Published : 11 Nov 2025, 06:42 PM
রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় অনেকেই পায়ের ভেতর একধরনের অদ্ভুত অস্থিরতা, সুচ ফোটার মতো বা কাঁপুনি অনুভব করেন।
কেউ কেউ বলেন, মনে হয় যেন পায়ের ভেতরে কিছু হামাগুড়ি দিচ্ছে, বা পিঁপড়া হাঁটছে।
এই সমস্যাকে সাধারণত ক্লান্তি বা স্নায়ুর সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যাওয়া হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি হতে পারে এক জটিল স্নায়ুজনিত সমস্যা— ‘রেস্টলেস লেগ সিনড্রোম’ বা পায়ের অস্থিরতা লক্ষণ।
এই অসুস্থতা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালের ‘স্লিপ ডিজঅর্ডার’ গবেষণা বিভাগের প্রধান ও হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের মনোরোগবিদ্যার অধ্যাপক ডা. জন উইঙ্কেলম্যান সিএনএন ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেন, “রেস্টলেস লেগ সিনড্রোম’ হল এক ধরনের স্নায়বিক ব্যাধি। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যের মধ্যে আছে- অবিরাম নড়াচড়ার প্রয়োজনীয়তা ও পায়ে অস্বস্তিকর অনুভূতি।”
শরীরে কী ঘটে এই অবস্থায়
ডা. উইঙ্কেলম্যান জানান, এই অস্বস্তি পায়ে সবচেয়ে বেশি হলেও কখনও কখনও হাতে পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। পায়ে কাঁপুনি, টান, সুচ ফোটার মতো ব্যথা, বা জ্বালাভাবের অনুভূতি হয়।
সাধারণত এই সমস্যা দেখা দেয় বিশ্রাম বা শোয়ার সময়, বিশেষ করে রাতে।
বিশ্রামের সময় যখন উপসর্গগুলো বেড়ে যায় তখন নড়াচড়া করলে সাময়িক স্বস্তি মেলে। তবে ফলাফল হয় ঘুমের ঘাটতি। তাই চিকিৎসকেরা একে ঘুমজনিত সমস্যার তালিকায়ও রাখেন।
ইয়েল ইউনিভার্সিটি’র স্নায়ুবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক এবং ‘ইয়েল সেন্টার ফর রেস্টলেস লেগ সিনড্রোম’-এর পরিচালক ডা. ব্রায়ান কু জানান, মাঝারি থেকে গুরুতর পর্যায়ে থাকা রোগীরা সপ্তাহে কয়েকবার এমন সমস্যা অনুভব করেন, আর চরম পর্যায়ে এটি ঘুমাতে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত বিলম্ব ঘটায়।
আরও পড়তে পারেন
পায়ের আঙুলে ব্যথা হওয়ার কারণ ও করণীয়
যাদের মধ্যে দেখা যায় এই সমস্যা
বিশ্বজুড়ে গবেষণায় দেখা গেছে, পশ্চিমা উন্নত দেশগুলোর প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় ৪ থেকে ২৯ শতাংশ এই ‘সিনড্রোম’য়ে আক্রান্ত।
ডা. উইঙ্কেলম্যানের মতে, “দুটি বিষয় মূলত নির্ধারণ করে, কে এই সমস্যায় পড়বেন— জিনগত কারণ ও দেহে আয়রন বা লৌহের পরিমাণ।
যাদের পরিবারে আগে এ সমস্যা ছিল, তাদের ঝুঁকি বেশি। আবার শরীরে লৌহের ঘাটতি থাকলেও এই সমস্যা দেখা দিতে পারে।
বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, ঋতুস্রাব চলাকালীন নারী, রক্তস্বল্পতায় ভোগা ব্যক্তি, ডায়ালাইসিস নেওয়া রোগী বা নিরামিষভোজীরা এর ঝুঁকিতে থাকেন।
এ ছাড়া কিছু ওষুধও এই উপসর্গ বাড়াতে পারে। যেমন- মানসিক অবসাদ নিরাময়ের জন্য ব্যবহৃত ‘সিলেকটিভ সেরোটোনিন রি-ইনটেক ইনহিবিটর’ শ্রেণির ওষুধ।
পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে এই রোগ দ্বিগুণ বেশি দেখা যায়। বয়স বাড়ার সঙ্গে ঝুঁকিও বাড়ে।
তবে ‘রেস্টলেস লেগ সিনড্রোম’ শুধু বড়দের নয়, শিশুরাও আক্রান্ত হতে পারে।
রোগ নিয়ন্ত্রণে জীবনযাপনের পরিবর্তন
ডা. উইঙ্কেলম্যানের পরামর্শ, “চিকিৎসার আগে দেখতে হবে কোন অভ্যাসগুলো উপসর্গ বাড়াচ্ছে।”
ডা. কু’র মতে, “অ্যালকোহল, অতিরিক্ত চিনি বা কিছু ওষুধের প্রভাবে উপসর্গ তীব্র হতে পারে।”
যদি শরীরে লৌহের ঘাটতি পাওয়া যায়, তাহলে মুখে খাওয়ার ‘আয়রন ট্যাবলেট’ বা প্রয়োজনে শিরায় ‘আয়রন ইঞ্জেকশন’ দেওয়া যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘রেস্টলেস লেগ সিনড্রোম ফাউন্ডেশন’য়ের নির্বাহী পরিচালক ও নার্স কারলা জিনকভস্কি বলেন, “উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য নিজের কাছে কিছু ‘কৌশলের ব্যাগ’ রাখা উচিত। যেমন- গরম বা ঠাণ্ডা সেঁক, পা মালিশ, অল্প হাঁটাহাঁটি অথবা মনোযোগ সরানোর মতো কিছু কাজ (যেমন- বই পড়া বা হালকা ধাঁধা সমাধান)।"
তার মতে, “মন সক্রিয় থাকলে উপসর্গ অনেকটা কমে যায়।”
চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি
যদি বিশ্রামের সময় পায়ে এমন অস্বস্তি হয় যা নিজেকে নাড়িয়ে তোলে বা ঘুম ব্যাহত করে, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কারলা জিনকভস্কি বলেন, “ঘুমজনিত রোগের বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া ভালো।”
তিনি আরও বলেন, “রক্তে লৌহের উপস্থিতি যাচাই করতে ‘ফেরিটিন’ রক্ত পরীক্ষা করা দরকার। এতে জানা যায়, শরীরে কতটা লৌহ আছে এবং সেটা কী পরিমাণ ব্যবহার হচ্ছে।”
আরও পড়ুন
মাথায় নয়, মনের গভীরে লুকিয়ে আছে ব্যথার সমাধান