০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩

শ্বাসচর্চা যেভাবে শরীর ও মনকে সুস্থ রাখে

অস্থিরতা, স্মৃতির চাপ বা শারীরিক জড়তা কাটাতে পারে শ্বাসের ব্যায়াম।

লাইফস্টাইল ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 28 Dec 2025, 02:55 PM

Updated : 26 Aug 2026, 05:25 PM

কখনও কি মনে হয় চারপাশের চাপ আর দুশ্চিন্তায় দম বন্ধ হয়ে আসছে? এমন মুহূর্তে একটি গভীর শ্বাসই অনেক সময় স্বস্তি এনে দেয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনভাবে শ্বাস নেওয়া কেবল তাৎক্ষণিক শান্তির জন্য নয় বরং এটি ঘুম ভালো করা, মানসিক চাপ কমানো, এমনকি মস্তিষ্কের কার্যপদ্ধতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

শ্বাসচর্চা আসলে কী?

শ্বাসচর্চা বলতে বোঝায় ইচ্ছাকৃতভাবে শ্বাস নেওয়ার ধরণ নিয়ন্ত্রণ করা, যাতে স্নায়ুতন্ত্র ও সামগ্রিক সুস্থতায় প্রভাব ফেলা যায়।

স্নায়ুতন্ত্র-বিষয়ক মার্কিন শিক্ষাবিদ জেসিকা ম্যাগুইর রিয়েলসিম্পল ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেন, “অনেকেই শ্বাসচর্চাকে ধ্যানের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন, কিন্তু এর পরিসর আরও বিস্তৃত। ধীরে ও গভীরভাবে শ্বাস নেওয়ার মতো কোমল অনুশীলন শরীরকে চাপের অবস্থা থেকে শান্ত অবস্থায় নিয়ে আসে। আবার কিছু তুলনামূলক সক্রিয় পদ্ধতি শরীরে শক্তি জাগিয়ে তোলে এবং জমে থাকা আবেগ বা স্মৃতি মুক্ত করতে সহায়তা করে।”

মূল কথা হল, নিজের শরীরের সঙ্গে মানানসই যে পদ্ধতি স্বস্তি দেয়, সেখান থেকেই শুরু করা।

ভুল শ্বাসের অভ্যাস ও তার প্রভাব

যুক্তরাজ্যের শ্বাসচর্চা থেরাপিস্ট এলিসা পাওয়েল বলেন, “মানুষ জন্মগতভাবেই শ্বাস নিতে জানে, কিন্তু সঠিকভাবে শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস সবার থাকে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভঙ্গি, দ্রুত শ্বাস নেওয়া বা মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার মতো অভ্যাস শরীরে অক্সিজেন ও কার্বন-ডাই-অক্সাইডের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করে। দিনে বিশ হাজারেরও বেশি বার এই ভুল অভ্যাস চলতে থাকলে তা দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যার কারণ হতে পারে।”

তবে শ্বাসের গতি, ভঙ্গি ও কৌশলে সামান্য পরিবর্তন আনলেই শরীর ও মনের ওপর বড় ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

মানসিক চাপ কমাতে শ্বাসচর্চা

গভীর শ্বাস যে তাৎক্ষণিক স্বস্তি দেয়, তা অনেকেই জানেন। তবে নিয়মিত শ্বাসচর্চা মানসিক চাপ সহ্য করার ক্ষমতাও বাড়ায়। এর কারণ হল, এই অনুশীলন স্নায়ুর এক বিশেষ কার্যক্ষমতা শক্তিশালী করে, যা মস্তিষ্ক ও শরীরের মধ্যে যোগাযোগ উন্নত করে। ফলে মানুষ নানান পরিস্থিতিতে আরও নমনীয়ভাবে সাড়া দিতে পারে।

ঘুমের মান উন্নত হয়

অনিদ্রা বা হালকা ঘুমের সমস্যায় ভুগলে শ্বাসচর্চা হতে পারে সহজ সমাধান। সঠিকভাবে শ্বাস নেওয়া গভীর ও আরামদায়ক ঘুমে সহায়তা করে এবং ঘুমজনিত নানান সমস্যার তীব্রতা কমাতে পারে।

রাতে বিছানায় শুয়ে ঘুম না এলে কয়েক মিনিট ধীরে ও গভীর শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস শরীরকে ঘুমের জন্য প্রস্তুত করে তোলে।

মস্তিষ্কের নমনীয়তা বাড়াতে সহায়ক

মস্তিষ্কের ভেতরের গঠন ও কাজের ধরন পরিবর্তন করার ক্ষমতাকে বলা হয় স্নায়বিক নমনীয়তা। দীর্ঘদিন নিয়মিত শ্বাসচর্চা করলে মস্তিষ্কে এমন স্নায়ুপথ শক্তিশালী হয়, যা শান্তি ও মানসিক দৃঢ়তা বাড়ায়।

