Published : 15 Jul 2026, 03:14 PM
ইরান সতর্ক করার পর হরমুজ প্রণালীর তলদেশ দিয়ে যাওয়া সাবমেরিন কেবলগুলো নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ এই কেবলগুলোই বিশ্বের বড় অংশের ইন্টারনেট যোগাযোগ ও ডিজিটাল সেবার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি শুধু বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, ডিজিটাল যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এটি একটি বড় হাব। এই প্রণালীর সমুদ্রতল দিয়ে কয়েকটি ফাইবার অপটিক কেবল গেছে, যেগুলো ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলোকে উপসাগরীয় অঞ্চল ও মিশরকে যুক্ত করেছে।
সাবমেরিন কেবল কী?
সাবমেরিন কেবল হলো সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে স্থাপন করা বিশেষ ধরনের যোগাযোগ কেবল, যা এক দেশ থেকে আরেক দেশে বিপুল পরিমাণ ডেটা পাঠাতে ব্যবহৃত হয়। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা সাধারণত ওয়াই-ফাই বা মোবাইল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সেবা পেলেও, বিশ্বের বিভিন্ন দূরবর্তী অঞ্চলের মধ্যে দ্রুতগতির যোগাযোগের বড় অংশ এসব সমুদ্রতলের কেবলের ওপর নির্ভর করে।
এসব কেবলের মূল অংশে থাকে খুব সূক্ষ্ম কাচের তন্তু বা অপটিক্যাল ফাইবার। এর মধ্য দিয়ে আলোর সংকেত ব্যবহার করে প্রতি সেকেন্ডে বিপুল পরিমাণ তথ্য পাঠানো যায়। একটি কেবলে সাধারণত একাধিক অপটিক্যাল ফাইবার থাকে, যাতে একই সঙ্গে অনেক তথ্য প্রবাহ পরিচালনা করা যায়।
কেবলের কেন্দ্রে থাকা ফাইবারকে সুরক্ষা দিতে এর চারপাশে কয়েকটি স্তর থাকে। এর মধ্যে থাকে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য পরিবাহী অংশ, সংকেত সুরক্ষার আবরণ, পানিরোধী স্তর এবং শক্ত ধাতব আবরণ। অগভীর পানিতে, যেখানে জাহাজের নোঙর বা মাছ ধরার সরঞ্জামের আঘাতের ঝুঁকি বেশি, সেখানে কেবলকে আরও পুরু ও শক্তভাবে তৈরি করা হয়। গভীর সমুদ্রের অংশে তুলনামূলক হালকা কেবল ব্যবহার করা হয়।
কেবল স্থাপনের আগে বিশেষ জাহাজ দিয়ে সমুদ্রের তলদেশ জরিপ করে নিরাপদ পথ নির্ধারণ করা হয়। এরপর কেবল বিছিয়ে দেওয়া হয় এবং উপকূলের কাছাকাছি অগভীর এলাকায় অনেক সময় সমুদ্রের তলদেশে কবর দেওয়া হয়, যাতে বাইরের আঘাত থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায়।
বিশ্ব ইন্টারনেটের মূল ভরসা সমুদ্রের কেবল
জাতিসংঘের ডিজিটাল প্রযুক্তি বিষয়ক সংস্থা আইটিইউর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের আন্তর্জাতিক ডেটা আদান-প্রদানের ৯৯ শতাংশের বেশি এসব কেবলের মাধ্যমে হয়। ইন্টারনেট ব্রাউজিং, ই-মেইল, আর্থিক লেনদেন, ক্লাউড সেবা, সরকারি যোগাযোগ এবং ভিডিও স্ট্রিমিংয়ের মতো অসংখ্য ডিজিটাল সেবা এই নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করে।
আইটিইউর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে পাঁচশটির বেশি সক্রিয় ও পরিকল্পনাধীন সাবমেরিন কেবল সিস্টেম রয়েছে। এসব কেবল সমুদ্রের নিচ দিয়ে প্রায় ১৮ লাখ কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত।
ভূরাজনৈতিক ও জ্বালানি বিশ্লেষক মাশা কটকিন বলেন, “ক্ষতিগ্রস্ত কেবলের কারণে ইন্টারনেট ধীর হয়ে যেতে পারে বা বন্ধ হয়ে যেতে পারে, ই-কমার্সে সমস্যা তৈরি হতে পারে, আর্থিক লেনদেনে দেরি হতে পারে এবং এসব সমস্যার কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে।”
আগেও উঠেছে কেবল নাশকতার অভিযোগ
