Published : 22 Jun 2026, 04:14 PM
২০ বছরেরও বেশি সময় পর দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজারে শীর্ষস্থান হারাল স্যামসাং। বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই জোয়ারে ভর করে স্যামসাং ইলেকট্রনিক্সকে টপকে দেশটির সবচেয়ে দামি কোম্পানি এসকে হাইনিক্স।
দুই দশক আগে ঋণের বোঝায় প্রায় দেউলিয়া হতে যাওয়া এ চিপ নির্মাতা কোম্পানিটির জন্য এ এক নাটকীয় ভাগ্যবদল বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
কোম্পানিটি এখন মার্কিন চিপ নির্মাতা এনভিডিয়া ও গুগলের মূল কোম্পানি অ্যালফাবেটের মতো গ্রাহকদের এআই সিস্টেমে ব্যবহৃত ‘হাই-ব্যান্ডউইথ মেমোরি’ চিপের প্রধান সরবরাহকারী।
বিশ্বজুড়ে চলমান এআই বিপ্লবের অন্যতম বড় সুবিধাভোগী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এসকে হাইনিক্স। ফলে এ বছরেই তাদের শেয়ারের দাম ৩৪০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে এবং বাজারমূল্যে তা স্যামসাং ও মাইক্রন উভয় কোম্পানিকেই ছাড়িয়ে গেছে।
সোমবার বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান মেমোরি চিপ নির্মাতা কোম্পানি এসকে হাইনিক্সের শেয়ারের দাম ৫.৬ শতাংশ বেড়ে দিন শেষ করেছে, যার ফলে এর বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ২০৮০.৪ ট্রিলিয়ন উওন বা ১.৩৫ ট্রিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে, স্যামসাংয়ের শেয়ারের দাম ০.১৪ শতাংশ কমেছে, যার ফলে প্রেফার্ড শেয়ার বাদে এর বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে ২০৬৬.৭ ট্রিলিয়ন উওন।
বিশ্বজুড়ে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে নতুন রূপ দিয়েছে এআই, বিশেষ করে সাধারণ মেমোরি চিপগুলোকে সাধারণ বাণিজ্যিক পণ্য থেকে চ্যাটজিপিটি ও উন্নত এআই মডেলগুলোর চালিকাশক্তির এক অপরিহার্য উপাদানে পরিণত করেছে।
এসকে হাইনিক্স মেমোরি চিপ তৈরিতেই বেশি মনোযোগ দিয়েছে, যেখানে স্যামসাং মেমোরির পাশাপাশি লজিক চিপ এবং স্মার্টফোন ও টিভির মতো কনজিউমার ইলেকট্রনিক্সও তৈরি করে। ২০০০ সাল থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে শীর্ষ স্থানটি ছিল স্যামসাংয়ের দখলে।
‘মেরিটজ সিকিউরিটিজ’-এর সিনিয়র অ্যানালিস্ট কিম সুনউ বলেছেন, “গ্রাহকদের চাহিদা অনুসারে তৈরি কাস্টমাইজড এআই মেমোরির আগমন চিপ শিল্পের অর্থনৈতিক সমীকরণকে মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছে। আর এটাই এসকে হাইনিক্সকে বাজারের শীর্ষস্থান দখল করতে সাহায্য করেছে।”

এদিকে, এক বিবৃতিতে স্যামসাং বলেছে, তাদের বাজার মূলধন হিসাবের সময় ‘প্রেফার্ড শেয়ার’ বা অগ্রাধিকারমূলক শেয়ারগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। সেসব শেয়ারসহ হিসাব করলে বাজার বন্ধ হওয়ার সময় কোম্পানিটির মোট মূল্য দাঁড়ায় ২২৪৬.৪ ট্রিলিয়ন উওন।
এসকে হাইনিক্সের এ উত্থান দক্ষিণ কোরিয়ার করপোরেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প।
২০০২ সালের দিকে তৎকালীন ‘হাইনিক্স সেমিকন্ডাক্টর’ ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে মার্কিন চিপ নির্মাতা কোম্পানি ‘মাইক্রন’-এর কাছে বিক্রি হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল।
আগ্রাসী ব্যবসায়িক বিস্তারের কারণে এ মোটা অংকের ঋণের ফাঁদে পড়েছিল তারা। তবে শেষ মুহূর্তে চুক্তিটি ভেস্তে যায় এবং প্রায় এক দশক ধরে কোম্পানিটি পাওনাদারদের নিয়ন্ত্রণে থাকে।
২০০৩ সালে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম কমে কেবল ১৩৫ উওনে নেমে এসেছিল, যা কোরিয়ান ভাষায় ‘দংজেওন-জু’ বা সস্তা ‘পেনি স্টক’ হিসেবে পরিচিতি পায়।
পরবর্তী বছরগুলোতে তাদের ভাগ্য বিশ্বজুড়ে মেমোরি শিল্পের চিরাচরিত উত্থান-পতনের চক্রের সঙ্গেই ওঠানামা করেছে। ২০২৩ সালেও বাজারে মেমোরি চিপের দাম মারাত্মকভাবে পড়ে যাওয়ায় বড় ধাক্কা খেয়েছিল এসকে হাইনিক্স, যার ফলে সে বছর তাদের ৭.৭৩ ট্রিলিয়ন উওন বার্ষিক পরিচালন লোকসান গুনতে হয়েছে।
তবে এর ঠিক এক বছর পরেই ভাগ্য বদলাতে শুরু করে কোম্পানিটির। এআইয়ের জোয়ার পুরোদমে শুরু হলে মাইক্রোসফট, গুগল ও মেটার মতো মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্টরা এ খাতে বিপুল বিনিয়োগ করে।
২০২৪ সালেই এসকে হাইনিক্স ২৩.৫ ট্রিলিয়ন উওন বার্ষিক পরিচালন মুনাফা করেছে, যা সে সময় পর্যন্ত তাদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ রেকর্ড।