Published : 22 Jun 2026, 11:53 AM
দক্ষিণ কোরিয়ার চিপ শিল্পের কর্মীদের রেকর্ড পরিমাণ বোনাস পাওয়ায় দেশটিতে মূল্যস্ফীতি বা পণ্যের দাম বাড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে বলে সতর্ক করেছে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
খুব কম চাকরিজীবীই বুক ফুলিয়ে বলতে পারেন যে তাদের বোনাসের পরিমাণ এতটাই বড়, যা দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরও নজরে আসে। দক্ষিণ কোরিয়ায় এ অভাবনীয় ঘটনাই এখন বাস্তবে ঘটছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে আমেরিকান সংবাদমধ্যম সিএনবিসি।
দেশটির প্রযুক্তি খাতের কর্মীদের লাখ লাখ ওউনের মোটা অংকের বোনাস সার্বিক বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে, যা বোনাস দক্ষিণ কোরিয়ার মূল্যস্ফীতি বা পণ্যের দাম আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে সতর্ক করেছে খোদ ‘ব্যাংক অফ কোরিয়া’।
বুধবার এক প্রতিবেদনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকটি বলেছে, এ বছর মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির প্রধান কারণ ছিল ইরান যুদ্ধের দরুণ জ্বালানি তেলের দামবৃদ্ধি। যুদ্ধ পরিস্থিতি চলে গেলেও মানুষের আয় বৃদ্ধি এবং মজুরি বাড়ার কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ ক্রমান্বয়ে বাড়তে পারে।
ব্যাংক অফ কোরিয়া বলেছে, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের শীর্ষ কিছু কোম্পানিতে সম্প্রতি যে মোটা অংকের বোনাস দিয়েছে তা অন্যান্য খাতেও মজুরি বাড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা তৈরি করতে পারে, যেটিই শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতিকে ওপরের দিকে ঠেলে দিতে ভূমিকা রাখবে।
এমন সময়ে এ পরিস্থিতি তৈরি হল যখন দক্ষিণ কোরিয়া এরইমধ্যে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ব্যাংক অফ কোরিয়ার পূর্বাভাস বলছে, এ বছরে পূর্ণাঙ্গ মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়াতে পারে ২ দশমিক ৭ শতাংশ, যা তাদের নির্ধারিত ২ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশ ওপরে।
দেশটির বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানি, বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ শিল্পের দুই জায়ান্ট ‘এসকে হাইনিক্স’ ও ‘স্যামসাং ইলেকট্রনিক্স’-এর কর্মীদের মোটা অংকের বোনাস দেওয়ার খবর সামনে আসার পরই কেন্দ্রীয় ব্যাংক এমন পর্যবেক্ষণ দিল।
এসব কোম্পানির পক্ষ থেকে বোনাসের সঠিক অংকটি প্রকাশ করা না হলেও গেল বছরের সেপ্টেম্বরে এসকে হাইনিক্স এমন এক মজুরি চুক্তিতে রাজি হয়, যেখানে কোম্পানিটির পরিচালন মুনাফার ১০ শতাংশ কর্মীদের বোনাস হিসেবে দেওয়া হবে।
অন্যদিকে, মে মাসে একটানা ১৮ দিনের ধর্মঘটের হুমকি দেওয়ার পর স্যামসাংয়ের কর্মীরাও একটি চুক্তিতে পৌঁছায়, যেখানে বলা হয়েছে, সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ খাতের পরিচালন মুনাফার ১০ দশমিক ৫ শতাংশ দেওয়া হবে এ বিভাগের কর্মীদের বিশেষ বোনাস হিসেবে।
রয়টার্সের বরাত দিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ইউনিয়ন সূত্র বলেছেন, ৮০ মিলিয়ন ওউন বা প্রায় ৫২ হাজার ৪০০ ডলার মূল বেতন পাওয়া একজন মেমরি চিপ কর্মী এ বছরে মোট বোনাস হিসেবে প্রায় ৬২৬ মিলিয়ন ওউন বা প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার ডলার পাবেন।