সাবমেরিন কেবলকে সম্ভাব্য কৌশলগত লক্ষ্য হিসেবে দেখার ঘটনা নতুন নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সমুদ্রের নিচে থাকা যোগাযোগ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কয়েকটি ঘটনায় ইচ্ছাকৃত নাশকতার সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
২০২৪ সালে বাল্টিক সাগরে ফিনল্যান্ড ও জার্মানির মধ্যে থাকা একটি টেলিযোগাযোগ কেবল এবং লিথুয়ানিয়া ও সুইডেনের মধ্যে থাকা একটি কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর ইউরোপীয় কর্মকর্তারা সম্ভাব্য নাশকতার আশঙ্কা প্রকাশ করেন। জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস তখন ঘটনাগুলোকে দুর্ঘটনা বলে মনে হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছিলেন।
এর আগে ২০২৩ সালে বাল্টিক অঞ্চলে নর্ড স্ট্রিম গ্যাস পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা এবং সমুদ্রের নিচের বিভিন্ন অবকাঠামো নিয়ে তদন্তের পর ইউরোপের দেশগুলো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন বলছে, ২০২৪ সালে লোহিত সাগরে ইরান সমর্থিত হুতিদের হামলার শিকার একটি বাণিজ্যিক জাহাজ ভেসে গিয়ে নোঙরের কারণে কয়েকটি কেবল বিচ্ছিন্ন করেছিল। এই ঘটনা দেখিয়েছে, সরাসরি হামলা ছাড়াও সংঘাতের সময় জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বেড়ে গেলে কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ কোন কেবলগুলো হরমুজ দিয়ে গেছে?
হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ কেবলগুলোর মধ্যে রয়েছে এশিয়া-আফ্রিকা-ইউরোপ ওয়ান, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে মিশরের মাধ্যমে ইউরোপের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এর সংযোগ রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কাতার ও সৌদি আরবে।
এ ছাড়া ফ্যালকন নেটওয়ার্ক ভারত ও শ্রীলঙ্কাকে উপসাগরীয় দেশ, সুদান ও মিশরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। গালফ ব্রিজ ইন্টারন্যাশনাল কেবল সিস্টেম সব উপসাগরীয় দেশকে যুক্ত করেছে, যার মধ্যে ইরানও রয়েছে।
তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডিজিটাল অবকাঠামোয় শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। দেশ দুটির জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠানগুলো আঞ্চলিক গ্রাহকদের সেবা দেয়, যেগুলোর দ্রুত ডেটা আদান-প্রদানের জন্য এসব কেবলের ওপর নির্ভর করতে হয়।
যুদ্ধ ছাড়াও সাবমেরিন কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়
সাবমেরিন কেবল নেটওয়ার্ক দ্রুত বড় হলেও ক্ষতির ঘটনা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। আন্তর্জাতিক কেবল সুরক্ষা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে বিশ্বজুড়ে সাবমেরিন কেবলের দৈর্ঘ্য যেখানে প্রায় ১০ লাখ কিলোমিটার ছিল, ২০২৫ সালে তা বেড়ে প্রায় ১৭ লাখ কিলোমিটারে পৌঁছেছে।
তবে প্রতিবছর কেবল ক্ষতির ঘটনা এখনও প্রায় দেড়শ থেকে দুশটির মধ্যেই রয়েছে।
আন্তর্জাতিক কেবল সুরক্ষা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, এসব ক্ষতির প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই ঘটে মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে। মাছ ধরার জাহাজ ও বাণিজ্যিক জাহাজের নোঙর টেনে নেওয়ার ঘটনা এর প্রধান কারণ।
