২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫ আশ্বিন ১৪৩৩

আত্মনিয়ন্ত্রণ নয়, বেছে নিতে হবে অভ্যাস গড়ার পথ

ভালো কোনো অভ্যাস গড়তে নিয়মানুবর্তিতা বা শৃঙ্খলা হতে পারে চাপের বিষয়।

আত্মনিয়ন্ত্রণ নয়, বেছে নিতে হবে অভ্যাস গড়ার পথ
ছবি: রয়টার্স।

লাইফস্টাইল ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 08 Jul 2025, 05:24 PM

Updated : 26 Aug 2026, 01:20 PM

অনেকেই ভাবেন- নিয়মিত ব্যায়াম শুরু করবেন, স্বাস্থ্যকর খাবার খাবেন, কিংবা ধ্যানচর্চা শুরু করবেন। তবে সমস্যা হয় অভ্যাস গড়ায়। এমন সময় মনে হয়, কঠোর শৃঙ্খলাই (ডিসিপ্লিন) একমাত্র পথ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই চোখে পড়ে নানান অনুপ্রেরণামূলক বার্তা।

যুক্তরাষ্ট্রের ফিটনেস ব্যক্তিত্ব ক্যামিলা জাইমে এবং লেখক ও পডকাস্ট উপস্থাপক জোকো উইলিঙ্ক বরাবরই বলেন, “শৃঙ্খলাই অভ্যাস তৈরি করতে সাহায্য করবে।”

তবে সত্যিই কি অভ্যাস গড়ার জন্য কেবলমাত্র শৃঙ্খলাই যথেষ্ট? আছে ভিন্ন কথাও।

অনেকের মতে, নিষ্ঠা বা একাগ্রতা দিয়ে গড়ে উঠতে পারে দীর্ঘস্থায়ী অভ্যাস, যা থাকে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে অনুপ্রাণিত।

শৃঙ্খলা না নিষ্ঠা?

শৃঙ্খলা অনেক সময়ই দায়িত্ববোধ বা গঠিত কাঠামোর ওপর নির্ভর করে। আর নিষ্ঠা আসে ভালোবাসা ও আগ্রহ থেকে।

শৃঙ্খলা যেখানে কাজকে দায়িত্ব বা বোঝা হিসেবে উপস্থাপন করে, সেখানে নিষ্ঠা সেই কাজকে রূপ দেয় যত্নের একটি রূপে।

অনেকেই স্বাস্থ্যকর খাবার রান্না করেন ভালোবাসা নিয়ে, সাজিয়ে পরিবেশন করেন যত্নসহকারে। এমনকি গোসলের সময় নিজের প্রতি যত্নের একটি রুটিনও অনুসরণ করেন।

অভ্যাস আসলে কী?

শৃঙ্খলা ও অভ্যাস শব্দ দুটি একইভাবে ব্যবহার করেন কেউ কেউ। তবে মনোবিজ্ঞান বলছে, এই দুটি এক নয়।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া’ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান ও ব্যবসা বিভাগের এমেরিটাস অধ্যাপক ডা. ওয়েন্ডি উড সিএনএন ডটকম-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ব্যাখ্যা করেন, “অভ্যাস গড়ে ওঠে পুনঃ পুনঃ ব্যবহারের মাধ্যমে। যদি প্রতিবার শৌচাগার ব্যবহারের পর হাত ধোয়ার অভ্যাস করেন, কিছুদিন পর তা হয়ে যাবে স্বতঃস্ফূর্ত। তখন আর আলাদা করে মনে রাখতে হবে না।”

অন্যদিকে শৃঙ্খলা মানে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রেখে কোনো নিয়ম মানা। এটি বেশিরভাগ সময়ই একটি সচেতন প্রয়াস।

ডা. উড আরও বলেন, “যদি কোনো কাজ অপছন্দ করেন, সেখানে শুধু শৃঙ্খলার মাধ্যমে তা দীর্ঘমেয়াদে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। কারণ শৃঙ্খলা বা ইচ্ছাশক্তি মূলত স্বল্পমেয়াদি উদ্দীপক। যারা অত্যন্ত আত্মনিয়ন্ত্রিত বলে মনে হয়, তাদের অভ্যাস আসলে অটোমেটিক বা স্বতঃসিদ্ধ হয়ে গেছে।”

অভ্যাস না কি রীতি?