একই সঙ্গে পুরানো চাপের অভ্যাসের সঙ্গে যুক্ত পথগুলো ধীরে ধীরে দুর্বল হয়। ফলে মানুষ নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে সহজে মানিয়ে নিতে পারে।

মনোযোগ ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি

নিয়মিত শ্বাসচর্চা মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করে। স্নায়ুতন্ত্র যখন নিরাপদ বোধ করে, তখন শরীর অপ্রয়োজনীয় টান ও ব্যথা ছেড়ে দিতে পারে।

ফলে দীর্ঘমেয়াদি ব্যথা কমে এবং মনোযোগ ও চিন্তার স্বচ্ছতা বাড়ে। সকালে বা রাতে কয়েক মিনিট শ্বাসচর্চা করলে কাজের দক্ষতা বাড়তে পারে, সম্পর্কেও মনোযোগী হওয়া সহজ হয়।

শক্তি ও সহনশীলতা বাড়ায়

শ্বাসচর্চার প্রভাব শুধু মানসিক নয়, শারীরিকও।

এলিসা পাওয়েলের মতে, সঠিক শ্বাস শরীরের কোষ পর্যায়ে শক্তি উৎপাদনে সহায়তা করে। এতে রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকতে পারে, শারীরিক সহনশীলতা বাড়ে এবং দৈনন্দিন কাজে ক্লান্তি কম অনুভূত হয়।

নিয়মিত অনুশীলনের ফলে শরীরে এক ধরনের স্থায়ী সতেজতা তৈরি হয়।

যেভাবে শুরু করতে হবে শ্বাসচর্চা

শুরুটা খুব জটিল হওয়ার দরকার নেই।

জেসিকা ম্যাগুইর পরামর্শ দেন, প্রতিদিন কয়েক মিনিট নিজের স্বাভাবিক শ্বাসের দিকে মনোযোগ দিতে। বিশেষ করে সন্ধ্যায় বা বিশ্রামের সময় শ্বাসের গতি লক্ষ করা ভালো।

শ্বাসের সংখ্যা গুনে বোঝা যায় স্নায়ুতন্ত্রের অবস্থা। দুশ্চিন্তাপ্রবণ মানুষ সাধারণত দ্রুত শ্বাস নেন, আবার কেউ কেউ খুব ধীরে শ্বাস নেন এবং নিজেকে নিস্তেজ অনুভব করেন।

ধীরে ধীরে এই গতি সামঞ্জস্য করাই লক্ষ্য হওয়া উচিত।

সহজ একটি অনুশীলন পদ্ধতি

একটি পরিচিত পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট সময় ধরে শ্বাস নেওয়া, ধরে রাখা এবং ছাড়ার অনুশীলন করা হয়। এতে স্নায়ুতন্ত্র নতুন করে ভারসাম্য খুঁজে পায়। কয়েক দফা অনুশীলনের পর শরীর ও মনে প্রশান্তি অনুভূত হয়।

নিজের শ্বাসের অভ্যাস পর্যবেক্ষণ

এলিসা পাওয়েল বলেন, “প্রথমে নজর দিতে হবে নিজের কোন অভ্যাসগুলো সমস্যার সৃষ্টি করছে। মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়া, খুব দ্রুত বা খুব অগভীর শ্বাস, কিংবা অজান্তে শ্বাস আটকে রাখা এসবই সাধারণ সমস্যা।”

একটি আরামদায়ক ভঙ্গিতে বসে মেরুদণ্ড সোজা রেখে, এক হাত বুকের ওপর ও অন্য হাত পেটের ওপর রেখে শ্বাসের গতি অনুভব করা যেতে পারে। ধীরে ধীরে নাক দিয়ে শান্ত ও গভীর শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে, যাতে বুকের চেয়ে পেট বেশি ওঠানামা করে।

নিয়মিত চর্চার গুরুত্ব

দিনে কয়েকবার, অন্তত দশ থেকে পনেরো মিনিট শ্বাসচর্চার পরামর্শ দেন- এলিসা পাওয়েল। ব্যস্ত দিনের মাঝেও এই অনুশীলন মানসিক বিরতি ও প্রশান্তি এনে দিতে পারে।

আরও পড়ুন

শ্বাস-প্রশ্বাসের চর্চায় মিলবে স্বাস্থ্য উপকারিতা

দুর্গন্ধযুক্ত শ্বাস দূরে থাক

চাপ অনুভব করলে ধীরে শ্বাস নিন