টেলিযোগাযোগ গবেষণা প্রতিষ্ঠান টেলিজিওগ্রাফির গবেষণা পরিচালক অ্যালান মলডিন বলেন, সমুদ্রের স্রোত, ভূমিকম্প, সমুদ্রের নিচের আগ্নেয়গিরি ও ঘূর্ণিঝড়ও কেবলের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ঝুঁকি কমাতে কেবল মাটির নিচে স্থাপন করা, শক্ত আবরণ দেওয়া এবং নিরাপদ পথ বেছে নেওয়া হয়।
যুদ্ধ বাড়লে বাড়ে অনিচ্ছাকৃত ক্ষতির আশঙ্কা
ইরান যুদ্ধ প্রায় দুই মাসে গড়ানোর পর বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আঞ্চলিক অবকাঠামোয় বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। এর মধ্যে বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেসের ডেটা সেন্টারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত সাবমেরিন কেবলগুলো সরাসরি ক্ষতির শিকার হয়নি।
তবে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে পরোক্ষ ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজ নোঙর টেনে নিয়ে গিয়ে কেবল বিচ্ছিন্ন করতে পারে।
কটকিন বলেন, “সক্রিয় সামরিক অভিযানের পরিস্থিতিতে অনিচ্ছাকৃত ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ে এবং সংঘাত যত দীর্ঘ হয়, অনিচ্ছাকৃত ক্ষতির আশঙ্কাও তত বাড়ে।”
২০২৪ সালে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল। ইরানপন্থি হুতিদের হামলার শিকার একটি বাণিজ্যিক জাহাজ লোহিত সাগরে ভেসে গিয়ে নোঙরের কারণে কয়েকটি কেবল বিচ্ছিন্ন করেছিল।
কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে উপসাগরীয় দেশগুলোর ইন্টারনেট সংযোগ কতটা প্রভাবিত হবে, তা নির্ভর করবে কোন অপারেটর কতটা এসব কেবলের ওপর নির্ভর করছে এবং তাদের বিকল্প ব্যবস্থা কতটা রয়েছে তার ওপর।
যুদ্ধের এলাকায় কেবল মেরামত কঠিন
ক্ষতিগ্রস্ত কেবল মেরামত করাও যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল মেরামতের প্রযুক্তিগত কাজ খুব জটিল না হলেও যুদ্ধের ঝুঁকি, সমুদ্রের নিচে থাকা বিস্ফোরক বস্তু এবং বিমা সংশ্লিষ্ট সমস্যার কারণে মেরামতকারী জাহাজ পাঠানো কঠিন হতে পারে।
মলডিন বলেন, “অনেক সময় মেরামতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, যে পানিতে ক্ষতি হয়েছে সেখানে যাওয়ার অনুমতি নিতে হয়। এটি অনেক সময় দীর্ঘ প্রক্রিয়া হয়ে যায় এবং সবচেয়ে বড় সমস্যার কারণ হতে পারে।”
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও সমুদ্রতলের নতুন করে জরিপ করতে হবে। কারণ সংঘাতের সময় ডুবে যাওয়া জাহাজ বা অন্য কোনো বস্তু কেবলের নিরাপদ অবস্থান বদলে দিতে পারে।
স্যাটেলাইট কি বিকল্প হতে পারবে?
সাবমেরিন কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পুরোপুরি ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা নেই। কারণ স্থলভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থাও রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্যাটেলাইট ব্যবস্থা এর পূর্ণ বিকল্প হতে পারবে না।
মলডিন বলেন, “এমন নয় যে আপনি সহজেই স্যাটেলাইটে চলে যেতে পারবেন। এটি কোনো বিকল্প নয়।”
তিনি বলেন, স্যাটেলাইটও স্থলভিত্তিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত থাকে এবং বিমান বা জাহাজের মতো চলমান ব্যবহারের জন্য বেশি উপযোগী।
কটকিন বলেন, “নিম্ন কক্ষপথের স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক যেমন স্টারলিংক এখন একটি সীমিত সমাধান, যা এই মুহূর্তে লাখো ব্যবহারকারীর জন্য বড় পরিসরে কার্যকর করা সম্ভব নয়।”