশে ডেটা সরবরাহ করতে হতে পারে, এমনকি ডেটা বিদেশে সংরক্ষিত থাকলেও।
সেই কোম্পানিগুলো কারা? মাইক্রোসফট, ওরাকল, গুগল, ফেইসবুক, টুইটারসহ নানা প্রযুক্তি কোম্পানি যাদের কাছে সাধারণ মানুষের থেকে শুরু করে সরকারি ডেটা থাকে।
ইউরোপজুড়ে বিচ্ছিন্ন নয়, ধাপে ধাপে পরিবর্তন
ওয়ার্ডের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইউরোপের বিভিন্ন সরকার এখন ডিজিটাল নীতিতে ‘স্বাধীনতা’ এবং ‘ঝুঁকি কমানো’কে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
প্রতিবেদনে কারণ হিসাবে উল্লেখ রয়েছে, “ইউরোপের বড় অংশের ডিজিটাল অবকাঠামো এখনো মার্কিন কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে।”
আর এ নিয়ে ওয়্যার্ডের প্রতিবেদন ব্যাখ্যা করে বলছে, এটি কেবল সফটওয়্যারের বিষয় নয়। ডাচ সরকার মাইক্রোসফটের মালিকানাধীন গিটহাব থেকে তাদের কোড সরিয়ে নিচ্ছে। একাধিক সিদ্ধান্তে, ফিনল্যান্ড তার নির্বাচনী তথ্য অ্যামাজনের ক্লাউড পরিষেবাগুলিতে না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বেলজিয়ামের ডটবিই টপ ডোমেইনের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি বলেছে তারা ‘অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস’ থেকে সরে যাবে।
তবে, এগুলো ইইউ-এর কোনো সমন্বিত নিষেধাজ্ঞা বা দ্রুত বিচ্ছিন্নতার সিদ্ধান্ত নয়, বরং দেশভিত্তিক ধাপে ধাপে পরিবর্তনের প্রক্রিয়া।
বাস্তবতা: বিচ্ছিন্নতা নয়, নিয়ন্ত্রণের পুনর্বিন্যাস
টেকরিপাবলিকের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইউরোপের এই নীতিগত পরিবর্তনের লক্ষ্য মার্কিন প্রযুক্তিকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া নয়।
এ মাসের শুরুতে ইইউ ইউরোপীয় প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্ব প্যাকেজ উন্মোচন করেছে। ইউরোপিয়ান কমিশন বলছে, এ প্যাকেজ ‘সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং আমেরিকার ও চীনা প্রুক্তির ওপর অত্যাধিক নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা।’
ফ্রান্স ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রযুক্তি নীতিতে পরিবর্তন বাস্তব এবং ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। তবে সামাজিক মাধ্যমে যেভাবে ‘হঠাৎ নিষেধাজ্ঞা’ বা ‘একযোগে মার্কিন প্রযুক্তি বন্ধ’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, বাস্তব চিত্র তার চেয়ে অনেক বেশি পরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদি।
ইউরোপের মূল লক্ষ্য এখন প্রযুক্তি থেকে বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং নিয়ন্ত্রণ ও নির্ভরতার ভারসাম্য পুনর্গঠন।