কারও কারও মতে, অভ্যাস যেহেতু মনের অজান্তেই ঘটে, তাই তাতে উদ্দেশ্যবোধ বা অনুভবের জায়গা কম থাকে। বরং নিষ্ঠা বা রীতি তৈরি করলে কাজটি হয় অনেক বেশি অর্থবহ।

এই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক ডা. মাইকেল নর্টন বলেন, “রীতির সঙ্গে থাকে আবেগ ও অর্থবোধ। সব কিছু যদি স্বয়ংক্রিয় করে ফেলি, তাহলে অনেক ক্ষেত্রেই মানসিক সুফল হারায়।”

ডা. নর্টন তার লেখা ‘দ্য রিচুয়াল ইফেক্ট: ফ্রম হ্যাবিট টু রিচুয়াল, হারনেস দ্য সারপ্রাইজিং পাওয়ার অব এভরি ডে অ্যাকশন্স’-বইতে লিখেছেন, “রীতির মধ্যে নিয়ম থাকে। আর এসব আচরণ যখন ব্যাহত হয়, তখন আমাদের মনে অস্বস্তি হয়।”

যেমন যদি সকালে দাঁত ব্রাশ করে গোসল করেন, আর কেউ যদি হঠা বলে- এই ক্রম বদলে ফেলুন, তাহলে মন থেকে অস্বস্তি বোধ করবেন। এটাই রীতির প্রভাব।

কোনটা বেছে নেবেন: শৃঙ্খলা না নিষ্ঠা?

কোন পথে হাঁটবেন, তা নির্ভর করে আপনার ব্যক্তিত্ব ও উদ্দেশ্যের ওপর।

যুক্তরাষ্ট্রের মনোবিজ্ঞানী ও ‘টেইমিং ইয়োর ইনার ব্র্যাট: এ গাইড ফর ট্রান্সফর্মিং সেলফ-ডিফিটিং বিহেভিয়ার’ বইয়ের লেখিকা ডা. পলিন ওয়ালিন সিএনএন ডটকম-এর একই প্রতিবেদনে বলেন, “যদি শৃঙ্খলাকে বাইরের চাপ হিসেবে মনে হয়, তাহলে হয়ত নিষ্ঠার পথেই বেশি আগ্রহী হবেন।”

তবে একই ব্যক্তি ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে ভিন্ন পন্থা বেছে নিতে পারেন।

অফিসে সময়মতো যাওয়া বা নিয়ম পালন করতে হয়ত শৃঙ্খলার সাহায্য নেবেন। তবে নিজের কোনো লক্ষ্য অর্জনে নিষ্ঠাকে গুরুত্ব দিতে পারেন।

ডা. নর্টন বলেন, “ব্যক্তিভেদে তো বটেই, কাজভেদেও শৃঙ্খলা ও নিষ্ঠার প্রয়োগ ভিন্ন হতে পারে।”

অভ্যাস গড়তে চাচ্ছেন নিষ্ঠার মাধ্যমে?

নিষ্ঠার পথ ধরতে চাইলে প্রথমে জানতে হবে আপনি কেন নির্দিষ্ট কাজটি করতে চাইছেন?

যদি উদ্দেশ্য হয় নিজেকে ভালো রাখা, যেমন- ‘স্ক্রিনটাইম’ কমিয়ে বই পড়া বা সৃজনশীল কিছুতে সময় দেওয়া, তাহলে আপনি নিষ্ঠার খুব কাছাকাছি।

ডা. পলিন ওয়ালিন বলেন, “অনেকেই বিয়ের আগে ওজন কমানোর লক্ষ্য স্থির করেন, যাতে পোশাক ভালোভাবে মানায়। তবে লক্ষ্যটি অন্যদের দৃষ্টিভঙ্গির জন্য, নিজের জন্য নয়। তাই বিয়ের পর সেই লক্ষ্য থাকে না। তবে নিজের জন্য করলে, যেমন- নিজের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে চান, তাহলে সেই অভ্যাস টিকবে দীর্ঘদিন।”

নিষ্ঠার মাধ্যমে লক্ষ্য নির্ধারণ করলে সেটি চূড়ান্ত সময়সীমা নির্ভর হয় না। বরং হয়ে ওঠে চলমান একটি প্রক্রিয়া।

যেমন- প্রথমে সপ্তাহে দুদিন জিমে যাওয়া, তারপর তিনদিন এভাবে ছোট ছোট ধাপে অভ্যাস গড়া যায়।

অনলাইন কনটেন্ট নির্মাতা লিভ গ্লিটারবোনস বলেন, “এই পদ্ধতিটা টেকসই, কারণ এটি ধৈর্য, সহানুভূতি ও নিজের প্রতি যত্নের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এতে অহংকার নেই, বরং থাকে নিজের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের এক গভীর প্রচেষ্টা।”

আরও পড়ুন

কড়া শাসনে সন্তানের ক্ষতি!

নিয়ম মেনে ডায়েট

যেসব অভ্যাসে কমবে শরীরের ব্যথা

চার অভ্যাসে হবে সুস্থ জীবন