রয়টার্সের হিসাব অনুসারে, এসকে হাইনিক্স যদি এ বছর ২৫০ ট্রিলিয়ন ওউন বার্ষিক মুনাফা পায় তবে তাদের কর্মীরা ৭০০ মিলিয়ন ওউন বা প্রায় ৪ লাখ ৫৪ হাজার ৮৫১ ডলারের বেশি বোনাস পাবেন।
ব্যাংক অফ কোরিয়া বলেছে, সাধারণত বোনাস স্থায়ী আয়ের অংশ না হওয়ায় তা বাজারের চাহিদাজনিত দামের ওপর খুব বেশি চাপ তৈরি করে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকটি বলেছে, ‘বিশেষ বোনাসের পরিমাণ অস্বাভাবিক ও ব্যাপকভাবে বেড়ে গেলে’ মজুরি বৃদ্ধির এ ধারা অন্যান্য খাতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা সরবরাহ ও চাহিদা উভয় দিক থেকেই মূল্যস্ফীতির চাপকে বাড়িয়ে তোলে।
“সাম্প্রতিক সময়ে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে যেভাবে নজিরবিহীন স্কেলে পারফরম্যান্স বোনাস দেওয়া হয়েছে তাতে বাজারে এর প্রকৃত প্রভাব যে পূর্বাভাসের চেয়েও বেশি হতে পারে সেই সম্ভাবনাকে কোনোভাবেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না।”

খুচরা ব্যবসায়ীদের মধ্যে উল্লাস
কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন এ নিয়ে চিন্তিত তখন কিছু ব্যবসায়ী এরইমধ্যে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন যাতে চিপ কর্মীরা তাদের বোনাসের অর্থ নিজেদের দোকানে এসে খরচ করেন।
বুধবার ব্যাংক অফ কোরিয়ার ডেপুটি গভর্নর লি জিহো বলেছেন, “সুওন শহরের মতো বিভিন্ন এলাকা ও ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলোর বিলাসবহুল পণ্যের সেকশনে বিক্রি বেড়েছে, যা ধীরে ধীরে আরও ছড়িয়ে পড়বে।”
দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রযুক্তি খাতের কিছু কর্মী ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলো থেকে দামি ব্যাগ, গয়না ও ঘড়ির মতো বিলাসবহুল পণ্য কেনার পেছনে দেদারসে অর্থ খরচ করছেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, জিয়ংগি প্রদেশে স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্সের প্রধান সেমিকন্ডাক্টর কারখানাগুলো অবস্থিত, সেখানে এ বছর চিপ উৎপাদন কেন্দ্র এবং এর আশপাশের আবাসিক এলাকাগুলোতে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে খরচের হার অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বেশি।
দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদমাধ্যম চোসান ইলবো প্রতিবেদনে লিখেছে, দক্ষিণ জিয়ংগি অঞ্চলে স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্সের সদর দপ্তর রয়েছে, সেখানে বিলাসবহুল পণ্যের ব্যবহার ‘দ্রুত বাড়ছে’।
অভিজাত পণ্য ব্যবহারের এ জোয়ার আরও শক্তিশালী হবে এমন আশার ওপর ভর করে দক্ষিণ কোরিয়ার বড় বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোর অপারেটরদের শেয়ারের দামও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।
যেমন, লটে গ্রুপের খুচরা ব্যবসায়িক কোম্পানির ‘লটে শপিং’ শেয়ারের দাম এ বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ১৪৮ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে, যার মধ্যে গত তিন মাসেই বেড়েছে ৬৭ শতাংশ।
‘হুন্দাই ডিপার্টমেন্ট স্টোর’-এর এদের শেয়ারের দাম বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ১২০ শতাংশ বেড়েছে, যার মধ্যে গত তিন মাসেই এসেছে রেকর্ড ১১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি।
সবাইকে ছাড়িয়ে ‘শিনসেগে’ কোম্পানির শেয়ারের দাম বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ১৯০ শতাংশ বেড়েছে। এর বড় অংশই এসেছে সাম্প্রতিক সময়ে, যার মধ্যে গত তিন মাসেই শেয়ারের দাম বেড়েছে ১০৭ শতাংশ।