Published : 15 Jul 2026, 06:57 PM
মাতৃত্বকালীন ছুটি বা শারীরিক অসুস্থতাজনিত বিশেষ সুবিধা চাওয়ার জেরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ব্যবহার করে গণছাঁটাইয়ের অভিযোগ উঠেছে ফেইসবুকের মূল কোম্পানি মেটার বিরুদ্ধে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান লিখেছে, এ বেআইনি প্রক্রিয়ার শিকার হয়েছেন দাবি করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম জায়ান্টটির বিরুদ্ধে মামলা করেছেন কয়েক ডজন কর্মী।
সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার নর্থ ডিস্ট্রিক্ট ফেডারেল আদালতে মামলাটি দায়ের করা হয়। মামলাকারীদের অভিযোগ, এ বছরের শুরুতে মেটা থেকে যে প্রায় ৮ হাজার কর্মী ছাঁটাই হয়েছে, তার পেছনে সক্রিয় ভূমিকা ছিল এআই প্রযুক্তির।
ফেইসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মূল কোম্পানি মেটা কর্মী ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে মানুষের সুচিন্তিত বিচার-বুদ্ধিকে পাশ কাটিয়ে পুরোপুরি প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
মামলার নথিতে বলা হয়েছে, কাকে কাকে ছাঁটাই করা হবে তা সুনির্দিষ্ট করতে মেটা জটিল অভ্যন্তরীণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নেটওয়ার্ক বা ‘কনস্টেলেশন অফ ইন্টারনাল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সিস্টেমস’ ব্যবহার করেছে।
এ ব্যবস্থার আওতায় কর্মীদের কাজের এআইভিত্তিক পারফরম্যান্স রেটিং ও কম্পিউটারের কিবোর্ড-মাউস ব্যবহারের ডেটা বিশ্লেষণ করে তাদের ওপর নজরদারি চালানো হয়েছে।
আদালতে পেশ করা ৭১ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্রে কর্মীদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, “যারা কাজের খোঁজখবর রাখতেন বা কাজ বোঝেন, এমন কোনো ম্যানেজারের সুচিন্তিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে মেটা এই ছাঁটাইয়ের তালিকা তৈরি করেনি।”
বরং মামলায় বাদী হওয়া ২৬ জন কর্মীর অভিযোগ, মেটা এআই ব্যবস্থাকে ব্যবহার করেছে কর্মীদের “স্কোর দিতে, র্যাংক করতে ও ছাঁটাইয়ের তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য।”
ভুক্তভোগী কর্মীরা আদালতের কাছে অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞার আবেদন করেছেন, যাতে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মেটা এই ছাঁটাই প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করতে না পারে। পাশাপাশি তারা চাকরিতে পুনর্বহাল, বকেয়া বেতন, হারানো ইকুইটি বা শেয়ার, অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ও আর্থিক ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে কর্মক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার বিশ্বজুড়ে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কর্মীদের তথ্য চুরি, ব্যক্তিগত প্রাইভেসি লঙ্ঘন ও প্রযুক্তির একপেশে পক্ষপাতের কারণে বিষয়টি নিয়ে সাধারণ চাকরিজীবীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে বিভিন্ন দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোও এ ধরনের প্রযুক্তির আইনি বৈধতা নিয়ে কঠোর নজরদারি শুরু করেছে। এমন পরিস্থিতিতে কর্মীদের এআইয়ের পক্ষপাতমূলক আচরণ ও ‘স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যবস্থা’ থেকে সুরক্ষা দিতে গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া, কলোরাডো এবং ইলিনয়ের মতো বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্য নতুন আইন ও কঠোর বিধিমালা প্রণয়ন করেছে।
সামাজিক মাধ্যম জায়ান্ট মেটার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় আরও অভিযোগ উঠেছে, মাতৃত্বকালীন ছুটি বা অসুস্থতাজনিত ছুটিতে থাকা কর্মীদের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে তাদের ছাঁটাইয়ের জন্য টার্গেট করেছে মেটার এআই টুল। ছুটিতে থাকার কারণে সিস্টেমে তাদের কাজের কোনো ডেটা বা পারফরম্যান্স স্কোর ছিল না, আর একেই অযোগ্যতা ধরে নিয়ে তাদের ছাঁটাইয়ের তালিকায় ফেলে দেয় এআই।
মামলার নথিতে বলা হয়েছে, মেটার এআই কর্মীদের কাজের রেটিং, উৎপাদনশীলতা ও অন্যান্য কর্মসক্ষমতা পরিমাপক উপাত্ত বিশ্লেষণ করে। কিন্তু কোনো কর্মী যখন মাতৃত্বকালীন ছুটি বা পারিবারিক জরুরি প্রয়োজনে ছুটিতে থাকেন, তখন সিস্টেমে তাদের এই কর্মসক্ষমতার কোনো তথ্য বা ইনপুট থাকে না। একইভাবে, শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার কর্মীদের ক্ষেত্রেও এআইয়ের এ পারফরম্যান্স স্কোর স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়।
অভিযোগপত্রে বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছে, “এর চূড়ান্ত ফলাফল ছিল, যেসব কর্মী আইনসম্মত বা সুরক্ষিত ছুটি নিয়েছিলেন, তাদের ছাঁটাইয়ের তালিকায় বা আনুপাতিক হারের চেয়ে বেশি হারে নির্বাচিত করা হয়েছে। এমন এক স্কোরিং ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে এই তালিকা করা হয়েছে, যা কেবল তাদের ছুটির বিষয়টিকে বিবেচনায় নিতে ব্যর্থই হয়নি, বরং আইনি অধিকারের বলে ছুটি নেওয়ার অপরাধে কর্মীদের একপ্রকার শাস্তি দিয়েছে।”
মামলায় বাদী হওয়া কর্মীদের ব্যক্তিগত বিভিন্ন অভিজ্ঞতা আরও ভয়াবহ। মামলার অন্যতম বাদী একজন নারী বিজ্ঞানী, যিনি সন্তান প্রসবের ঠিক দুই দিন আগে সরকার অনুমোদিত প্রাক-প্রসবকালীন ছুটিতে থাকার সময় জানতে পারেন, তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
আরেকজন বাদী পেশায় প্রকৌশলী। তিনি বলেছেন, একটি দুর্ঘটনার কারণে ছুটি নেওয়ার পর তাকে কর্মসদক্ষতার ‘নিম্ন রেটিং’ দেওয়া হয়। অসুস্থতার ছুটিতে থাকা একজন ম্যানেজার বলেছেন, ছুটি শুরুর কেবল ১৬ দিনের মাথায় তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন মেটার একজন মুখপাত্র। তিনি বলেছেন, “এসব দাবির কোনো ভিত্তি নেই এবং এগুলো তথ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। কর্মী ব্যবস্থাপনা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন সিদ্ধান্ত মানুষই নিয়েছে এবং এখনো মানুষই নেয়, কোনো এআই নয়।”